ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২২ ২০:০৩ পিএম
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২ ২০:১৯ পিএম
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইউরোপব্যাপী এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রকে বদলে দেবে কি না এসব নিয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে বেশ চর্চা হচ্ছে। বিষয়গুলো যে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে, এমনটা নয়; বরং বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে প্রচলিত ধারার রাজনীতিকে মানুষ যেন আগের মতো আর নিতে পারছে না। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবল থেকে বের হয়ে একটি শান্তিকামী বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশায় যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভেতর রাষ্ট্রসমূহের সম অধিকার এবং সার্বভৌমত্বের আওতায় নিজস্ব ভূখণ্ডগত অধিকার, বিশেষ করে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের অস্তিত্ব ব্যাপকাংশেই কতিপয় বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। একইসঙ্গে বৃহৎ তথা শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের ভেতরেও চলছে প্রচলিত ধারার সরকারের বিরুদ্ধে একধরনের অনাস্থা। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, অর্থাৎ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে একধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের ক্রমশ উত্থান ভাবিয়ে তুলেছে অনেককে। এই ভাবনার মূল বিষয়টি হচ্ছে বিশ্ব কি তবে একটি মৌলিক পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে?
গত ২ অক্টোবর লন্ডনে কয়েক হাজার লোকের সমাবেশ, সারা দেশ থেকে সেন্ট্রাল লন্ডনে জড়ো হয়ে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা, যার মূল বিষয় হচ্ছে মানুষ বলতে চাচ্ছে ব্রেক্সিটের আমলে তারা ভালো নেই, তারা আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চান। এই প্রতিবাদের নেপথ্যের নেতৃবৃন্দ বলতে চাইছেন, তারা যে প্রতিবাদের কর্মসূচি শুরু করেছেন সেটা আগামী দিনগুলোতে অব্যাহত থাকবে এবং তারা এটা প্রত্যাশা করেন যে, সামনের দিনগুলোতে আরও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তাদের এই দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। মূলতঃ ইইউ থেকে বিচ্যুত হবার পর থেকে যুক্তরাজ্যের মানুষ যেন একধরনের আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছেন। তাদের এই আত্মপরিচয়ের মূল জায়গাটি হচ্ছে তারা নিজেদের ইউরোপীয় মনে করলেও কার্যতঃ ইউরোপ বলতে যে ইইউকে বোঝানো হয়, তারা সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের বাদে বাকি ইউরোপের অনেকাংশের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ব্যথিত করে। কিছুটা বাস্তবতা, কিছুটা আবেগের মিশেলে গণভোটের মাধ্যমে সামান্য ব্যবধানে ইইউ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার রায় আসলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে যারা গণভোটে বিচ্ছিন্ন হবার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তারা অনেকেই এখন আবার যুক্তরাজ্যকে ইইউ’র সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখতে চান। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই চাওয়াটি আরও বেড়েছে, বিশেষ করে কোভিড উত্তর এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক মন্দাবস্থাকে তারা এখন আর একা সামাল দিতে পারছে না। ২০১৬ সালের পর থেকে ৪ বার প্রধানমন্ত্রী বদলের পরও ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে টেনে নিতে পারছে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মূলত ইউরোপের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন দেশে বসবাস করলেও এক ইউরোপের ভেতর তারা যতটুকু নিজেদের সুরক্ষিত ভাবতে পারেন, অন্য কোনো পন্থায় এই বোধটা কাজ করার সুযোগ নেই।
এদিকে অতিসম্প্রতি আমরা দেখেছি ইউরোপের অপর দেশ ইতালিতে ৪৫ বছর বয়সি জর্জ মেলানি আজ থেকে ১০ বছর আগে ২০১২ সালে ব্রাদার্স অব ইতালি নামে যে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন, সেই উগ্র ডানপন্থী দলটি সবাইকে অবাক করে দিয়ে আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। ৫ কোটি ভোটারের দেশে আজ থেকে ৪ বছর আগেও এই দলটির মোট ভোট ছিল শতকরা ৪ শতাংশের নীচে, সময়ের বিবর্তনে পুরোনো রাজনৈতিক দল এবং হেভিওয়েট নেতাদের ওপর থেকে জনগণ তাদের আস্থা সরিয়ে নিয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা আজ ভীষণরকমভাবে কাজ করছে। এর মূলে অবশ্যই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তো রয়েছেই, যার ফলে ইউরোপের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। তারা সরাসরি ইইউ-বিরোধী না হলেও তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়ে সোচ্চার, যা আগের সরকারগুলো সেভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। এর বাইরে রয়েছে অভিবাসন সমস্যা। এই দলটি ইউরোপে নৌ অবরোধের পক্ষে, যাতে করে সিরিয়া থেকে শরণার্থীরা এসে ইউরোপের দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে না পারে। জর্জ মেলানির বিষয়ে সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো তিনি নিজেকে মুসোলিনির উত্তরসূরিদের সঙ্গে তুলনা করেন, আবার নিজেকে সরাসরি ফ্যাসিস্ট বলে স্বীকার না করলেও এমন এক পুরোনো স্লোগান বেছে নিয়েছেন, যা ছিল ফ্যাসিবাদীদের স্লোগান ‘‘ঈশ্বর, পিতৃভূমি এবং পরিবার।”
