নারীর প্রতি সহিংসতা
এলিনা খান
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৪২ এএম
সময়ের সঙ্গে তাল
মিলিয়ে সামাজিক পরিবর্তন ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। এ পরিবর্তন ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয়ই হতে
পারে। আধুনিক এ সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে
জীবন সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারে বেড়েছে জনদুর্ভোগ, তৈরি হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে নির্যাতন-হয়রানির ধরন পাল্টে গেছে। প্রযুক্তিগত হয়রানির
ক্ষেত্রে নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যাই বেশি। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি অনেকের
কাছে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। গোপনে ছবি তুলে, সম্পর্কের অবনতিতে অন্তরঙ্গ ছবি ছড়িয়ে,
কৌশলে মোবাইল ফোন থেকে ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে অথবা ছবি সম্পাদনা করে নারীকে হেয় করার পন্থা
পুরোনো। সম্প্রতি প্রযুক্তিবিপ্লব সাধন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
ব্যবহারে যাপিত জীবনে যে অভূতপূর্ব উন্নতিসাধন হবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে নির্যাতন আরও সহজ হয়ে উঠেছে, এমন
অভিমত প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের। ডিপ ফেকিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে এখন ভিডিও
বা ছবি সম্পাদনা সহজ হয়ে গেছে। ফলে প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নন এমন নারীরা যেকোনো
ফাঁদে পড়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অনেক বেশি।
দুই দশক আগে ভিডিও
এডিটিং বা প্রযুক্তিগত নানা ফাঁদ সম্পর্কে মানুষের এতো কারিগরি জ্ঞান ছিল না। তখনও
ভিডিও ধারণের মাধ্যমে নারীকে হয়রানি করা হয়েছে। মূলত নারীকে হেয় অথবা জিম্মি করে অনৈতিক
সুযোগসুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ব্যবহার হতো। সনাতন সমাজব্যবস্থায় প্রযুক্তির
ব্যবহার বা মিডিয়া সম্পর্কে জনমনে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা ছিল। এখনও যে নেই তা নয়,
তবে তখন প্রযুক্তির প্রতি রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীর অবস্থান নাজুক ছিল। বিগত কয়েক
বছরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। স্মার্টফোন ছাড়া এখন
জীবন অচল। সময়ের প্রয়োজনে প্রযুক্তি আইন বাস্তবায়ন করা হয়। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে
এর খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কেও মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয়। ডিজিটাল ডিভাইস, স্মার্ট হোম
গ্যাজেট থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় মানুষের কাছে এর
অপপ্রয়োগের দিকটিও উঠে আসছে। আবার প্রযুক্তির ব্যবহারের বৈচিত্র্যও রয়েছে। নানা ফাঁকফোকর
খুঁজে প্রযুক্তির অপপ্রয়োগের হারও বেড়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ
এ দুটি বিষয়ই আমাদের সামনে তুলে আনছে। দেশে এখনো অনেক নারী নানা বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছেন।
প্রযুক্তি খাতে তারা বরাবরই পিছিয়ে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বেশি। কিছুদিন আগে সাইবার
ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে সাইবার অপরাধের
ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তরা নিত্যনতুন ও অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।
অধিকাংশ সাইবার
অপরাধের ক্ষেত্রে নানামাত্রিক প্রতারণা পরিলক্ষিত হয়েছে। চাকরি দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস,
ভুয়া অ্যাপ তৈরি করে ঋণ দেওয়ার ফাঁদ, এমএলএম ব্যবসা, বেটিং সাইট তৈরি, সেবা বা পণ্য
বিক্রির নামে প্রতারণা এমনকি পর্নোগ্রাফির অভিযোগও রয়েছে। সাইবার অপরাধে শিশু ভুক্তভোগীর
হার বেড়েছে ১৪০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ভুক্তভোগী ৭৫ শতাংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের
মধ্যে। লিঙ্গভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যানে সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীর মধ্যে নারীর হার
বেশি, ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। বেড়েছে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার হার।
সব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা কঠিন। আবার ২০২২ সালে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের সমীক্ষায় দেখা
গেছে, দেশের ৬৩.৫১ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতা ও হয়রানির শিকার। সমীক্ষায় বলা হয়েছে,
২০২২ সালে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে নারীরা বেশিরভাগই ফেসবুকে (৪৭.৬০%),
মেসেঞ্জারে (৩৫.৩৭%), ইনস্টাগ্রামে (৬.১১%), ইমোতে (৩.০৬%), হোয়াটসঅ্যাপে (১.৭৫%) এবং
ইউটিউবে (১.৩১%) সহিংসতার শিকার হয়। ৪.৮০ শতাংশ নারী বলেছে, তারা ভিডিও কল, মোবাইল
ফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হয়েছে। সর্বোচ্চ ৮০.৩৫ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার
মধ্যে ঘৃণ্য এবং আপত্তিকর যৌনতাপূর্ণ মন্তব্য, ৫৩.২৮ শতাংশ নারী ইনবক্সে যৌনতাপূর্ণ
ছবি গ্রহণ এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব, ১৯.১৭ শতাংশ নারী বৈষম্যমূলক মন্তব্যের
শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয়, সামাজিক কলঙ্ক, ভুক্তভোগী দোষারোপ ও গোপনীয়তা হারানোর ভয়ে
