দিবস
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১৯:১২ পিএম
জলজলাভূমি কেন্দ্র করেই সমৃদ্ধ হয়েছে মানুষের জীবনজীবিকা, গড়ে উঠেছে
সভ্যতা, সৃষ্টি হয়েছে প্রাণিকুলের। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন
প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, হাওর-বাঁওড়সহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো
ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া পরিবেশ শীতল রাখা, বর্ষা মৌসুমে বন্যা প্রতিরোধ, শহরে
জলাবদ্ধতা নিরসন, পানির চাহিদা পূরণ ও আবর্জনা পরিশোধনেও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, হাওর-বাঁওড় জলাভূমির অভাব নেই এ দেশে। অভাব শুধু সংরক্ষণের।
‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০’ অনুযায়ী কোনো পুকুর-জলাশয়, নদী-খাল ভরাট করা বেআইনি।
আবার বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ছাড়া কোনো
ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধাসরকারি, এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের
বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর বা জলাধার ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু ঢাকা সিটি
করপোরেশন থেকেই বছরে প্রায় ৫ হাজার একর জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। আর এভাবে সারা দেশে
প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪২ হাজার একর জলাধার ভরাট হচ্ছে। ঢাকা শহরে জলাভূমি ভরাটের বিরূপ
প্রভাব পড়েছে।
আমরা দেখছি, বেশিরভাগ খাল ও নিচু জায়গা ভরাট করে ফেলায় একটু বৃষ্টি
হলেই জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। চারপাশের নদনদীগুলোর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ কাটা
পড়েছে। ময়লা আবর্জনা বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে মশার প্রকোপ। রাজধানীতে ডেঙ্গু মহামারি আকার
ধারণ করেছে। প্রতি বছর বিশ্ব জলাভূমি দিবসে একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪
সালের প্রতিপাদ্য‘জলাভূমি ও মানবকল্যাণ’। দেশে জলাভূমির অবস্থা মোটেই ভালো নেই। ঢাকায়
৫২টি চলমান খাল ছিল। দেশের ১ হাজার ৮টি নদ-নদী আজ ভালো নেই। যে নদীর বাস্তুতন্ত্রের
ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল এ দেশের মানুষের জীবনব্যবস্থাপনা। জাতীয় পানিনীতিতে আরও
উল্লেখ আছে, ‘হাওর, বাঁওড় ও বিল জাতীয় জলাভূমিগুলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যর ধারক
এবং অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। সরকার মনে করে বর্জ্যশোধন, ভূগর্ভস্থ পানির আধার, সব জলজ
ও জলচর প্রাণী ও তৃণের অস্তিত্ব এবং সর্বোপরি পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নিশ্চিত
করতে জলাশয়গুলোর শুধু সংরক্ষণই নয়, উপরন্তু উন্নয়ন প্রয়োজন যাতে এগুলোকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে
রূপান্তরিত করা যায়।’
নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর, জলাভূমি বিলুপ্তির ফলে কমছে প্রাকৃতিক মাছের
বৈচিত্র্য, মানুষ সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে চাষকৃত মাছের ওপর। প্রাকৃতিক মাছের
ওপর নির্ভরশীল জেলেপরিবারগুলো দিন দিন ঝুঁকির মাঝে পড়ে যাচ্ছে। পেশা হারিয়ে বেমানান
হয়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ, দখল হয়ে যাচ্ছে
জলমহাল, শুকিয়ে যাচ্ছে নদী-নালা, খাল-বিল, মাছের অভয়াশ্রম, প্রজননকেন্দ্র, বিলুপ্ত-বিপন্ন
মাছের প্রজাতি, হারিয়ে যাচ্ছে পেশা, জীবনে নেমে আসছে দারিদ্র্য। দেশি প্রজাতির মাছ
রুই, কাতলা, বানহারি, বাঘাইড়, গুতুম, কাজলি, কালবাউশ, কই, চিংড়ি, মাগুর, শিং, টেংরা,
পাবদা, মলা, ঢ্যালা, চাপিলা, পাঙাশ, শোল, চিতল, আইড়, মৃগেল, বাইম; কাছিম, কাঁকড়া, সাপসহ
নানা প্রজাতির জলপ্রাণীর ভান্ডার ক্রমে ফুরিয়ে আসছে।
মানুষের টিকে থাকার জন্যই প্রাণী, উদ্ভিদ, জল-বায়ু, মাটি। তাই টিকে থাকার জন্যই মানুষের উচিত প্রকৃতি সচল রাখা। মূলত প্রতিটি সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশ, সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি সামাজিক বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। নদী ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, উজানের পাহাড় থেকে নেমে আসা বালির ঢল, বাণিজ্যিক মাছ চাষ, ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার দিনে দিনে দেশের পানির উৎসগুলো নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য। পানিসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জলজ পরিবেশে মাছ ছাড়াও রয়েছে নানান জাতের কাঁকড়া, কচ্ছপ, শামুক-ঝিনুক, চিংড়ি, লবস্টার, ডলফিন, শুশুক, তিমি, হাঙ্গরসহ আরও অনেক ছোট ছোট প্রাণের সমাহার। আর এসব প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বিস্তৃতির জন্য জলজ পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে হবে আমাদের স্বার্থেই।