সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৩৭ এএম
মিয়ানমারে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী মর্মস্পর্শী অধ্যায়ের প্রেক্ষাপটে
বাংলাদেশ মানবিক তাগিদে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়ে স্বভূম ত্যাগ
করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ঘিরে বহুমাত্রিক
অপরাধ আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য কতটা হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে- এর ফের সাক্ষ্য
মিলেছে ২৫ জানুয়ারি ভোরে। ওই দিন কক্সবাজারের উখিয়ার ২০ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পশ্চিমে
অবস্থিত লাল পাহাড় থেকে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরসা’র আস্তানায় অভিযান চালিয়ে
র্যাব বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, কয়েকটি মাইন, মাইন তৈরির সরঞ্জাম ও গুলি উদ্ধার
করে। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে একে-৪৭সহ নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। আমরা র্যাবকে
সাধুবাদ জানাই। তবে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, পাহাড়ের আড়ালে নজর আরও গভীর করা জরুরি।
লাল পাহাড়ে পরিচালিত কয়েক ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে আটক করা হয় আরসার
গান গ্রুপের কমান্ডার উসমান নেসার ও ইমানকে। অভিযোগ আছে, উসমান একসময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর
সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তাদের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে
আরসায় যোগ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। তার নেতৃত্বেই লাল পাহাড়ে আরসার এই গ্রুপটি
আস্তানা গেড়ে খুন, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধ করে আসছিল বলে জানিয়েছেন র্যাব-১৫-এর
অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন। ২৬ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবুজে ঘেরা আস্তানায় দিনে ওরা অবস্থান করত আর রাতে
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চালাত কিলিং মিশন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির
ক্রমাগত অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছে, খুনখারাবি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। লাল পাহাড়
থেকে উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং মাইন তৈরির উপকরণ উদ্ধারের ঘটনার মধ্য
দিয়ে সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, তাদের অর্থের জোগানসহ অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের উৎস
কী। আমরা মনে করি, এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা
সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি।
র্যাবের অভিযান টের পেয়ে আরসার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা র্যাবের
দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। আত্মরক্ষার্থে র্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা
পিছু হটে যায় বটে, কিন্তু এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের সংগঠিত হওয়ার যোগসূত্রের বার্তা
মেলে। আমরা মনে করি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-উত্তর টানা চতুর্থবারসহ পঞ্চমবারের
মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতায়
নতুন মাত্রা যুক্ত করা জরুরি। কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পসহ ভাসানচরে দশ লক্ষাধিক
আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থী আমাদের শুধু অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষাপটই ক্রমাগত বিস্তৃত
করছে না, এর নানামুখী বিরূপ প্রভাবও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। অর্থনীতি, পরিবেশসহ নানান ক্ষেত্রে
এর অভিঘাত বাংলাদেশকে আর কত দিন সইতে হবে, এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায় আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে
ক্রমাগত অপরাধপ্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পাশাপাশি তা ছড়িয়ে পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের
বান্দরবান, নাইক্ষ্যংছড়িসহ আরও বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে। এমতাবস্থায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার
প্রশ্নে কতটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন।
আমরা দেখছি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ দফায় দফায়
বিষয়টি উত্থাপন করেও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছে না, যা অনভিপ্রেত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত।
ইতঃপূর্বে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে
প্রকৃতপক্ষে ন্যূনতম পদক্ষেপও নেয়নি। আমরা এ-ও দেখছি, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোও মিয়ানমারের
ওপর মৌখিক চাপ প্রয়োগের বেশি কিছু করেনি। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে
মিয়ানমারের নির্লিপ্ততার এটি একটি বড় কারণ।
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যেভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে
তাতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যাম্পগুলো ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার
করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে অনেক রোহিঙ্গাই বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে
পাড়ি জমিয়েছে কর্মসন্ধানে, তাও আমাদের জন্য বহুমাত্রিক উৎকণ্ঠার বিষয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে
বিলম্ব হলে সংকট আরও বাড়তে পারে, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে নতুন কর্মকৌশল প্রণয়নও জরুরি
বলে আমরা মনে করি। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে
জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যার আলামত এখন আর অদৃশ্যমান নয়। সরকারের সামনে কূটনীতির
পাশাপাশি আরও যে পথ রয়েছে, সেগুলোও এখন অধিক গুরুত্ব সহকারে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।