স্থানীয় সরকার
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:০৮ এএম
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
২৪ জানুয়ারি দুই সিটি
করপোরেশনসহ ২৩৩ স্থানীয় সরকারকাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন
কমিশন। স্থানীয় সরকারকাঠামোর এ নির্বাচনগুলো শুরু হবে মার্চে থেকে। এ ভূখণ্ডে যে ধরনের
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এখনও বিদ্যমান তা ব্রিটিশ উপনিবেশের গড়ে দেওয়া। তখন আর কোথাও
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ছিল না। শুধু পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের সরকারব্যবস্থা ছিল। প্রশাসনিক
স্বার্থে ব্রিটিশরা আমাদের প্রতিবেশী দেশ বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, কেরালাসহ
কয়েকটি অঞ্চলে এ ধরনের সরকারব্যবস্থার কাঠামো দাঁড় করায়। এখনও উপমহাদেশ বলে পরিচিত
এ ভূখণ্ডের কোথাও স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সুসংহত কাঠামোর ওপর নেই। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপন
লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অটোনমির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসনের সুযোগ দেন। দেশভাগের
পর পাকিস্তান শাসনামলে স্থানীয় স্বশাসনের ব্যবস্থা স্থানীয় শাসনে রূপ দেওয়া হয়। আইয়ুব
খান ক্ষমতারোহণের পর অপ্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু
করেন। নতুন এ ব্যবস্থায় সব ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা মিউনিসিপ্যালিটি কাউন্সিলের
সদস্য ও চেয়ারম্যান ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারতেন। এভাবে স্থানীয় সরকারকাঠামো
গড়ে তোলার সুযোগ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কারণ স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকে বরাদ্দ
পেত। ওই বরাদ্দই তারা ব্যবহার করত। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থানীয়
সরকারের কেউ কেউ অর্থলোভী হয়ে ওঠেনÑএমন অভিযোগ হাল আমলে আমরা পেতে শুরু করি।
মহান মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর
ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭২ সাল থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহত করার পথ মসৃণ করার বিষয়ে
তাঁর একাধিক পরিকল্পনা ছিল। ওই পরিকল্পনার মধ্যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার দূরদর্শী
ভাবনাও ছিল। যদিও সুসংহত কাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপদানের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও তাঁর সামনে
ছিল। প্রথমে স্থানীয় সরকারকে তিনি ‘পঞ্চায়েত’ নামে অভিহিত করলেন। পরে নাম দিলেন ‘ইউনিয়ন
পরিষদ’। এরশাদ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকারকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্থানীয়
সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করতে উপজেলা পরিষদ গড়ে তোলা হয়। এভাবে স্থানীয় সরকারের
অংশীজনেরা সরকারের তাঁবেদারে পরিণত হয়। সংবিধানের চতুর্থ ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছদের ৫৯
(১) ধারায় বলা আছে, ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের
ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে’।
অর্থাৎ সংবিধানে মূলত স্থানীয় শাসনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ কোনো নির্ধারিত স্থানে
স্থানীয় সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে। কিন্তু
দুঃখজনকভাবে আমাদের অভিযোগ শুনতে হচ্ছে, প্রকৃতার্থে দেশে এখন স্থানীয় শাসন নেই। কারণ
স্থানীয় সরকার শাসনব্যবস্থায় দায়িত্বশীল কেউই স্থানীয়ভাবে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেন না।
তারা সরকারের দেওয়া বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। সরকার স্থানীয় সরকারের জন্য যে বরাদ্দ
দেয় তা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি ও জাইকা, কিংবা অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে সংগ্রহ
করে। স্থানীয় শাসন পরিচালনার পদ্ধতিগুলো তারা অনুসরণ করে না। বরাদ্দ সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয়
নির্দেশ অনুসারে কাজ করাকে স্থানীয় শাসন বলা চলে না।
স্থানীয় সরকারকাঠামোর
স্বরূপ নিয়ে একাডেমিয়ায় প্রায়ই আলোচনা হয়। দেশে স্থানীয় সরকারকাঠামোর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার
সূত্র ধরে এগিয়ে এলে দেখা যায় বিভিন্ন সময় স্থানীয় সরকারকাঠামো রাজনৈতিক স্বার্থে ভঙ্গুর
করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারকাঠামোর জনপ্রতিনিধিদের তাই সরকারের সঙ্গে আঁতাত করতে
হয়। এ সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন গুলিয়ে
ফেলার যে পরিস্থিতি কখনও কখনও দৃশ্যমান হয়, এর কোনো অবকাশ নেই। দুটি নির্বাচনের আমেজ
ও পরিবেশ আলাদা। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটের দিন প্রার্থী তার সমর্থকগোষ্ঠী
নিয়ে আসেন। যেহেতু সবাই পরিচিত তাই ভোটারদেরও প্রার্থী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে।
ফলে এ ধরনের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্ষমতাসীন
দলের কোনো প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র বা বিরোধীদলীয় কোনো প্রার্থী বিজয়ী হন।
কিন্তু সেই বিরোধীদলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সরকারের সঙ্গে আঁতাত করতেই হবে। স্থানীয়
সরকার সরকারের দেওয়া বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে। সেই বরাদ্দ না পেলে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম
