× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মানসম্পন্ন শিক্ষা

বিভাজন জিইয়ে রেখে লক্ষ্যে পৌঁছা অসম্ভব

শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:১২ এএম

শহিদুল ইসলাম

শহিদুল ইসলাম

বছরের প্রথম দিনে বই উৎসব উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমার সরকার বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠক্রম অনুসরণ করে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।’তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, ‘শিক্ষার ক্ষেত্রে যত টাকা লাগে আমি দেব। বিশ্বে যত নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তারা কীভাবে শিক্ষা দেয়, কী কারিকুলাম শেখায় সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা সে রকম আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশে তৈরি করতে চাই।’ সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এ কথাও বলেছেন, ‘জাতির পিতা বলতেন- শিক্ষায় যে খরচ সেটা হচ্ছে বিনিয়োগ। আমি সেভাবেই মনে করি। কাজেই এজন্য আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে যত টাকা লাগে আমি দেব।’ টানা চতুর্থবার একই সঙ্গে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রীসভা গঠন করে নবযাত্রা শুরু করেছেন। শিক্ষামন্ত্রণালয়সহ অনেক মন্ত্রণালয়েই রয়েছে চমক।

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা দেশবাসীর মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার পেছনে রাষ্ট্র যে অর্থ খরচ করে, সেটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সঠিক অনুধাবন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তা অনুধাবন করলেও আমাদের জাতীয় বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। এই কথায় পরে আসি।বিশ্বের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম এবং কীভাবে তারা শিক্ষা দেয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য সে পদ্ধতি ব্যবহার করতে চান। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চান। তার এ চাওয়া প্রশংসার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রীর এই চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই এ নিবন্ধের অবতারণা।

বিশ্বের ৩৮টি উন্নত দেশ সংবলিত ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) প্রতি বছরের মতো এবারও ৬ ডিসেম্বর তার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেই পিআইএসএ (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট এসেসমেন্ট) রিপোর্টে দেখা যায় ফিনল্যান্ডের শিক্ষার মান শীর্ষে অবস্থান করলেও ফিনল্যান্ডসহ অধিকাংশ দেশের শিক্ষার মানের অবনয়ন ঘটেছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর রেজাল্ট খুব খারাপ, সামান্য কিছু শিক্ষার্থী ভালো করেছে। ওইদিনই ফিনল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী অ্যানা মাজা হেনরিকশন ব্যাসিক স্কিলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি লেখা লিখেছেন। ব্যাসিক স্কিল বলতে তিনি পড়ালেখা ও গণনার কথা বুঝিয়েছেন। ৯ ডিসেম্বর আর একটি লেখায় তার বক্তব্য আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তার জন্য তিনি বার্ষিক সাপ্তাহিক ক্লাস-ঘণ্টা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছেন। নিচু ক্লাসের জন্য ৩ ঘণ্ট। ১ ও ২ নম্বর গ্রেডে মাতৃভাষার জন্য ২ ঘণ্টা এবং ৩ থেকে ৬ গ্রেডের জন্য ১ থেকে ২ ঘণ্টা। কিন্তু কোনোভাবেই কারিকুলামের কলেবর বৃদ্ধি করা যাবে না। পড়াশোনা ও গণনার জন্য আরও সময় বরাদ্দ করতে হবে। সেই সঙ্গে লৈঙ্গিক সমতা বা ভারসাম্য বজায় রাখাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী। সেজন্য আরও অধিকসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন হবে। তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ সম্পর্কে সরকার সচেতন বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী।

তা ছাড়া উন্নত দেশের কারিকুলাম ও কাঠামো আমদানির সময় উভয় দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর কথা ভুলে যাওয়া চরমভাবে অবৈজ্ঞানিক। ফিনল্যান্ডের মানুষের মাথাপিছু আয়, সেখানকার জীবনযাপনপ্রণালির সঙ্গে আমাদের কতটুকু মিল বা অমিল রয়েছে তা ভুলে যাওয়া মোটেই ঠিক হবে না। বর্তমান সরকার বিগত ১৫ বছরে যতবার নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে, তা দুঃখজনকভাবে আলোর মুখ দেখেনি। তখন আবার আর একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে। চালুর সময় প্রতিবারই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে নানান বক্তব্য তুলে ধরা হয়। কিন্তু তার ত্রুটি ধরা পড়তে এক বছরও অপেক্ষা করতে হয় না। ঘন ঘন শিক্ষার কারিকুলাম ও কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার আরও অবনতি হয়েছে।

