পর্যবেক্ষণ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৫০ এএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
চারিদিকে অস্থিরতা, কখনও তা
দৃশ্যমান আবার কখনও অদৃশ্য। মোটকথা অস্থিরতার প্রলম্বিত ছায়া মানুষের মনোজগত গ্রাস
করেছে, এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বেশকিছু প্রশ্নও দাঁড়িছে। সবাই দৌড়াচ্ছে। অস্থিরতার প্রতিযোগিতায় শামিল হয়ে ছুটছে সবাই। এ অস্থিরতা আমাদের বাংলাদেশে কেবল নয়, সারা বিশ্বে। নিজেদের সঙ্গে নিজেদেরই প্রতিযোগিতায় কেউই পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়। জীবনের সব ক্ষেত্রে নিদারুণ অস্থির এক দৌড় সবাইকে পাগল করে তুলেছে। এই দৌড়ের দুটো কারণ আছে। একটা কারণ, বস্তুগত চাহিদা। আর দ্বিতীয়টি, অসংযত প্রতিযোগিতা। নানামাত্রিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে চাহিদা নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রাপ্তির জন্য প্রতিযোগিতা। সবার মধ্যেই ভোগবাদিতার সর্বগ্রাসী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ একটা হচ্ছে প্রয়োজনের দিক- জীবিকার ও জীবনধারণের; আরেকটা হচ্ছেÑ অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার ঘটনা। প্রতিযোগিতাটাকে উত্তেজিত করা হচ্ছে পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।
আসলে আমরা একটা বিজ্ঞাপনের যুগে বাস করছি। এ যুগটাকে গণমাধ্যমের জন্য উৎকর্ষের যুগ বলা হলেও গণমাধ্যমের একটা বিরাট অংশ হচ্ছে বিজ্ঞাপন। প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে বিজ্ঞাপনে মানুষকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে এই বলে যে, তুমি পিছিয়ে পড়ছ। আর বস্তুত কেউই পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়। সবাই তাই ছুটছে। যেহেতু সবাই ছুটছে, তাই অগ্রগতি তেমন একটা ঘটছে না। ঠেলা-ধাক্কা হচ্ছে, পরস্পরের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। হিংসা-বিদ্বেষই মূলত মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে প্রত্যেকের মনের ভেতরে। কারণ প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রতিযোগী। তাই সমষ্টিগত যে অগ্রগতি, সেটা ঘটছে না।
অস্থির গতিশীলতার বাহ্যিক কারণ হয়তো বোঝা গেল; কিন্তু এ সমস্যার কেন্দ্রীয় সত্যটা যেন না ভুলি। সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার মূল ধারণাই হচ্ছে প্রত্যেকটা মানুষ কেবল তার নিজের কথাই ভাববে। আর প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই একটা ভোগবাদিতা তৈরি হবে। পুঁজিবাদ একটা কাজ খুব ভালোভাবে করে; সেটা হলো মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা। পরস্পর বিচ্ছিন্ন মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়; এবং নিজের আরাম বৃদ্ধির লোভে ভোগবাদী হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদের আসল সত্য অদৃশ্যভাবে আমাদের এই ছোটাছুটির মধ্যে ব্যস্ত রাখছে। ক্ষণিকের জন্যও দাঁড়াতে দিচ্ছে না। বিশ্বব্যাপীই ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাদের কারণেই। কোথাও মানুষ স্থিরভাবে নেই। ধরা যাক, আমেরিকাÑ যাকে স্বর্গরাজ্য মনে করা হয়ে থাকে। ধারণা করা হয় সবাই সেখানে সুখ-শান্তিতে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করে। বস্তুত সেখানেও কেউ স্থিরভাবে থাকতে পারে না। সবাই ব্যস্ত। অন্যের কথা, এমনকি প্রতিবেশীর কথাও ভাববার ফুরসত পায় না; অন্য মানুষদের জন্য ভাবা তা দূরের কথা। ছুটির দিনগুলোতেও তাদের ছুটতে হয়। ছুটতে হয় অবসরযাপনের জন্যও। সর্বোত্তমভাবে ছোটার জন্য দিনকে দিন উন্নত ব্যবস্থাও হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছে তারা। কিন্তু ইচ্ছেমতো দাঁড়ানোর সুযোগ ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে এ অস্থিরতাই এ কালের বৈশিষ্ট্য। প্রতিযোগিতাটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে এ সময়ে।
