ভাষার মাস
শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৫:২০ পিএম
ভাষার মাস। আমাদের গর্ব ও অহংকারের মাস। সারা
পৃথিবীতে বাংলাদেশি বাঙালি সেই জাতি যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। এজন্য এটি
আমাদের আত্মশ্লাঘার এক অনন্য অনুষঙ্গ। যোগ্যতর জাতি হিসেবে আমাদের একুশে
ফেব্রুয়ারি অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সবই সত্যি।
তবু যখন দেখি, আইন-আদালত, ডাক্তারি ও প্রকৌশলের সব জায়গায় বাংলা চালু হয়নি বা
বাংলা চালু করা যায়নি; উচ্চশিক্ষা বাংলায় হচ্ছে না এবং হওয়ানোর জন্য যে উদ্যোগ
দরকার তা শঙ্কিত হওয়ার মতো অপর্যাপ্ত তখন মনে হয় ভাষা নিয়ে আমাদের আবেগ, উত্তেজনা ও
আনুষ্ঠানিকতা প্রচুর। প্রতি তুলনায় বাংলা ভাষাকে অফিস-আদালত ও উচ্চশিক্ষার মাধ্যম
করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশে কি আমরা ডাক্তারি, প্রকৌশল, আইন,
অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসন, পদার্থবিদ্যাসহ জ্ঞানের অনেক শাখার উচ্চশিক্ষার
ব্যবস্থা বাংলায় করতে পেরেছি বা অদূর ভবিষ্যতে পারব? উল্লিখিত শিক্ষার প্রতিটি
শাখার প্রামাণিক গ্রন্থ, জার্নাল ও পঠনসামগ্রী বা রিডিং ম্যাটেরিয়াল ইংরেজিতে।
পরিভাষাগুলো এসেছে ল্যাটিন, গ্রিক বা অন্য কোনো ভিনদেশি ভাষা থেকে। এসব বইয়ের
প্রাঞ্জল ও সাবলীল অনুবাদ না করে, পরিভাষার সমস্যা সুরাহা না করে উচ্চশিক্ষায় কীভাবে
বাংলা চালু হবে? বরং ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য দরকার ইংরেজি আর আইটি শিক্ষা ও পেশার
জন্য ইংরেজির বিকল্প নেই।
ইংরেজি জানা, শেখা ও এ ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠা শুধু
চাকরি নয়, ৫ হাজার বছর ধরে মানুষের সমাজে জ্ঞানবিজ্ঞানের যে বিশাল ভান্ডার গড়ে
উঠেছে সেখানে প্রবেশ করে কারও পক্ষে মণিমুক্তা সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য। তবে ভালো
ইংরেজি জানার আগে বা সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষা বাংলাও জেনে নিতে হবে। আর যারা ভালো
বাংলা জানেন তাদের ইংরেজি ভাষার জ্ঞানও উঁচুমানের। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ থেকে
শুরু করে সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সুফিয়া কামাল, আহমদ ছফা, সৈয়দ আবুল
মকসুদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেলিনা হোসেনরা যেমন
বাংলা ভাষার প্রকৌশলী তেমন ইংরেজিতেও তাদের ছিল বা রয়েছে গভীর দখল। ইউরোপে অনেকেই
মাতৃভাষা শেখার পরও দুটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখেন। আমাদের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
ছিলেন অনেক ভাষায় পণ্ডিত।
কথাটা হচ্ছে ইংরেজি পড়া, জানা ও দক্ষ হওয়া দোষের
কিছু নয়; বরং বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইংরেজি ভালো জানাটা অপরিহার্য।
কিন্তু তার আগে মাতৃভাষা বাংলাকে ভালো করে জানতে হবে। শুধু কথ্য ভাষা, পত্রিকা পড়া
আর দু-তিন খানা দরখাস্ত লেখা নয়; একদম প্রমিত বাংলা ভাষা জানতে হবে, শুদ্ধ করে
বলতে ও লিখতে হবে। আর সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সর্বত্র বাংলা চালু করতে হবে।
ফরেন মিশন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি এসব জাগায় ইংরেজি চলবে।
তবে অফিস-আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চালু করতে হলে শুধু কথা দিয়ে হবে না,
কার্যকর উদ্যোগ চাই।
আদালত ও আইন শিক্ষায় বাংলা কেন চালু করা যাচ্ছে না, এ
ব্যাপারে আলোচনা করলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে
ইংরেজিতে রায় প্রদান করাই প্রথা। দশকের পর দশক ধরে তা চলে আসছে। সাবেক প্রধান
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে বলেছিলেন,
সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও বাংলায় রায় প্রদান করবেন। সাবেক
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, আইনের ধারাগুলো ইংরেজিতে হওয়ায় এবং বাংলা ভাষায় লেখা
আইনের বই না থাকায় সর্বোচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা
দেখা দেয়।
বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা হচ্ছে,
দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন, কার্যবিধিসহ অধিকাংশ মূল আইন প্রণীত হয়েছিল ব্রিটিশ
ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা তাদের মাতৃভাষা ইংরেজিতে। ভিনদেশের ওই ইংরেজ শাসকরা
আদালতের যে বিন্যাস সাজিয়ে দিয়েছিলেন এখনও তা বহাল আছে। বাংলাদেশের আইন ও
