প্রতিবেশী
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৪ ১০:২০ এএম
মযহারুল ইসলাম বাবলা
আসামে বসবাসরত বাঙালির জাতীয়তার সংকট বহুকালের। ১৯০৪ সালে মওলানা ভাসানী বাংলা
থেকে বিতাড়িত হয়ে আসামে যান। ১৯২৯ থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি আসামের অধিকারবঞ্চিত বাঙালির
অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি প্রত্যক্ষ যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় গবেষক বিমল জে দেব
ও দিলীপ কে লাহিড়ীর অভিমত, ‘আসামের বাঙালি কৃষিকাজে অংশ নিলেও কৃষিজমির মালিকানা তাদের
ছিল না; জমিদার-ভূস্বামীরা যখন ইচ্ছা তখন বাঙালি কৃষককে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারত।
মওলানা ভাসানী আসামের ভাসানচরে আসাম-বাংলা প্রজা সম্মেলনের মাধ্যমে স্বল্পপরিসরে হলেও
সাধারণ বাঙালি প্রজাদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। ১৯২০ সালে আসাম সরকারের
প্রবর্তিত ‘লাইন প্রথা’র বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী আন্দোলন গড়ে তোলেন। আসামের বঞ্চিত
বাঙালিকে সংগঠিত করে গঠন করেন ‘আসাম চাষী মজুর সমিতি’। এ সমিতির মাধ্যমে লাইন প্রথার
বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন সংঘটিত করেন।

১৯৩৭ সালে সর্বপ্রথম আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে মওলানা
ভাসানী পার্লামেন্টে কুখ্যাত লাইন প্রথা বিরোধী বিল উত্থাপন করেন। ওই বছরই লাইন প্রথার
বিরুদ্ধে রাজ্যের কংগ্রেস সরকারের নির্লিপ্ত ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। ১৯৪২
সালের ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা-আসাম প্রজা সম্মেলনে কঠোরভাবে সরকারকে জানিয়ে দেন, ৩১
মার্চের মধ্যে লাইন প্রথা বিলুপ্ত না করা হলে এপ্রিলে তিনি আইন অমান্য আন্দোলন শুরু
করবেন। সরকার বিপদ বুঝতে পেরে এক বছরের জন্য মওলানা ভাসানীর সব সভাসমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা
জারি করে। কিন্তু আইন জারি করেও তাকে দমন করা সম্ভব হয়নি। মওলানা ভাসানীর চাপে ১৯৪৩
সালের ২৪ আগস্ট লাইন প্রথাকে কিছুটা শিথিল করতে সরকার বাধ্য হয়। ১৯৪৪ সালের মার্চে
ব্যবস্থাপক সভার বাজেট অধিবেশনে ভাসানী আসামের অতিরিক্ত জমি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে
নৃগোষ্ঠী, হিন্দ-মুসলিম ভূমিহীন কৃষক ও বাঙালির মধ্যে বিলিবণ্টনের দাবি জানান।
১৯৪৪-৪৫ সালে অহোম জাতীয় মহাসভার আহ্বানে আসামে ‘বাঙালি খেদা’ আন্দোলন তীব্র
আকার ধারণ করে। এর বহু আগ থেকেই অসমীয়রা আসাম রাজ্য থেকে বাঙালি বিতাড়নের নানা কর্মসূচি
পালন করে আসছিল। মওলানা ভাসানী মঙ্গলদই, বরপেটা, গুয়াহাটিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি
উচ্ছেদ ও রাজ্য সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অভিবাসী
বাঙালিকে সংগঠিত করে আসামে বাঙালি খেদা বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। আসাম থেকে বাঙালি
বিতাড়নের ঘটনা তাই নতুন নয়, বহুকাল ধরেই অসমীয়রা এর জন্য অহিংস-সহিংস উপায়ে চেষ্টা
চালিয়ে আসছে। ১৯৮৫ সালে কংগ্রেস শাসনামলে স্বাক্ষরিত আসাম চুক্তিতেই আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি
(এনআরসি) তৈরির কথা উল্লেখ ছিল। সেইমতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ রাত ১২টার আগে যারা রাজ্যে
বসবাসের প্রমাণ দিতে পারবে, তাদেরই কেবল ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। অসমীয়দের
এ দাবির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ফলেই আসামে বিজেপির সরকার গঠন সহজ হয়। এনআরসি বাস্তবায়নের
মুলো ঝুলিয়ে হিন্দু বাঙালির সমর্থন আদায়ের কৌশল গ্রহণ করে ধারাবাহিকভাবে বিজেপি নির্বাচনী