তাহলে এ অস্থিরতার চক্র থেকে সরে আমাদের দাঁড়ানোর জায়গাটা আসলে কোথায়? ব্যক্তিগতভাবে যদি দাঁড়ানোর জায়গার কথা বলি, তাহলে সেটা হচ্ছে এমন একটা পরিসর যেখানে আমি কিছুটা হলেও সুস্থির অবস্থায় থাকতে পারি। কেউ বই পড়তে ভালোবাসে; কারও হয়তো খেলাধুলা পছন্দ, কিংবা মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে। এর জন্য প্রত্যেকের মধ্যে এ রকম একটা স্থান তৈরি করা চাই, যেটা তার নিজের। যেখানে সে ইচ্ছে হলেই দাঁড়াতে পারবে। অথবা সেখানে সে অবসরযাপন করবে। এ অবসরযাপনটা ব্যক্তিগতভাবে আমরা সংস্কৃতির চর্চা তথা সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে পেতে পারি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা দাঁড়াতে চাই কি না? মানবতাবিরোধী এ অস্থিরতার মধ্য থেকে আমরা দাঁড়ানোর পরিসর তৈরি করে নিতে পারি কি না? কেননা এ পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের একটুখানি স্থির হওয়ার, একটুখানি থামার আগ্রহ তৈরি হওয়াটা কঠিন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ এবং স্থানের অভাব সে সুযোগকে আরও বেশি ধ্বংস করে দিচ্ছে। তবু এ সামগ্রিক অস্থিরতার ভেতরে থেকেই আমরা যে যেখানে আছি সেখানেই একটা সামাজিকতা গড়ে তোলা দরকার। এই সামাজিকতার মধ্য দিয়ে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে হবে। পাঠাগারকে বলা যায় সে রকমেরই একটা পরিসর। শুধু জ্ঞান চর্চাই নয়, পাঠাগার আমাদের স্থিতিশীল হতেও সাহায্য করে। খেলাধুলাও তেমনি আমাদের আনন্দময় প্রতিযোগিতার স্বাদ পাইয়ে দেয়। তা ছাড়া সামাজিক উদ্যোগে প্রত্যেকের জন্য সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পরিসর তৈরি হওয়া দরকার, যা আমাদের নেই। আমাদের এমন অনেক কিছুই নেই যেসবের অভাবে আমরা ছুটতে ছুটতে প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে নিজে ঢুকে যাচ্ছি দিনকে দিন। আমাদের পরস্পর বিচ্ছিন্নতাগুলো আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ছে।
২
আজকে সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একটা বিক্ষোভ চলছে, যেটা আমেরিকা থেকে শুরু করে বহু স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। অভিনব এ রকম বিক্ষোভ এর আগে কখনও দেখা যায়নি। পুঁজিবাদকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। শতকরা ৯৯ জন একদিকে আর একজন অন্যদিকেÑ এ রকম একটি বিভাজন এর আগে এভাবে প্রচার পায়নি। মানুষের জন্য দাঁড়ানোর জায়গাটা তৈরি করতে হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে বদল করতে হবে। এ ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক করা আবশ্যক হবে, অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সমাজতান্ত্রিক সে ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা চাই। এ রকমের একটা ব্যবস্থা চাই, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা প্রতিযোগিতার কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার হবে না। সম্পর্কটা হবে মৈত্রীর, আদান-প্রদানের, সৌহার্দ্যের, সহমর্মিতার। আর এ ব্যবস্থাটা যেমন স্থানীয়ভাবে দরকার, তেমনি দরকার বিশ্বব্যাপীও।
এই যে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন হচ্ছে তার লক্ষ্য স্থানীয়ভাবে মানুষের জন্য অবকাশের সুযোগটা তৈরি করা। যে যেখানে আছে সেখানে যেন সে সুযোগ পায় দাঁড়ানোর। যে সুযোগটা এ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দিচ্ছে না। দেবেও না। মানুষকে এ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করছে, তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত রাখছে, ভোগবাদিতা আচ্ছন্ন আবদ্ধ রাখতে চাইছে। কাজেই এ বিচ্ছিন্নতা, এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এ ভোগবাদিতাকে বদলাতে হলে এই ব্যবস্থাকেই বদলাতে হবে। ইচ্ছে হলেই যাতে একজন মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে, নিজের অন্তর্গত শান্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারে- তেমন সুযোগসম্পন্ন ব্যবস্থা তৈরির জন্য আন্দোলন করতে হবে।
পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনকে তাই কেবল নেতিবাচক হলে চলবে না। পুঁজিবাদবিরোধী যে আন্দোলন এখন সংগঠিত হচ্ছে তার মধ্যে কিন্তু কেবল নেতিবাচক দিকটাই প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রত্যাখ্যানের জায়গা থেকে এ আন্দোলন অগ্রসর হচ্ছে। আর প্রত্যাখ্যানের জায়গাতে সীমাবদ্ধ থাকলে তো এটা একটা নৈরাজ্যের জায়গায় চলে যেতে চাইবে। তাই ইতিবাচক একটা দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। চাই একটা স্বপ্ন। সমষ্টিগত স্বপ্ন। যে স্বপ্নে আমরা সবাই অংশ নিতে পারি। সবার অংশগ্রহণেই সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর ওই স্বপ্নটা কিন্তু একটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার। সেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা তৈরি করা যাবে, যদি সমাজব্যবস্থাটাকে পরিবর্তন করা যায়; বিরাজমান সমাজব্যবস্থাটাকে প্রকৃতই যদি গণতান্ত্রিক করে তোলা সম্ভব হয়। সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িতÑ তাই রাষ্ট্রকেও গণতান্ত্রিক করতে হবে। কেবল প্রত্যাখ্যানের নয়Ñ প্রয়োজন রয়েছে গড়ে তোলার আন্দোলনও। চাই সমতার পরিবেশ ও পরিস্থিতি গড়ে তোলা। ওই ব্যবস্থা ছাড়া আমরা সুস্থির হয়ে কোথাও দাঁড়াতে পারব না। ওই ব্যবস্থা এলেই কেবল ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা দূর হবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃজনশীল হবে, সহমর্মিতা তৈরি হবে। তখন স্থূল ভোগবাদিতার জায়গায় উচ্চতর সাংস্কৃতিক আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা যাবে।
বৈষম্য যদি জিইয়ে থাকে- মানুষের সঙ্গে মানুষের সমান মর্যাদা, সমান অধিকার, সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠা করা যদি না যায়, তাহলে গণতন্ত্রও আসবে না। প্রতিযোগিতা হিংস্রতর হবে। বৈষম্য সৃষ্টি করাই হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমরা এখন যে বিশ্বায়নের যুগে বাস করছি সে বিশ্বায়ন হচ্ছে বাণিজ্যের। সেটা মানবিক বিশ্বায়ন নয়। আর বাণিজ্যের মূল বিষয়ই হচ্ছে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মুনাফা তৈরি করা। বিশ্বায়নের ধুয়া তুলে সারা পৃথিবী বাণিজ্যের অধীনে চলে গেছে। মানবিক বিশ্বায়নের প্রয়োজনেই বাণিজ্যিক এই বিশ্বায়নকে পরিত্যাগ করাটা দরকার। পৃথিবীর প্রত্যেকটি সংস্কৃতিরই নিজস্বতা রয়েছে; বাণিজ্য সে নিজস্বতাকে স্বীকার করে না। সংস্কৃতির নিজস্বতাকে ভেঙে দিয়ে বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন মানুষকে অস্থির প্রতিযোগিতার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে; সমস্ত পৃথিবীকে একাকার করে দিতে চাইছে বাণিজ্যের স্বার্থে। বিলীন করে দেবে ভাবছে সেই জায়গাটাকে, যেখানে ইচ্ছা হলেই আমরা একটু দাঁড়িয়ে দেখে নিতে পারি মানবিক স্বাদের সুন্দর পৃথিবীকে।
বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের পরিবর্তে যেটা চাই, সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিকতা। আন্তর্জাতিকতা আর বিশ্বায়ন সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। বিশ্বায়ন হচ্ছে বাণিজ্য আর আন্তর্জাতিকতা হচ্ছে সহযোগিতা, সহমর্মিতা। সবার সহযোগিতায় বিশ্বকে মনুষ্য বসবাসের উপযোগী করে তোলাটাই আন্তর্জাতিকতার লক্ষ্য। অন্যদিকে বিশ্বায়ন হলো পুঁজির দাসানুদাস। পুঁজিবাদ বিশ্বায়নকে বিস্তৃত করছে আর বিঘ্নিত করছে আন্তর্জাতিকতাকে। ফলে মানুষ চরম গতিশীলতার মধ্যে ধাবিত হতে হতে হারিয়ে ফেলছে তার স্বাধীনতার জায়গা; দাঁড়াবার নিজস্ব পরিসর।