পরিচালনা কঠিন। ইউএনডিপি ও জাইকার মতো সংস্থা স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে, কাঠামোগত সংস্কারে
অনেকবার বরাদ্দও দিয়েছে। কিন্তু কার্যত এ ক্ষেত্রে কাজের কাজ কিছু হয়নি বরং স্থানীয়
সরকার এখনও স্থানীয় প্রশাসনের অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়ে গেছে। ফলে বিরোধী
দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী স্থানীয় সরকারকাঠামোয় নির্বাচিত হলেও তাকে সরকারের সঙ্গে
সমঝোতা করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
সরকার যেকোনো কারণ
দেখিয়ে যেকোনো সময় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির পদ বাতিল ঘোষণা করতে পারে, এমনটি স্থানীয়
সরকার আইনেই স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ফলে আমরা বলছি স্থানীয় সরকারকাঠামোর কথা কিন্তু কার্যত
রয়ে গেছে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো তার নিজ নিজ অবস্থানে কাজ করছে।
সেজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে।
কার্যত স্থানীয় সরকারের যে দর্শন তা পুরোপুরি উপেক্ষিত। একসময় কাঠামো কিছুটা হলেও
ছিল কিন্তু এখন তা-ও নেইÑএমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশও ক্ষীণ। কখনও কখনও মনে হয় স্থানীয়
সরকার যেন অনেকাংশেই প্রশাসনের বর্ধিত কোনো স্তর। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার
নিয়ন্ত্রিত-নির্দেশিত প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত নয়। কারণ তাদের নিজেদের শক্তি
খুব কম, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক শক্তি। স্বশাসনের এ দর্শন ভুলে যাওয়ার ফল ভালো হয়নি। ২৪
জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি ফের সামনে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সরকারকাঠামোর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও নির্বাচন
কমিশন দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারকাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলোর অনুপস্থিতির
ফলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি উপেক্ষা বাড়ছে যা আমাদের জন্য শুভ কিছু নয়।
সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা সরাসরি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন
ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের থেকে বরাদ্দ সংগ্রহ করে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অংশীজনেরা সরকারের
বর্ধিত অংশের মতো কাজ করলে তাতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি
হওয়ার পথটিই সুগম হয়।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও
নর্ডিক অঞ্চলের দেশগুলোয় বেশি কার্যকর। এ দেশগুলোর স্থানীয় সরকারের স্বরূপ আমাদের পর্যবেক্ষণ
করা জরুরি। আমরা যদি এশিয়ার দেশ জাপানের দিকে তাকাই তাহলে স্থানীয় সরকারকাঠামোর প্রকৃষ্ট
উদাহরণ দেখতে পাব। জাপানে প্রিফেকচার নামে বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করা হয়েছে। প্রিফেকচারের
প্রিফেক্ট স্থানীয়দের ভোটে নির্বাচিত হন। জেলা প্রশাসনের প্রধান প্রিফেক্টের সেক্রেটারি
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সব নাগরিক সেবা এ প্রিফেকচারই প্রদান করে থাকে। নাগরিকের
তথ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করার সুষ্ঠু ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা
করা হয়েছে জাপানে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাপানের এ স্থানীয় সরকারকাঠামো
সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। নিজ শাসনামলে তিনি জেলা গভর্নরশিপ চালু করতে চেয়েছিলেন। যদি
তা সম্ভব হতো তাহলে দেশে স্থানীয় সরকারকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ কিছু হতো না। তাঁর
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচনের ভিত্তিতে কেউ জেলা গভর্নর হবেন। জেলা গভর্নরের অধীনে
ডিসি ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু
প্রকৃতপক্ষে দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা যেন দ্বৈতসত্তাগত সংকটে আছে। এখানে জেলা পরিষদ
আছে, আছে ইউনিয়ন পরিষদ। উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ইউএনওর নিয়ন্ত্রণে চলে
যান। তা ছাড়া স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যারা নির্বাচিত হন তাদের অনেকেই আইনের সঙ্গে পরিচিত
নন। স্থানীয় শাসন কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের দক্ষতাও কম। স্থানীয় সরকারের অংশীজনদের
যথাযথ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না।
স্থানীয় সরকার শুধু প্রতিষ্ঠাননির্ভর হয়ে থাকলে তা আমাদের জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। অতীতে বহুবার বলেছি, স্থানীয় সরকারেরকাঠামোটাই আছে, দর্শন হারিয়ে গেছে। এখন আমরা যেন সেই কাঠামোও দেখতে পাই না। সময় এসেছে নতুন করে কাঠামো পুনর্নির্মাণের। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি। যেহেতু স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন, তাই নির্বাচন কমিশনকেও শক্তিশালী করা জরুরি। যদি তা সম্ভব হয় তাহলে স্থানীয় সরকারকে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার পথ তৈরি হবে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে মার্চে তা আগেই উল্লেখ করেছি। তবে এর আগে স্থানীয় সরকারকাঠামো গড়ে তোলার পথে যে সংকট রয়েছে তা নিরসনে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সার্বিক স্বার্থেই জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে। বিশেষত বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট প্রশমনেরও সুযোগ তৈরি হবে; যা এ মুহূর্তে আমাদের অন্যতম উদ্বেগের কারণ।