বৈতরণী পেরিয়ে আসছে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত চুক্তির ওই ধারা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
সংসদেও বিল পাস হয়। ওদিকে কেন্দ্রের শাসকদল হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সারা ভারতে নাগরিকপঞ্জি
তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ জারি রেখেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন,
‘গোটা দেশকেই আমরা অনুপ্রবেশমুক্ত করব।’ পাশাপাশি বলেন, ‘শুধু আসাম নয়, দেশের কোনো
রাজ্যে একজন বিদেশিরও স্থান হবে না। সব জায়গা থেকে অবৈধ অভিবাসী উচ্ছেদ করা হবে।’ নাগরিকত্ব
বিলে সংশোধন আনতে বদ্ধপরিকর কেন্দ্রীয় সরকার। তারা চাইছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান
থেকে আসা হিন্দু অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে আর মুসলিম অভিবাসীদের ভারত থেকে
বিতাড়ন করতে।
চূড়ান্ত এনআরসি তালিকায় আসামে বসবাসকারী
১৯ লাখ মানুষকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এ ১৯ লাখের মধ্যে ১২ লাখই হিন্দু।
চূড়ান্ত তালিকা তাই বিজেপির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়নে খোদ বিজেপিতেই
এখন অনীহা-শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দলটির ভেতরেই বিভক্তি-বিভাজন ক্রমাগত প্রকাশ পাচ্ছে।
বিজেপির সাবেক সভাপতি অমিত শাহসহ নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে ক্রমাগত বলতেন,
অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। গুয়াহাটি সফরে অমিত শাহ কিন্তু একবারও
বলেননি অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক
সম্পর্কে যাতে জটিলতা সৃষ্টি না হয় সেই অভিপ্রায়ে তিনি কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ
সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এস জয়শঙ্করও ঢাকা সফরে এসে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।’
অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প এবং ভারতে মোদি সরকারের হুংকার-আস্ফালন বিশ্বব্যবস্থায় নিন্দিত ইতিহাসে হিসেবেই বিবেচিত হবে। ট্রাম্পের পূর্বপুরুষ যেমন ইউরোপপ্রত্যাগত মার্কিন অভিবাসী, তেমন ভারতের রাজনীতিকদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যাবে তারাও অভিবাসী হয়েই ভারতে আশ্রিত হয়েছিলেন। এমনকি অসমীয়রাও অভিবাসী। তারাও হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল না। আর এটাতো সত্য, মানবসভ্যতার বিকাশ ওই অভিবাসীদের আগমনের মাধ্যমে বিশ্বময় ছড়িয়েছিল। ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন ভারতের সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল। তুর্কি, মোগলদের আগমনও ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে নিশ্চয় অগুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কাজেই বিজেপি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যতই স্বপ্ন দেখুক না কেন, বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে নিকট ভবিষ্যতে জানা যাবে। কেননা ভারত যেমন এক জাতির দেশ নয়, তেমন একক সম্প্রদায়েরও নয়। বিজেপির ‘হিন্দুস্থান ফর অনলি হিন্দুজ’-এর বিপরীতে ভারতীয়মাত্রই এক জাতির আওয়াজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নিশ্চয় রয়েছে। সম্প্রদায়বিভক্তিতে ভারতকে কোন পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। জাতিবিভক্তি এড়াতে সব ভারতীয় এক জাতির আওয়াজ এবং সম্প্রদায়বিভক্তির বিজেপির হীনতৎপরতা একক ভারতীয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অভিমুখেই ঠেলে দেবে- অনেকেরই এই অভিমত। তবে এমন অভিমত যে অমূলক নয় তাও বলা যায় অনেকটা সন্দেহাতীতভাবেই।