পরিপার্শ্ব
এস আলী দুর্জয়
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৯:৫৯ এএম
‘আসছে ফাল্গুনে
আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো’Ñজহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ভাষা
আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া জাতিগত চেতনার ধারাবাহিক ফসল। ফেব্রুয়ারি
ভাষার মাস, ফাল্গুনকে আমন্ত্রণের মাসও বটে। এ মাসেই মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের যে অভূতপূর্ব
নজির স্থাপিত হয়েছে তার চেতনারই ধারাবাহিকতা মেলে বইমেলায়। জাতির ধ্যানধারণা ও সৃজনশীল
মেধা বিকাশের মোহনা বইমেলা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম মিলে মানচিত্রে ঠাঁই
পায় পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র। জনসংখ্যা ও জাতীয় অবদানে পূর্ব পাকিস্তানের ভূমিকা
বেশি থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি প্রবল বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ
মানুষ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর
পুলিশ গুলি চালালে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিকসহ নাম না জানা শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়
একুশের রাজপথ।
ভাষাশহীদের রক্তাক্ত
সেই পথ বেয়েই বাঙালি স্বাধিকার অর্জনের দিকে এগিয়ে যায়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে
দেশের মানুষের চেতনার যে উন্মেষ ঘটেছিল তারই স্মরণে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়
অমর একুশে বইমেলা। ভাষার মাসে ফেব্রুয়ারির বইমেলা সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের মিলনমেলা হয়ে ওঠে। নতুন ও চিরায়ত সাহিত্য প্রকাশের মেলা হিসেবেই
এর আবেদন শেষ নয়, এ এক প্রাণের মেলা। আত্মার সঙ্গে আত্মার যেমন সম্পর্ক, তেমন বইয়ের
সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক। খুদে পাঠক থেকে শুরু করে তরুণ, প্রবীণ সব বয়সের পাঠকের উপস্থিতি
বাঙালি জাতিসত্তাকে এক অন্যরকম সম্প্রীতির সম্ভারে গেঁথে দেয়। বাংলা ভাষাভাষী লেখকের
প্রকাশিত নতুন ও পুরান বইয়ের সঙ্গে আমাদের যেমন পরিচয় ঘটে; তেমন দেশের অন্য অধিবাসীদের
নিজস্ব জীবনধারার সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা সংবলিত বইয়ের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে সবার। সাহিত্য
ও সংস্কৃতি চর্চার মূল অবলম্বন বই। আর এ বই প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে
আসছে অমর একুশে বইমেলা। এ মেলায় বই প্রকাশনা ছাড়াও আড্ডা, মঞ্চনাটক, গান, আবৃত্তিসহ
নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে সংস্কৃতির অমিয় সুধা।
একুশ ঘিরে বইমেলাকেন্দ্রিক এ উৎসবের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনা ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বইমেলার মূল স্থাপনযোগ্য বিষয় হলো অমর একুশের চেতনা। অম্লান এ চেতনা জিইয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে প্রকাশনাশিল্পে নিয়োজিতদের। প্রকাশনাশিল্পের মানোন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন বই প্রকাশের দায়বদ্ধতাও প্রকাশক ও প্রকাশনীসংশ্লিষ্টদের। লেখক ও প্রকাশককে বইয়ের প্রচার ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে আলাদা দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি বইমেলা যেন একটি আয়োজনে পরিণত হয়েছে। প্রাণের মিলন কিংবা সাহিত্যের প্রসারের বদলে প্রচারই মুখ্য হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে প্রকাশনীর বই যাচাইবাছাইয়ের আলাদা প্যানেলের অভাব দায়ী, এমন অভিমত অনেকের। বইমেলায় দর্শনার্থী আসছেন কিন্তু বই বিক্রি হচ্ছে কম, এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। বইমেলায় মেধার প্রচার-প্রসারের বিষয়টি নিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকৌশল নির্ধারণ জরুরি।