বিচারব্যবস্থা ব্রিটেনে বিকশিত কমন ল সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ দেশের আইন
শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থায় মূলত ইংলিশ আইনের নীতিমালা, ম্যাক্সিম ও মামলা পড়ানো ও
অনুসরণ করা হয়। আমরা কি আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের
উপযোগী করতে পেরেছি? এর উত্তর প্রীতিকর নয়।
বাংলাদেশে যেসব শিক্ষার্থী এখন বিভিন্ন পাবলিক ও
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন সম্মান অধ্যয়ন করতে আসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
পর্যায়ে আইন বিষয়ক কোনো কোর্স না থাকায় প্রথম দুই বছর অথবা প্রথম ছয় সেমিস্টার
আইন, আইনের নীতিমালা, আইনের ভাষা, পরিভাষা ও বিষয়বস্তু বোঝার জন্য তাদের রীতিমতো
যুদ্ধ করতে হয়। এর কারণ বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান না থাকা। দ্বিতীয় কারণ
ভাষা। সাবেক প্রধান বিচারপতি যেমন বলেছেন, আইনের প্রায় সব প্রামাণিক ও নির্ভরযোগ্য
গ্রন্থই ইংরেজিতে।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, স্বল্পসংখ্যক আইনের শিক্ষার্থী
যারা অত্যন্ত মেধাবী বা আইন বিষয়ে যাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে এবং যারা পরে
আইনের শিক্ষক, গবেষক, বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন তারাই ভাষার
দেয়াল ভেদ করে আইনের ভাষা ও নীতিমালার সৌন্দর্যে অবগাহন করতে পারেন, বিচিত্র সব
মামলার ভান্ডার থেকে তুলে আনতে পারেন মণিমুক্তা। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বল্পসংখ্যক
মেধাবীর জন্য আইনকে কেন ‘রক্তকরবীর রাজা’র মতো বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে
সর্বসাধারণের কাছ থেকে?
প্রায়ই মনে হয়, বাংলাদেশে আইনের ভাষা দিয়ে সাধারণ মানুষ
ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে এক দুর্ভেদ্য ও দুর্বোধ্য দেয়াল রচনা করা হয়েছে। ওই
দেয়াল ভেদ করে শেষ পর্যন্ত আইনের ভাষার সৌন্দর্য, বিষয়বস্তুর যথার্থতা, সংজ্ঞার
বিমূর্তায়ন বুঝতে সমর্থ হন গুটিকয় মেধাবী ও প্রশিক্ষিত বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষক ও
গবেষক। বাংলাদেশের আইন হয়ে গেছে রক্তকরবীর রাজার মতো অভিজাত ও নিঃসঙ্গ। আইন ভিনদেশি
ভাষা দিয়ে, ভাষার চারদিকে জটিল ও দুর্বোধ্যতার দেয়াল তুলে নিজেই হয়ে পড়েছে
অবরুদ্ধ।
আইনের ভাষা প্রাঞ্জল ও ব্রাত্যজনের বোধগম্য করার
উদ্যোগ সর্বপ্রথম গ্রহণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এতদ্সত্ত্বেও
জাতির জনকের হত্যার ১২ বছর পরে বাংলা ভাষা সর্বত্র প্রচলনের জন্য আইন প্রণীত হয়
১৯৮৭ সালে। আইন প্রণয়ন করেও অফিস-আদালতের সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু করা যায়নি।
ডাক্তারি পাঠ ও গবেষণা, প্রকৌশল, ওষুধ-প্রযুক্তি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত,
ব্যবসায় প্রশাসন ও অণুজীববিদ্যার উচ্চতর পড়াশোনা কতটা বাংলায় করা যাচ্ছে? বর্তমান
অবস্থায় এসব বিশেষায়িত বিষয়ের মানসম্পন্ন ও প্রামাণিক পড়াশোনা ইংরেজি ছাড়া কি সম্ভব?
এসব বিশেষায়িত বিষয় বাংলায় পড়তে ও পড়াতে হলে রাষ্ট্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে
এবং বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানকে উল্লিখিত বিষয়সমূহের প্রামাণিক সব গ্রন্থ ও
জার্নালের বাংলা অনুবাদের ব্যবস্থা করতে হবে।
কয়েক দশক ধরে বাংলা ভাষায় আইন প্রণীত হচ্ছে। উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু কয়েকটি রায় বাংলায় দেওয়া হলেও প্রচলিত নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি, মামলার রায় বরাবরের মতো এখনও মূলত দেওয়া হয় ইংরেজিতে। মোদ্দা কথা, আমরা যদি বাংলাকে আইন শিক্ষার মাধ্যম করতে চাই, আইনকে যদি সর্বসাধারণের বোধগম্য করতে চাই, যদি প্রত্যাশা করি মামলার রায় লেখা হবে প্রমিত বাংলায় তাহলে আইনের ভাষা সহজবোধ্য করতে হবে। আইনের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে হবে, ল রিপোর্টগুলো বাংলায় বের করতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত আইনের নিত্যনতুন প্রামাণিক বইগুলো দ্রুততার সঙ্গে অনুবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। উল্লিখিত কাজগুলো সহজ নয়। এজন্য প্রয়োজন হবে একদল মেধাবী, উদ্যমী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী, গবেষক ও আইনের খসড়া প্রণয়নকারী বা ড্রাফটসম্যান যাদের অতি অবশ্যই হতে হবে বাংলা, ইংরেজি ও আইন বিষয়ে সুপণ্ডিত।