× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্রচিন্তা

ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:১৬ পিএম

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

রাজনীতিতে ফের শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। সম্প্রতি ঢাকায় আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নির্বাচনের শেষে এখন খেলা হবে রাজনীতির’। একই দিন বিএনপির ডাকে অনুষ্ঠিত কালো পতাকা মিছিলের সমাবেশে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘সরকার জনগণের নয়, ভারত-চীন-রাশিয়ার’। শীর্ষস্থানীয় একজন নেতার এ ধরনের বক্তব্য প্রীতিকর নয়, এমন মন্তব্য অনেকের। নির্বাচনোত্তর রাজনীতির মেরুকরণ ভিন্নমাত্রায় ঘটতে চলেছে। এমন পরিস্থিতি সার্বিকভাবে রাজনীতির জন্য শুভ নয়। আমরা জানি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক অবস্থা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নই আমরাও।

সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিন সংকট, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঁকবদল, অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব, চীনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রম-উত্থানের পাশাপাশি বড় ও উন্নয়নশীল শক্তিগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব মাল্টিপোলার বিশ্বে নানাবিধ জটিল সংকট তৈরি করেছে। সংকটের সময় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের কাছে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পেয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং তা বৈশ্বিক সংকটে প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও দেশগুলোর সাহায্যনির্ভরতার বাইরে গিয়ে নিজেদের সক্ষমতায় আমরা এগিয়েছি অনেক দূর। দৃশ্যমান উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। টানা চতুর্থবারসহ পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত আওয়ামী লীগ প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এ উন্নয়নের পথে রাজনৈতিক সংকট বড় প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। সংকট নিরসনেরও তেমন আভাস মিলছে না। এ সংকট জিইয়ে থাকলে মানুষের ভোগান্তি বাড়াবে বই কমাবে না।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশবিদেশের নানা মহল তো বটেই, কোনো কোনো দেশের সরকারও আমাদের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে ছিল। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অবস্থান অনেকের দৃষ্টিতেই ছিল কটু। এখন দেখা যাচ্ছে তারাই নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করায় আগ্রহ পোষণ করছে। রাজনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণের ধকল বেশ খানিকটা ভাবিয়ে তুলছে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñএ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা আমাদের কূটনীতি পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যানেল প্রশংসনীয় কাজ করেছে, এমন অভিমতও নানা মহল থেকে পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হয় বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক মধ্যকার স্বার্থের ভিত্তিতে। কূটনৈতিক চ্যানেল কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তার খুঁটিনাটি জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, একসময় চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে। কিন্তু আশির দশকের আগে এ দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে।

চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্থানের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব চলছে। বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধের সময় এ দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। কিন্তু পিং-পং ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে হেনরি কিসিঞ্জার একাধিকবার চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুযোগ তৈরি করেন। কিসিঞ্জারকে বারবার ডাকা হয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নিরসনে। অর্থাৎ কূটনৈতিক অন্দরমহলে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যার মাধ্যমে অনেক জটিল সমস্যার নিরসন করা সম্ভব হয়। আমাদের কূটনৈতিক ব্যবস্থার সামর্থ্য বিবেচনায় এমনটি ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং তা রাজনৈতিক কূটনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের বিষয়টিকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়। দেশের ইতিহাসে যেকোনো রাজনৈতিক সংকট সমাধান বিদেশিরা করেছে, এমন নজির নেই। তবে রাজনীতিতে যেকোনো সময় বাঁকবদল ঘটতে পারে। বিএনপি নিঃসন্দেহে একটি বড় দল। তাদের দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল থাকলে এবং তাতে ইতিবাচক কর্মকৌশলে জনসংযোগ বাড়াতে পারলে তা রাজনীতির শোভা বর্ধন করবে।

জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের মেরুকরণ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দলটির গৃহদাহের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। জিএম কাদের জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ উপনেতা হিসেবে মনোনীত হন এবং এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে ২৮ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। অন্যদিকে ওই দিনই রওশন এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জিএম কাদের ও দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। বিদ্যমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে, জাতীয় পার্টির রাজনীতি অনেকটা অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যেকোনো রাজনৈতিক দলে বিভাজন বাড়লে কর্মকৌশল প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত নেতৃত্বসংকট তীব্র হয়ে উঠলে দলের সমর্থক তো বটেই, নেতাকর্মীরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলে অন্তর্দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়তে পারে, এ আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতীয় পার্টি এখন এমন পরিস্থিতিতে রয়েছে যে অক্সিজেন দিয়েও দলটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। দলের প্রধান নেতৃত্বের একদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভাই, অন্যদিকে তার ভ্রাতৃবধূ রওশন এরশাদ। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বেই যেখানে দ্বন্দ্ব প্রকট, সেখানে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান কে করবেনÑ সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতীয় সংসদে দলটি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু দলটির মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা প্রাপ্তির প্রত্যাশাও অনিশ্চয়তার ছায়ায় ঢেকে রয়েছে।

মার্চে স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছে এতে দলীয় প্রতীকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। অথচ আওয়ামী লীগই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কাঠামোগত সংস্কার এনেছিল। তাদের সে অবস্থান থেকে আপাতত দলীয় ব্যানারের বাইরে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে এ সিদ্ধান্ত যথার্থই মনে করি। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনের চরিত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চরিত্র থেকে ভিন্ন। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন হলে প্রার্থী সম্পর্কে ভোটারের স্পষ্ট ধারণা থাকে। আমরা দেখি, একই পরিবার থেকে একাধিক সদস্য এ কাঠামোর নির্বাচনে অংশ নেন। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনে এক ধরনের বাড়তি উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে। কিন্তু যখন দলীয় প্রতীকের অধীনে কেউ নির্বাচনে অংশ নেন তখন ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা একাডেমিয়ার ভাষায় ফরমাল পাওয়ার তার ওপর বর্তায়। এ ফরমাল পাওয়ারের দরুন কোনো কোনো প্রার্থী জেতার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এমন নজির আমাদের সামনে আছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনে স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় প্রার্থীও জয়যুক্ত হন। দলীয় প্রতীক থাকলে প্রার্থীর জেতার চাপ থাকে বেশি, অন্তত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় দলের প্রার্থিতা পেলে জেতার প্রবণতাই থাকে মুখ্য।

বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সরকার পরিচালনায় উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সামনে আরও গুরুত্বের সঙ্গে যূথবদ্ধভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট যদি জিইয়ে থাকে তাহলে ফের বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগও সৃষ্টি হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশ্বায়নের এ যুগে বৈশ্বিক সম্পর্কোন্নয়নের নতুন কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন কাঠামো, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট মোকাবিলায় যা কিছু করণীয় এ বিষয়ে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। আমরা দেখেছি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে বিদেশিরা নানা সময়ে মন্তব্য করে। তাদের এ সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ বিদেশিদের মন্তব্য অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন তীব্র করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। অর্থনৈতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও মনোযোগ আরও গভীর করতে হবে। সন্দেহ নেই, বিদ্যমান বাস্তবতা এও ইঙ্গিত করে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট বাড়বে বই কমবে না। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক উদার রাজনৈতিক পরিবেশ বিকশিত করার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়নের মাত্রা নতুন ছকে কষতে হবে।

  • রাজনীতি-কূটনীতি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা