× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমাজ

গোটা ব্যবস্থাটাই ব্যবসাকেন্দ্রিক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:১৬ এএম

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

নিতান্ত নিরীহ ভালোমানুষ ছিলেন অ্যাডভোকেট ভুবনচন্দ্র শীল। কিছুদিন আগেও জীবিত ছিলেন, এখন নেই। প্রাণ হারিয়েছেন। কোনো দুর্ঘটনায় নয়। দুর্ঘটনা তো এখন নিত্যনৈমিত্তিক। ট্রাক ও অটোরিকশার সংঘর্ষে ‘একসঙ্গে প্রাণ গেল বাবা, ছেলে ও মেয়ের’ এটা তো কোনো খবরই নয়। কিন্তু ভুবন শীলের ঘটনাটা একটু অন্যরকমের, সেজন্য পত্রিকায় বেশ বড় করেই এসেছিল। মোটরসাইকেলে তিনি ঘরে ফিরছিলেন, সন্ধ্যাবেলায়। ঢাকার ব্যস্ত তেজগাঁও শিল্প এলাকা দিয়ে। ঘর মানে মেস, যেখানে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে তিনি থাকেন। তার স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা, থাকেন নোয়াখালী। একমাত্র কন্যাটি কলেজে পড়ে। অ্যাডভোকেট ভুবন শীল কাজ করেন ঢাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। ঘরে ফেরার পথে পড়ে গেলেন দুই দলের সন্ত্রাসীদের মধ্যকার এক যুদ্ধে। যে সে সন্ত্রাসী নয়, একেবারে শীর্ষ সন্ত্রাসী দুই দলের যুদ্ধ। ওই সন্ত্রাসী নেতাদ্বয় একসময় পরস্পরের বন্ধু ছিল, মিলেমিশে একসঙ্গে কাজকর্ম করতÑএমন খবর সংবাদমাধ্যমের। ঘটনাচক্রে ধরা পড়েছে দুজনই। ২৪ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই সন্ত্রাসীর একজন জামিনে মুক্ত হয়ে চলে এসেছে নিজের এলাকায়। অন্য সন্ত্রাসী রয়ে গেছে বন্দি অবস্থায়। তবে সেখান থেকে সব খবরই সে পায়, যোগাযোগও রাখে। খবর পেয়েছে যে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’-এর কর্তৃত্ব মুক্ত সন্ত্রাসীর হাতে চলে যাচ্ছে।এও সংবাদমাধ্যম থেকেই জানা গেছে।


রাজত্বই যদি না থাকে তাহলে রাজা আবার কিসের রাজা? বন্দি রাজা তাই তার লোকজনদের হুকুম দিয়েছে মুক্ত রাজার গতিবিধির ওপর চোখ রাখতে। চোখ রাখার পর হুকুম এসেছে সন্ত্রাসী বন্ধুটিকে নিকেশ করে দেওয়ার। নির্দেশ অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয় এবং ঘটনার দিন মুক্ত শীর্ষসন্ত্রাসী ওই পথ দিয়ে যাবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে সাত-আট সন্ত্রাসী চার-পাঁচটি মোটরসাইকেলে এসে শীর্ষসন্ত্রাসীর গাড়ি ঘিরে ফেলে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তাতে শীর্ষসন্ত্রাসী মারা যায়নি, কিন্তু আহত হয়েছেন ভুবন শীল, যিনি তার মোটরসাইকেলটি থামিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বেরিয়ে যাওয়ার। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সাত দিন যমে-মানুষে ভীষণ টানাটানি শেষে তিনি মারা যান। হাসপাতাল ছাড় দিয়েছে, তাও বিল উঠেছে ৭ লাখ টাকার! এত টাকা ভুবনচন্দ্র শীলের স্ত্রীর কাছে থাকবার কথা নয়, ছিলও না; স্ত্রী ও শ্যালক মিলে চেয়েচিন্তে ধারকর্জ করে টাকাটা জোগাড় করেন। তারপর সৎকারের জন্য মৃতদেহ নিয়ে গেছেন গ্রামে। সব মিলিয়ে খরচ করতে হয়েছে ১০ লাখ। প্রাণও গেছে, টাকাও গেছে। সন্দেহ নেই যে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। স্ত্রী রত্নাদেবী শীলের একটাই প্রশ্নÑ ‘কী অপরাধ করেছিল আমার স্বামী?’ এ প্রশ্নের জবাব অবশ্যই আছে। তা হলো অপরাধ তার স্বামীর নয়, অপরাধ সেই সমাজব্যবস্থার যে সন্ত্রাসীদের জন্ম দেয় এবং নিরীহ ভালোমানুষদের বাঁচার অধিকার পারে তো কেড়েই নেয়, নইলে অত্যন্ত খাটো করে দেয়।