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনেকদিন ধরেই ডানপন্থী দলগুলো মাথা তুলছিল। ফ্রান্স, জার্মানি বা সুইডেনের মতো বেশ কিছু দেশে এসব দল প্রধান রাজনৈতিক দলের কাতারে উঠে আসছিল। অনেক দেশে তারা ক্ষমতার বেশ কাছাকাছি এসে গিয়েছিল। সুইডেনে গত সেপ্টেম্বর মাসের নির্বাচনে যে ফলাফল হয়েছে তাতে এই প্রথমবারের মতো দেশটিতে একটি উগ্র ডানপন্থী ও সাবেক নব্যনাৎসী দল ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস বা এসডি পার্টি ভোট পেয়েছে ২০.৬ শতাংশ অর্থাৎ সুইডেনের প্রতি পাঁচজনের একজন তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটি একটি উগ্র অভিবাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদী দল।
প্রকৃতপক্ষে ইউরোপজুড়েই ডানপন্থী দলগুলো অনেক দিন ধরেই শক্তিশালী হচ্ছিল। ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্ট, জার্মানিতে এএফডি, হাঙ্গেরিতে ফিডেস, সুইডেনে এসডি, স্পেনে ভক্স পার্টি, অস্ট্রিয়ায় ফ্রিডম পার্টি, ইতালিতে লিগ এবং ব্রাদার্স অব ইতালি - এ তালিকা আদৌ ছোট নয়। একেক দেশে একেক নামের দল হলেও এদের অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়বে। এরা সবাই কমবেশি জাতীয়তাবাদী, অভিবাসনবিরোধী, বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসনবিরোধী এবং তাদের এ বিরোধিতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামবিদ্বেষী চেহারা নেয়।
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের ঢেউ গোটা ইউরোপে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হলেও এর বাইরের চিত্রটাও কিন্তু মোটেই আলাদা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখেছি আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতে নরেন্দ্র মোদি, ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতার্তে, ব্রাজিলে বলসোনারোর মতো উগ্র ডানপন্থী নেতাদের বিজয়ী হয়ে আসতে। উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক এই সকল নেতার ওপর একসময় মানুষ ব্যাপকভাবে আস্থা অর্পণ করেছিল। তবে সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্বীকার করে নিতে হয় যে বিভিন্ন দেশে তাদের যেমন উত্থান ঘটেছিল, দ্রুত কিছু ক্ষেত্রে পতনও ঘটেছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল তারা তাদের দেওয়া মৌলিক পরিবর্তনের জায়গায় সেভাবে কাজ করতে পারেননি। আর সেই কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প এক মেয়াদের বেশি থাকতে পারেননি। ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বলসোনারোই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হতে পারেননি। ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতার্তে ডানপন্থী চেতনাকে ধারণ করে বিজয়ী হলেও ধীরে ধীরে তার একনায়ক হয়ে ওঠাকে জনগণ মেনে নিতে পারেনি। ভারতে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, হয়তো এর পরের মেয়াদেও নির্বাচিত হবেন, তবে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বলছে যে বিজেপির প্রতি মানুষের আস্থা আর আগের জায়গায় নেই। তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে পূর্বের সরকারগুলোর রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো মৌলিক এবং ইতিবাচক পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এখানে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য সবচেয়ে সুবিধার জায়গাটি হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস দল তাদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার মতো যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। সেই দৃষ্টিতে ভারতের মানুষকে খুব বেশি উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনাসম্পন্ন বলার সুযোগ নেই।
আজ ইউরোপের কিছু দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটলেও বিশে^র অপরাপর দেশগুলোর উদাহরণের প্রেক্ষিতে বলা যায় এই বিস্তার এবং ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও কোথাও রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের আসীন হওয়া অনেকটা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। আসলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করে কিছু ব্যক্তি এবং দল তাদের ব্যক্তিগত এবং দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা নিলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় গিয়ে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এর মূলে রয়েছে বৈশ্বিক এক পরিবর্তনশীল কাঠামো, যার বলয় থেকে মুক্ত নয় কোনো দেশই। আজকের যুক্তরাজ্য তাই তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে তুলে ধরতে গিয়ে যে ব্রেক্সিটকে বেছে নিয়েছিল, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে আবারও তারা ইইউ’র সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আন্দোলনে সামিল হচ্ছে।
আসলে আমরা একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আপাতদৃষ্টিতে বলা হচ্ছে যে দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটছে, কিন্তু বৈশ্বিক পরিসরে চিন্তা করলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। আজ আমরা না চাইলেও বিশ্ব এতটাই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যে, এর রেশ থেকে ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কোনো রাষ্ট্রই নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারছে না। এত শক্তিধর আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানকে ধরে কিন্তু এই বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে আমেরিকাকে আলাদা করে তুলে ধরতে পারেননি। সার্বিকভাবে আমরা যা দেখছি তা হলো উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান যেমন হচ্ছে, দ্রুত এটা নিয়ে মানুষের মনোভাবের পরিবর্তনও আসছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সম্প্রীতির বিশ্ব যেন সুদূরপরাহত!
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়