সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:১০ পিএম
টেকসই উন্নয়নের
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিরাপত্তা। ধারাবাহিক চার মেয়াদসহ পঞ্চমবারের মতো আওয়ামী
লীগ সরকারের জন্য গর্ব করার মতো অনেক উন্নয়নযজ্ঞ তারা সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণ। নদীর
তলদেশে সুড়ঙ্গপথ দেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু
টানেলের নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার যে চিত্র ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। এ টানেলের ভেতরে-বাইরে ধারাবাহিকভাবে
দুর্ঘটনা ঘটছে এবং ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পর দিন
থেকে এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাতটি দুর্ঘটনায় দুজন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। মর্মন্তুদ
ঘটনাগুলোর পর আইনি কার্যক্রমের জন্য পুলিশের ডাক পড়লেও দায়িত্বপালনে ব্যবস্থাপনার জটিলতায়
তাদের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রম ও আইনি ব্যবস্থা
গ্রহণের জন্য পুলিশের গাড়ি টানেলমুখী হলে পরিশোধ করতে হচ্ছে টোল।
সঙ্গতই প্রশ্ন
জাগে, বঙ্গবন্ধু টানেলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার নিরাপত্তা রক্ষায় কেন
জিইয়ে আছে জটিলতা। জনস্বার্থে কিংবা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনে পুলিশকে দায়িত্ব
পালন করতে গিয়ে কেন টোল দিতে হবে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ২০২১ সালে টানেলের
দুই প্রান্তে দুটি থানা নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হলেও এখনও অনুমোদন পায়নি। প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে এ-সম্পর্কিত যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে বলা যায়, আমলাতান্ত্রিক
ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে প্রস্তাবটি ঝুলে আছে। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের
(সিএমপি) তরফে ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত সচিবালয়ে গিয়ে
আটকা পড়েছে। আমাদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার
ক্ষেত্রে টানেলের দুই প্রান্তে থানার অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি টানেলের ভেতরে-বাইরে
নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা সময় ক্ষেপণ না করে নিশ্চিত করা উচিত।
টানেলের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা এবং পুলিশের দায়িত্বপালনে আরও কিছু অসঙ্গতির তথ্য মিলেছে টানেল প্রকল্পের
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাতে। ওই সুড়ঙ্গপথটি কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের দূরত্বই
শুধু কমায়নি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব যে ফেলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
টানেলটি বহুমুখী কল্যাণের দ্বার উন্মোচন করলেও এর ভেতরে-বাইরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত। আমরা জানি, এ সুড়ঙ্গপথটি মহাসড়কের সক্ষমতাকে পূর্ণতা
দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে মানুষের সন্তুষ্টির স্তরও অনেক উচ্চতায় পৌঁছেছে সন্দেহাতীতভাবে
তা-ও বলা যায়। আমরা এও জানি, উন্নয়নদর্শনের মূল কথাই হলো, জনগণের কল্যাণ ও সুবিধা নিশ্চিত
করার পাশাপাশি প্রশ্নহীন নিরাপত্তা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু টানেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার
বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা লাল ফিতার কবলে পড়ে থাকা দুঃখজনক। আমরা আশা করব,
বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনাটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিদ্যমান
জটিলতার নিরসনে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশে প্রথম নদীর
তলদেশে নির্মিত সুড়ঙ্গপথ নিরাপত্তাহীন থাকবে তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ সুড়ঙ্গপথটির
অর্থনৈতিক তাৎপর্য ও বহুমুখী গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম শহর শুধু কক্সবাজার,
টেকনাফ ও মাতারবাড়ীর মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই করেনি, একইসঙ্গে
চট্টগ্রাম বন্দর ও প্রস্তাবিত বে-টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরের মধ্য দিয়ে
আমদানি-রপ্তানির পথ সুগম করতেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী
ও দূরদর্শী উন্নয়ন পদক্ষেপের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে নির্মিত এ সুড়ঙ্গপথটির
আগে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন শুধু সক্ষমতার নির্দশনই
নয়, এর পূর্বাপর আরও উন্নয়নযজ্ঞের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী দৃষ্টান্তও বটে।
দেশের ধারাবাহিক বলিষ্ঠ উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সব অগ্রাধিকারপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে
যে ঘাটতিগুলো রয়েছে তা দূর করা মোটেও দুরূহ নয় বলেই আমরা মনে করি। প্রয়োজন শুধু সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর যথাযথ নিষ্ঠা। দেশের যুগান্তকারী এত বড় বড় স্থাপনা ইতোমধ্যে নির্মিত
হয়ে উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক এত চওড়া হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তাজনিত জটিলতার মতো সেই তুলনায়
অতি নগণ্য বিষয়ের সুরাহায় বিলম্ব কোনোভাবেই কাম্য নয়।