সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৪২ এএম
আমাদের সমাজে
একটি কথা বহুল প্রচলিত যে, আলোচনা-পর্যালোচনায় দায়িত্বশীলরা যতটা পারঙ্গম, যথাযথভাবে
দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় বেশি উদাসীন। সম্প্রতি
বাংলাদেশের টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন (জিআই) পণ্য
হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি ওই প্রচলিত কথারই যেন প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের
বাংলাদেশের শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনামও যেন এরই আরেক প্রতিফলন। ‘হেলায় হাতছাড়া দেশের
গৌরব!’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, তা আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের
দায়িত্বপালনে নিষ্ঠার ঘাটতিও তুলে ধরে। ভিন দেশি সমনামা পণ্যের জিআই সনদ পেতে উদ্যোগ
নেই সরকারের এই বার্তাও স্বস্তির নয়। তা ছাড়া সমনামা পণ্যের ক্ষেত্রে আইনের যে অস্পষ্টতা
বিদ্যমান তাও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অসংগতির চিত্রই তুলে ধরে। আমরা মনে করি, ইতিহাস-ঐতিহ্য
রক্ষায় দায়িত্বশীলদের এ ধরনের উদাসীনতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মালদা ফজলি আম,
মালদা লক্ষ্মণভোগ, মালদা ক্ষীরশাপাতি, নকশিকাঁথা, সুন্দরবনের মধু, উপাধা জামদানি ইত্যাদি
কিছু পণ্যের জিআই স্বীকৃতি ভারতের নিয়ে নেওয়া আমাদের গাফিলতি-উদাসীনতার বিষয়গুলো আরও
স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আমরা জানি, জিআইসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় দেখভাল করে শিল্প মন্ত্রণালয়।
কোনো পণ্যের জিআই সনদ পেতে হলে কোনো একটি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের
অধীন পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক ইত্যাদি অবগত করে ডিপিডিটি বরাবর আবেদন করতে
হয়। ওই মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় জিআই সনদের জন্য কাজ
করেন। আমরা জানি, এক একটি দেশের এক একটি পণ্য সেই দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রতীক
চিত্র তুলে ধরে। আমাদের এমন বহু পণ্য আছে, যা সীমানার ভেতরে তো বটেই, বহির্বিশ্বেও
ওই পণ্য জাতীয় পরিচয়ের বিকাশ ঘটায় ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের
এই ঐতিহ্য কতটা সুরক্ষিত। এই প্রশ্নের উত্তর যে সুখকর নয়, তা সম্প্রতি টাঙ্গাইল শাড়ির
ক্ষেত্রে ভারতের উত্থাপিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। দেশের
ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশেষ করে যেসব ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় কিছু বিষয়ে জোরালো
অভিব্যক্তি বহিরাঙ্গনে অন্যভাবে উপস্থাপিত করেÑ এই বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হলেও
স্বীকৃতির মাধ্যমে এর সুরক্ষায় ঘাটতি যে আরও ব্যাপক তাও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।
আশঙ্কা রয়েছে,
আমাদের ঐতিহ্যবাহী, ইতিহাস স্বীকৃত মসলিন নিয়েও। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মসলিনের মূল জায়গা
ঢাকা। মসলিনের জিআই বাংলাদেশের আছে। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হলোÑ এই স্বীকৃতি ভারত পাল্টাতে
মরিয়া। সমনামা পণ্যের সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আইন রয়েছেÑ এসব আমাদের অজানা
নয়। কিন্তু সেই আইন অনুসারে সরকারি পর্যায়ে যথাযথ পদক্ষেপের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি রয়েছে
উদ্বেগটা সেখানেই। ২০২০ সালে ভারতের পক্ষ থেকে জিআই সনদ প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাংলাদেশের
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এ ব্যাপারে এত দিন কিছু জানতেনই নাÑ এমন বার্তা আমাদের অধিকতর
উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা আশা করব দায়িত্বহীনতা-উদাসীনতার পাট চুকিয়ে স্ব-স্ব
ক্ষেত্রে সবাই যথাযথ দায়িত্বপালনে সক্রিয় হবেন। দেশের ঐতিহ্য-গৌরব রক্ষা করার দায় কমবেশি
প্রত্যেক নাগরিকের থাকলেও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে দায়িত্ব রয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর।
শুধু এক্ষেত্রেই নয়, আরও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা আমাদের সম্ভাবনা কিংবা সাফল্যের আলো কাঙ্ক্ষিত
মাত্রায় ছড়িয়ে দিতে পারিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার বায়ান্ন
বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্তে আমাদের অর্জনের খতিয়ান অনেক বিস্তৃত- তা অসত্য নয়। তবে
এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই, তাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। আমরা মনে করি, শুধু অর্জিত
বিষয়গুলোর আনন্দ চর্বিত চর্বণ করে তুষ্ট না থেকে বরং অন্য আরও রাষ্ট্রীয় বিষয়ের মতো
আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী প্রতিটি পণ্যের জিআই স্বীকৃতি আদায়ের জন্য করণীয় সবকিছু সম্পন্নের
প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি। টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের নয়, ভারতের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে
আমাদের সরকারের দায়িত্বশীলদের নিদ্রা যে অতি বিলম্বে ভঙ্গ হলো এর খেসারত কে দেবে?
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার
বৈঠকে টাঙ্গাইল শাড়িসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই পণ্য হিসেবে
স্বীকৃতির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর আগে টাঙ্গাইল শাড়িসহ তিনটি পণ্যের জিআই সনদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে
শিল্প মন্ত্রণালয়ের তরফে হস্তান্তর করা হয়। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন দায়িত্বশীলরা
কোন নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিলেন। আমরা মনে করি, এই তিক্ত অভিজ্ঞতা উদাসীনতা-দায়িত্বহীনতার
পরিসমাপ্তি ঘটাবে। যদি সব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকেই কথা বলতে হয় কিংবা দৃষ্টি রাখতে
হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বপালন নিয়ে নেতিবাচক
প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। আমরা আশা করব, দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব পালনে দিবানিদ্রায় আচ্ছন্নের
ঘোর কাটবে।