ফিনল্যান্ডেও ধর্মীয় বিভাজন বিদ্যমান। এর জন্য স্টিভ ব্রুস-এর রেলিজিওন ইন দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড ফ্রম ক্যাথেড্রালস টু কাল্টস (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, অক্সফোর্ড, নিউ ইয়র্ক, ১৯৯৬) বইটি দেখার অনুরোধ করব। ইউনেসকোর সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার একটি স্তর পর্যন্ত সবাইকে একই কারিকুলামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন সেক্টরে শিশুর জন্য আলাদা পাঠক্রম চালু করা হয়নি। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা একমুখী ও বাধ্যতামূলক। স্কুলে কোনো ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা নেই। প্রাথমিক পড়ালেখা ও অঙ্ক কষার সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। বিগত ৫৩ বছরে ইউনেসকোর সেই একই সিদ্ধান্তের স্বাক্ষরদাতা হয়েও বাংলাদেশ আজও একমুখী শিক্ষার প্রচলন করতে পারেনি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন ধারায় বিভাজিত। এ বিভাজন বজায় রেখে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন অসম্ভব। এ বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়েছে। এটাই মূল কারণ।

‘যত টাকা লাগে আমি দেব’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ১৫ বছর ধরে তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আছেন। জিডিপির শতকরা কত অংশ শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, তিনি ভালোভাবেই জানেন। স্বাধীনতার পর থেকে ২ শতাংশের আশপাশেই আছে এই বরাদ্দ। চলতি অর্থবছরে তা সর্বনিম্ন। ১.৭৬ শিক্ষা ও ১ শতাংশ গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফিনল্যান্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৭.৫-৮.৫ এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনী খাতে ৩% রাখা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী খাতে জিডিপির মোট ৮.৫-৯.৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। অনেকটা প্রাকৃতিক বিষয়ের মতো। বইও একসময় তেমনই আমাদের জীবনের সাথি ছিল। মোবাইল ফোনের আগমনে বই ক্রমে আমাদের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। এ ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। বইকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন ফিনল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী।স্কুলের শিক্ষকরা স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে তাদের কর্তব্য পালন করেন। কখনও সীমা অতিক্রম করেন না। আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র। অর্থাৎ সেখানে স্কুলগুলো রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত। সেখানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয় সাত বছর বয়সে। তৃতীয় শ্রেণিতে একটি বিদেশি ভাষা শেখার শুরু হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কে পড়াবেন? ফিনল্যান্ডের শিক্ষা কারিকুলাম আমাদের দেশে আমদানি করা মোটেই কঠিন নয়। কঠিন হলো তা কার্যকর করা। কে পড়াবেন সেই কারিকুলাম? ফিনল্যান্ডের শিক্ষকের সর্বনিম্ন একাডেমিক যোগ্যতা হলো শিক্ষাবিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি। ফিনল্যান্ডসহ পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘শিক্ষা বিভাগ’ আছে। সে বিভাগটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। আমাদের দেশে যেমন বিসিএস, এমবিএ, বিবিএ। আমাদের যেমন এসব বিভাগে মধু আছে, তেমনই মধু আছে ফিনল্যান্ডের ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন-এ। জাতীয় বেতনকাঠামোর অত্যন্ত সম্মানজনক স্থানে রয়েছেন স্কুলশিক্ষকরা এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি ছাড়া সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অমার্জনীয় অসম্মানজনক অবস্থানের জন্য রাষ্ট্র কখনও লজ্জিত হয়েছে, এমনটা আমাদের জানা নেই। এর কোনো প্রতিকার আছে বলে অনেকেই মনে করেন না। প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়সংকল্প বাস্তবায়নের পথে এটি প্রধান বাধা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করার কারিগর। তাদের মেরুদণ্ডই যদি দুর্বল হয়, তাহলে জাতির মেরুদণ্ড শক্ত হবে কী করে?প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার পথে আরও বাধা আছে। তার মধ্যে প্রধান দুটি হলো প্রকাশকদের নোটবই আর শিক্ষকদের কোচিং সেন্টারের ব্যবসা। এ দুটি শিক্ষাবিরোধী বাধা বিগত ৫০ বছরে শিক্ষাকাঠামোর কবর রচনা করেছে। এখান থেকে বের হয়ে আসা এখন ভীষণ কঠিন মনে হয়। এর সঙ্গে সমাজের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বন্ধন এতই নিবিড় যে, এই ব্যবসা বন্ধ করা কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ নয়- এমনটিই মনে হয়। প্রধানমন্ত্রীর যে ঘোষণা তা নিশ্চিয় গুরুত্ববহ। প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর কঠিন আপাতত মনে হলেও অসম্ভব নয়, যদি বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে। দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর এ সংকল্পের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। নতুন সরকারের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। কোনোটাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে শিক্ষার মানোন্নয়নের চ্যালেঞ্জ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। 

  • গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা