ফিলিস্তিন সংকট
বিদ্যা কৃষ্ণান
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৪:১২ পিএম
গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতির হৃদয়বিদারক সংবাদ পশ্চিমা গণমাধ্যমে দেখতে
চাইলে পাঠককে হতাশ হতে হবে। ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইতিহাসের সবচেয়ে
জঘন্য জাতিগত নিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম অবশ্য একের পর এক অদ্ভুত
দাবিদাওয়া উপস্থাপন করছে। ঘটনা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তারা একটি পক্ষ অবলম্বন করে চলেছে।
ইসরায়েলের এই নিধনযজ্ঞকে তারা সঠিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। পক্ষপাতদুষ্ট এ আচরণ
করতে গিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম নীতি-নৈতিকতার দায় এড়িয়ে চলছেন। এমনটি নতুন কিছু নয়।
বিগত ৭৫ বছর ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের নৃশংসতার ক্ষেত্রে তারা এমন অবস্থানই ধরে রেখেছে।
হামাসের হামলার এক বছর আগে ২০২২ সালের ৬ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমসে গাজার
জাবালিয়া ক্যাম্পের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে ছয় ফিলিস্তিনি শিশু
নিহতের খবর পাওয়া যায়। দাবি করা হয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষের ফলে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা
ফিলিস্তিনি নিহত হয়। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, ফিলিস্তিনের একটি রকেট ভুলবশত সাধারণ মানুষের
ওপর পড়ে। তবে ঘটনার কয়েক দিন পর ইসরায়েল জাবালিয়া ক্যাম্পে ওই হামলার দায় স্বীকার করে।
সাংবাদিকতার ভাষায় এমন সংবাদ লোমহর্ষক। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদটি সেভাবে উপস্থাপন
করেনি। বরং প্রতিবেদন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তারা অপেশাদারসুলভ আচরণ করেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে
গড়ে উঠেছে আদর্শের ভিত্তিতে। অথচ ফিলিস্তিন ইস্যুতে তথ্য-উপাত্ত যাচাইবাছাইয়ের ভিত্তিতে
তারা সংবাদ উপস্থাপনের দায়িত্ব পালন করছে না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এই মুহূর্তে আরও
সমস্যায় জর্জরিত। আর সেটি হলো উপনিবেশবাদী ধারণা।
সংঘর্ষ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা সব সময়ই জটিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
নিউজরুমে বর্ণবাদী আচরণের নানা উপাদান থাকলেও ভুলত্রুটির আশঙ্কা থাকে। পশ্চিমা গণমাধ্যম
ফিলিস্তিন সংকটকে ব্যবহার করছে তবে এর প্রতিবেদন উপস্থাপন করছে না। টেক্সবুকের ভাষায়
পশ্চিমা গণমাধ্যম ‘উপনিবেশের পক্ষের সাংবাদিকতা’ করছে। উপনিবেশ সাংবাদিকতার মাধ্যমে
কোনো উপনিবেশের শক্তিমত্তা গর্বের সঙ্গে জাহির করে থাকে। এ ধরনের সাংবাদিকতায় সাংবাদিকরা
তাদের রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকেন এবং তাদের প্রতিটি সমরাভিযানকে
ন্যায্য বলে দাবি করেন। পশ্চিমা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আমরা এই আধিপত্যমূলক সংবাদ পরিবেশনের
চিত্র পাই। তবে আধিপত্যের এই কর্মকাণ্ড যে ঘটনা উপস্থাপন করে তা সত্য নয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম
এখন গাজায় বিজয়ীদের কথা ঘোষণা করছে। প্রাক-উপনিবেশী দেশগুলো নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে
অতীতে সংবাদমাধ্যমকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তা এই যুদ্ধেও আমরা দেখছি। মহামারি সংকট
নিয়ে যারা প্রতিবেদন লিখেন তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভুলপথে পরিচালিত হন না। এমনকি
রোহিঙ্গা গণহত্যার পর ধর্ষিত নারীদের কাছে তথ্য সংগ্রহের সময় অনেক প্রতিবেদককে দেখেছি
জিজ্ঞেস করতে, কতজন আপনাকে চেপে ধরেছিল। ফিলিস্তিন সংকটের ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে
না। এই সংকটের ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণমাধ্যম বিজয়ীদের পক্ষে। যে পক্ষ আগ্রাসী এবং মানবতাবিরোধী
কার্যক্রম চালাচ্ছে তাদের বিজয়ী হিসেবেই তারা উপস্থাপন করছে।
উপনিবেশবাদী সাংবাদিকতায় ভাষা একটি বড় অস্ত্র। ফ্রাঞ্জ ফার্নোর ‘জগতের
লাঞ্ছিত’ বইটিতে উপনিবেশের লাঞ্ছিতদের গুরুতপূর্ণ পরিসংখ্যান কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যা
হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে যা উপনিবেশবাদীরা ব্যবহার করে। ১৯৬১ সালে লেখা বইটি আজ
ফিলিস্তিন সংকটের ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণমাধ্যমের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মৃতের
সংখ্যা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এখানে মানবিকতার স্পর্শ নেই। নভেম্বরে টাইমস অব লন্ডনের
এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণে ১৪০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৪০ অপহৃত।
সৃষ্ট যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ১০ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে দাবি করা
হচ্ছে।’ পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসরায়েলির মৃতের সংখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। অথচ ফিলিস্তিনিদের
মৃত্যু আনুমানিক পরিসংখ্যান হয়ে যায়।
পশ্চিমা গণমাধ্যম পরিণত হয়েছে গুজবের যন্ত্র। তাদের মতে গাজা উপত্যকা
ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইজরায়েল সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। গাজা তীর, পূর্ব জেরুজালেম, ইরান,
লেবানন, ইয়েমেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে আগ্রাসী পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা জাতীয়
নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছে। হামাসকে পুরোপুরি নির্মূলের এই প্রক্রিয়ায় শুধু মুসলমানই
নয়, জাতিসংঘের কর্মী, হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরাও নিহত হতে পারে। তারপরও সামান্য
কিছু সংগঠনই আলোচনা করে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসন শান্তি ফিরিয়ে আনবে না। পরিস্থিতি এমন
হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখন শুধু উপনিবেশবাদী আর ঔপনিবেশ টিকে আছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অসংখ্য
শিশুর মৃতদেহের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হবে। গুজব রটাতে গিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম
সত্য উপস্থাপন করছে না। পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন জানাচ্ছে। তারা
যুদ্ধ করছে রাষ্ট্র ও গৃহহীন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। পুরো পৃথিবীকে মানবাধিকার, মূল্যবোধ,
ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া পশ্চিমা শক্তিগুলোই এখন দ্বিমুখী আচরণ করছে।
প্রাক-উপনিবেশবাদী যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র ও ভালো রাজনীতির গুরুত্ব
অপরিসীম।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমা সাংবাদিকদের হাতও রক্তে রঞ্জিত। ফিলিস্তিনের
পক্ষের কথাগুলোকে তারা অবান্তর বা অপ্রয়োজনীয় হিসেবেই তুলে ধরেছে। কিছু ফিলিস্তিনিকে
অবশ্য তাদের প্ল্যাটফর্মে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভারসাম্য এবং স্বচ্ছ সাংবাদিকতার
স্বার্থেই তারা নাকি এসব সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘটিত বৈষম্য নিয়ে
আলোচনার সুযোগ তাদের নেই। তারা শুধু মৃত স্বজনের জন্য আহাজারি করতে পারে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ পশ্চিমা সাংবাদিকতার অন্তিম সময়ের কথাই বলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে তথ্যের জন্য সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয় না। পুরো বিশ্ব নিজ চোখে পশ্চিমা গণমাধ্যমের এই অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে। পশ্চিমা রাজনীতিকরা ব্যর্থ হচ্ছেন এ নিয়ে এখন ব্যাপক সমালোচনা হয়। কিন্তু পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া কিংবা উদারবাদী ধ্যানধারণা নিয়ে আলোচনা হয় না। গাজা সংকটে পশ্চিমা উদারবাদ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে পশ্চিমা সাংবাদিকতার স্বচ্ছতা। পশ্চিমা গণমাধ্যম এখনও প্রতিবেদনগুলোতে তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন সাধারণ মানুষ নিহতের বিষয়টি অবধারিত বা কোনো কিছু করার ছিল না। শব্দের ব্যবহারে বোমাবর্ষণের নেতিবাচক অভিঘাতের বিষয়টি লুকিয়ে যাচ্ছে। সংঘর্ষের সময় নিউজরুমের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের দিকেই আমরা তাকিয়ে থাকি। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যম বর্ণবাদী ভূমিকা রাখছে। উপনিবেশবাদী এই সাংবাদিকতা থেকে আমরা মুক্ত হতে চাই। যুদ্ধবিরতির দাবির বিষয়টি আজ তাদের জোরশোরে উপস্থাপন করা উচিত।
আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন