সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৫:২২ পিএম
ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগে গৃহদাহের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। কিন্তু
তাদের এই গৃহদাহ কখনও কখনও এমন কদাচারের সৃষ্টি করেছে যা শুধু শিক্ষার পরিবেশকেই হুমকির
মুখে ফেলেনি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকেও চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে, এমন নজির অনেক আছে।
আওয়ামী লীগপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতীতে ছাত্রলীগের দুষ্কর্মকারীদের কর্মকাণ্ডে
ক্ষুব্ধ হয়ে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কথাও বলেছিলেন। তারপর দফায় দফায় তিনি ছাত্রলীগের
ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষার পাশাপাশি কল্যাণকর রাজনীতির নির্দেশনাও বহুবার দিয়েছেন।
কিন্তু ছাত্রলীগের বিপথগামীরা তার কঠোর হুঁশিয়ারি কিংবা নির্দেশনা কিছুই আমলে নেয়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিগত কয়েক দিন
ধরে দফায় দফায় সংঘাত-সংঘর্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এরই সাক্ষ্যবহ। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের
বাংলাদেশসহ সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের গৃহদাহের
যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে প্রশ্ন জাগে, দুষ্কর্মকারীদের এত আস্ফালনের হেতু কী।
চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা বেপরোয়া নেতাকর্মীদের আধিপত্য
বিস্তার অথবা প্রভাববলয় সৃষ্টির কারণে নিজেদের মধ্যে হানাহানির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়
এমন বার্তাও সংবাদমাধ্যমেই বহুবার উঠে এসেছে। জানা গেছে, চবিতে স্থানীয় দুই নেতা এর
জন্য অনেকটা দায়ী এবং দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই হানাহানি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সাধারণ
শিক্ষার্থীরা ভীতসন্ত্রস্তের মধ্যে আছেন এবং পড়ালেখায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। সাধারণ
ছাত্রছাত্রীদের তরফে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
দিয়ে সম্ভব নয়। তারা সুষ্ঠু পরিবেশ ও লেখাপড়ার বৃহৎ স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ
কামনা করেছেন। শুধু চবিতেই নয়, দেশের আরও বিদ্যাপীঠেও ছাত্রলীগের বিপথগামীরা বিষফোড়ায়
পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ কলহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে প্রাণহানির মর্মস্পর্শী ঘটনার
নজিরও আছে। অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির বিষবাষ্প যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ
শিক্ষার্থীদের জীবন একদিকে অনিশ্চয়তায় পড়ছে অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী রাজনীতির অপচ্ছায়া
ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কয়েকজনের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে
বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বিপথগামীদের নিয়ন্ত্রণ করা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশাসনের পক্ষে দুরূহ। তাদের মন্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক নেপথ্যে দুই গ্রুপের
উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের তাদের স্বার্থে নানাভাবে ব্যবহার করে আসছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে এ-ও বলা হয়েছে, লেখাপড়ার সুষ্ঠু
পরিবেশ ও নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কিংবা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের
সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া উল্লেখিত দুই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার
মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বক্তব্য, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যারা সংঘর্ষে লিপ্ত
হবে, মাস্তানি করবে তাদের টিসি দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে
বলেছি’, এই বার্তাও সংবাদমাধ্যমেরই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মন্ত্রীর নির্দেশনা
বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
দায়িত্বশীলদের এমন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ছাত্রলীগের
উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের আস্ফালন নিমজ্জিত হিমশৈলীর যেন চূড়ামাত্র। আমাদের বক্তব্য,
শিক্ষাঙ্গন কোনো লাঠিয়াল কিংবা অস্ত্রধারীদের চারণভূমি হতে পারে না। ছাত্রলীগের বিপথগামীদের
অপকাণ্ডের দায় আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না। ধারাবাহিক চার মেয়াদসহ পঞ্চমবারের মতো এবার
আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। এই সত্য অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রপরিচালনায় দূরদর্শিতা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে
অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দেশ উন্নয়ন-অগ্রগতির মহাসড়কে বাংলাদেশ উঠেছে তারই কার্যকর
ও সাহসী ভূমিকায়। অথচ দুঃখজনক, আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের দুষ্কর্মকারীরা এসব
অর্জন ম্লান করছে। আমরা মনে করি, এই দুষ্কর্মকারীরা দল বা সংগঠনের বোঝা। একই সঙ্গে
আমরা এ-ও মনে করি, উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের যারা ইন্ধন জোগান কিংবা নানাভাবে ব্যবহার করেন
দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।
‘সমস্যার নাম ছাত্রলীগ’ এমন শিরোনামেও ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্রসংগঠন সংবাদমাধ্যমে
উঠে এসেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে জোর করে সিট দখল থেকে শুরু করে এ নিয়ে বাণিজ্যসহ
নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে ছাত্রলীগের নীতিচ্যুত নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার খবরও নতুন
কিছু নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল। দীর্ঘদিন
ধরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতি দুই ধারায় বিভক্ত এবং প্রতিটি ধারার আবার
বিভিন্ন উপধারাও রয়েছে। এই উপধারাগুলোর পারস্পরিক কোন্দলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর বহুবার
রক্তাক্ত হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টির নজিরও রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিদ্যমান পরিস্থিতির নিরসন করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের
হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বিপথগামীদের দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তিও নিশ্চিত করতে
হবে।