গোটা ব্যবস্থাটাই এখন ব্যবসাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। রাজনীতিতেও এর ছায়া পড়েছে। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিক হন, তা না হয় হলেন; কিন্তু রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে যদি ব্যবসার জৌলুশ বাড়ান, তাহলে? এমন নজিরের অভাব নেই। ব্যবসাই প্রধান অর্থনৈতিক কাজ; বিভিন্ন নামে, নানান পরিচয়ে ও আবরণে। তা ব্যবসায় প্রতারণা থাকবেই এবং রয়েছেও। ঢাকার আশুলিয়ায় এক দম্পতি ও তাদের স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি নিহত হয়েছেন। হত্যাকারী আরেক দম্পতি, যারা ঘরে প্রবেশ করেছিল কবিরাজ সেজে। অভ্যাগতদের আপ্যায়ন করা হয়েছে। পানীয় তৈরি করা হয়েছিল, প্রতারক কবিরাজরা কৌশলে শরবতে চেতনানাশক বড়ি মিশিয়ে দেয়। ওই শরবত সেবনে ঘরের তিনজন অচেতন হয়ে পড়লে তাদের হাত-পা বেঁধে টাকাপয়সা যা ছিল লুট করে নেয়। বেশি পায়নি, ঘরে ছিল মাত্র ৫ হাজার। এতে কবিরাজ দম্পতির প্রচণ্ড রকমের রাগ হয়েছে। তারা বঁটি দিয়ে বাবা, মা ও ছেলের গলা কেটে ফেলে রেগে চলে গেছে।

বাইরে তো বটেই ঘরের ভেতরেও মানুষের নিরাপত্তা এখন ওই স্তরে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ঘটেছে আরও ভয়ংকর ঘটনা। সেখানে দুই পুত্র ও তাদের স্ত্রীরা মিলে পিতাকে প্রথমে হত্যা করেছে, পরে ১০ টুকরো করে কেটে ব্যাগে ভরে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়ে এসেছে। ঘটনা এ রকমের যে, ওই পিতা দীর্ঘ ২৭ বছর অনুপস্থিত ছিলেন। জাহাজে কাজ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন বিদেশে। অত বছর পরে বাড়ি ফিরে তিনি ঠিক করেছেন বাড়ি বিক্রি করে দেবেন। এই পিতা সন্তানদের পিতৃত্বও অস্বীকার করেছেন এবং আরও একটি বিয়ে সম্পন্ন করেছেন বলে জানিয়েছেন। পুত্র ও পুত্রবধূদের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধতো। ওইদিন কথাকাটাকাটির সময় পিতা তার বড় ছেলেকে জোরে চড় মারেন। ছেলে শুনবে কেন? সে বাবার গলা টিপে ধরে। বাবা তাতে প্রাণ হারান। পরবর্তী ঘটনা বাবাকে কেটে ১০ টুকরো করা। সম্পত্তি অনেক মূল্যবান মানবিক সম্পর্কের তুলনায়। খুবই স্বাভাবিক মনে হবে এ খবরটিতেও যে বাড়িতে ঢুকে বাবা-মাকে জিম্মি করে মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে; খুলনায়।