৭৫.৭৭ শতাংশ নারী অনলাইনের মাধ্যমে বেনামে অভিযোগ জানাতে চায়।
অনলাইনে সহিংসতা
বা হয়রানির শিকার হলে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে ওই জরিপে এও বলা হয়েছে,
অভিযোগের এসব প্রক্রিয়া কার্যকর নয়। ফলে অনেক নারী অভিযোগের বিষয়ে আগ্রহী নন। প্রযুক্তিগত
হয়রানির বিপরীতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারে
নারীকে হেয় করা কিংবা নির্যাতনের প্রমাণ উপস্থাপন এবং দোষীকে দোষী সাব্যস্ত করা কঠিন।
প্রক্রিয়াও জটিল। তা ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে নারীরা পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান
না, এমন অভিযোগও পুরোনো। কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে বা সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করলে
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা উদ্যোগ নেন। তা ছাড়া ভুক্তভুগী নারীর ব্যাকগ্রাউন্ড শক্ত হলে
তারা সহযোগিতা পান। সার্বিকভাবে প্রযুক্তিগত নির্যাতনের শিকার নারী ন্যায়বিচার পান
না। আইনি প্রতিবিধানের প্রত্যাশায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ভাবনাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
ভুক্তভোগী নারীকে তখন নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তার চরিত্র
নিয়ে, উদ্বেগবহুল প্রশ্ন আসে তার গতিবিধি নিয়ে। সংকটের ধরনটি এখন সুপ্ত হয়ে পড়েছে।
একসময় পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুকের জন্য নারীকে নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে
হতো। এ সমস্যা যে পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। সামাজিক সমস্যাগুলো সুপ্তভাবে
প্রযুক্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। যেহেতু অপরাধগুলো সুপ্ত হয়ে পড়েছে তাই এদের সূত্রানুসন্ধান
করা আরও কঠিন হয়ে গেছে। ফলে ভুক্তভোগী নারীর প্রতিবিধান পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তিগত অপরাধ
দমনে সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ রয়েছে। এ আইন বাস্তবায়নের বহু আগে মানবাধিকার ও সামাজিক
সংগঠনগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীর ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিপ্রেক্ষিতে
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ তৈরি করা হয়। সাইবার নিরাপত্তা আইনে যেসব বিষয় উল্লেখ
করা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনেও এর অনেক উপাদান যুক্ত ছিল। ওই আইনে পর্নোগ্রাফির
যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা দিয়েও নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
অর্থাৎ আইন করলেই সমাধান মিলবে না। এর প্রয়োগ ও প্রতিপালন জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা
আইনেরও প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা রয়েছে। তবে এর অপপ্রয়োগ যাতে না হয় সেজন্য আইনের
বিধান থাকা জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেমন নারী নির্যাতন করা হচ্ছে, তেমন এ প্রযুক্তি
নেতিবাচকভাবে যে-কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার
করে যে ভুয়া ছবি-ভিডিও তৈরি হচ্ছে, সেখানে আসল-নকলের পার্থক্য করা কঠিন। তাই সাইবার
নিরাপত্তা আইনের বিধান জরুরি। বিদ্যমান আইনের আওতায় বিভিন্ন মেয়াদের সাজা রয়েছে। এমনকি
তাৎক্ষণিক সাজারও বিধান রয়েছে। দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীতিমালা যথেষ্ট কঠোর।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে প্রতিবিধান পান না। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে যারা প্রযুক্তির ব্যবহারে নারী নির্যাতন করে তাদের শক্ত ভিত থাকে। অনেকে রাজনৈতিক
ছত্রছায়ায় থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, এ অভিযোগও নানা মহল থেকে বহুবার উত্থাপিত হয়েছে।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহিষ্ণু’ অবস্থান নিতে না পারলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে
না।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমরা বহুদিন ধরেই কথা বলে আসছি। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও অনেক কথা হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণের ইতিবাচক দৃশ্য দেখা গেছে। নির্বাচনী বৈতরণী পেরিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার প্রতিযোগিতায় নারীর অবস্থান কিছুটা দৃঢ় হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯ জন নারী রাজনীতিক ভোটের মাঠে বিজয়ী হয়েছেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নারীকে এখনও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচনে বিজয়ী হলেই রাজনীতিতে নারীর মত প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়, এমনটি বলা কঠিন। তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতিতেও নারী রাজনীতিকদের পুরুষ সহকর্মীদের মতের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাজনীতিতে পুরুষনির্ভরতার বিষয়টি নিয়ে এখনও অনেক কাজ করার রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে তা ইতিবাচক। সংসদে নারী আইনপ্রণেতার সংখ্যা বাড়লে নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিয়ে ইতিবাচক কাজও বাড়বে। তবে মাঠ পর্যায় থেকে সংস্কার জরুরি। যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে এর নিরসনে প্রয়োজন যূথবদ্ধ প্রয়াস। তা না হলে নারীর নিরাপত্তা সংকট দূর হবে না। সভ্য দুনিয়ায় কোনোভাবেই নিরাপত্তাহীনতা জীবনের উপসর্গ হয়ে থাকতে পারে না।