অন্যায়ের প্রতিবাদ যে একেবারেই হয় না তা নয়। প্রতিবাদ হয়। মানববন্ধন, সমাবেশ, মিছিল এমনকি হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি ডাকা হয়। কিন্তু তাতে তেমন একটা ফল হয় না। প্রতিবাদ একসময়ে বেশ হতো। বড় সমাবেশ হতো, মিছিল হতো। এখন সেগুলো অতীতের স্মৃতি। জর্জ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন তখন ঢাকা শহরে বড় বড় প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে। মুসল্লিরা মস্তবড় মিছিল বের করেছিলেন। তার চেয়েও বড় মিছিল করেছে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো একত্র হয়ে, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। অথচ এখন যখন ইসরায়েলি ঘাতকরা ইরাকে মার্কিনি হত্যাকাণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি বর্বর ও অমানবিক গণহত্যা ঘটিয়ে চলেছে গাজায় এখন তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই। এখন প্রতিবাদী সমাবেশের জন্য খোলা জায়গাই নেই; মিছিল করাও দুঃসাধ্য। ট্রাফিক আছে, রয়েছে পুলিশ। তার চেয়েও বড় সত্য উৎসাহ নেই, উদ্যম নেই মানুষের। মানুষ এখন খুবই একা, বড়ই ব্যস্ত নিজেকে বাঁচানো নিয়ে। মানুষ এখন ভীষণ নিঃসঙ্গ। তাকে শ্রম বিক্রি করে বাঁচতে হয়। বিক্রির বাজারে অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বাজার ক্রেতার, বিক্রেতার নয়। কাজ খুঁজতে হয়, অস্থিরভাবে। মূল্যস্ফীতি এমন যে একটা কাজে আর কুলায় না। ওদিকে পণ্য কেনার জন্য লাইন দিতে হয় টিসিবির ট্রাকের সামনে। ভুগতে হয় নানা প্রকারের নিরাপত্তাহীনতায়।

ব্যবস্থার গলদ যেখানে দূর হয় না সেখানে অবস্থা ভালো করা কঠিন। যত মর্মস্পর্শী কিংবা জীবনবৈরী ঘটনা ঘটছে এর বেশিরভাগই ঘটছে ব্যবস্থাপনার গলদের কারণে। এসব নিয়ে কথা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজ হয় কতটা এর সাক্ষী তো বিদ্যমান বাস্তবতাই। ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে অবস্থার পরিবর্তন আশা করা নিশ্চয় দুরাশা। নিরাপত্তাহীনতা তো বটেই, স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অন্তরায় রয়েছে আরও কত কিছু। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর শেষ কোথায়? বায়ুদূষণে মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। শিশুরা খর্বাকৃত হচ্ছে। বাজারের তাপ সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বাজারের চাপে-তাপে নাকাল। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বাগাড়ম্বর ছাড়া কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না।

মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। খুব দূর অতীতের ঘটনা নয়। সেখানে যে ব্যবসায়ী ৪ লাখ টাকার জিনিস কিনে রেখেছিলেন, বিক্রি করতে পারবেন বলে, তিনি এক টাকার জিনিসও বিক্রি করতে পারেননি, সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে পড়েন। এসব জায়গায় উন্নয়ন ঘটবে দ্রুত গতিতে। উঁচু দালান উঠবে, কিন্তু উৎপাটিতরা আর শিকড় খুঁজে পাবে না। সংবাদমাধ্যমেই আরও জানা গেল, এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেখা গেল, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামায় অনেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্যের, তাদের স্ত্রীদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি ঘটেছে অবিশ্বাস্য, প্রায় অলৌকিক রকমের। এ বিষয়ে একটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় শীর্ষ শিরোনাম ছিল এ রকমের : ‘জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় হলফনামায় দেওয়া মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বেড়েছে ১ থেকে ২০০ গুণ পর্যন্ত’। এদের অনেকেরই আয়ের উৎস নাকি মাছের চাষ! রাজনীতিও ব্যবসার ক্ষেত্র হয়ে গেল!

  • শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা