পরিপ্রেক্ষিত
‘আমাদের প্রজন্মের
এখন আশা বলতে কিছুই নেই’—২০২৩ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা এই কথা তরুণ প্রজন্মের
সম্ভাবনার মোহভঙ্গের প্রসঙ্গটিই তুলে এনেছিল। গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে গোটা
বিশ্ব বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে সারা বিশ্বের নানা প্রান্তে
ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা হাতের মুঠোয় চলে আসছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গণতন্ত্র,
মানবাধিকার, সম-অধিকার, লিঙ্গসমতা, পোশাকের স্বাধীনতার মতো বিষয়ে তরুণদের একটা অংশ
যেকোনো সময়ের চেয়ে সচেতন। এ-ও সত্য, প্রযুক্তির বিকাশে যাপিত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে
মনোযোগ হারানোর নানা উপাদানও রয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে গুজব কিংবা গুঞ্জন ছড়িয়ে দেওয়া
অপেক্ষাকৃত সহজ। তথ্যের যাচাই-বাছাই কিংবা নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে
অসম্ভব বিধায় তরুণ প্রজন্ম নানা ধরনের রক্ষণশীল, বিদ্বেষপূর্ণ ও অসহায় চিন্তা দিয়ে
প্রভাবিত হচ্ছে বেশি। তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশের মতো আমাদের দেশের তরুণরাও এই মোহভঙ্গের
অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে।
স্বাধীনতার পর
৫২ বছর অতিক্রান্তে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে যেন অপাঙক্তেয় হয়ে পড়েছে, এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে
নানা মহল থেকে বহুবার উত্থাপিত হয়েছে। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম
কিংবা নতুন ভোটারদের ভোট দেওয়ায় আগ্রহের বিষয়টি নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। রাজনীতিতে
তরুণ প্রজন্মের প্রতি সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা থাকে বেশি। অনভিজ্ঞ তরুণের এই অভিজ্ঞতাহীনতাই
তৃণমূল পর্যায়ে দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
দেশের মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হওয়া এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার
সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও বাড়ে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার, বিদ্যমান
রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক সংকটের ঘাত-প্রতিঘাতে তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায়
ভুগছে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তবে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের
বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ফের আশা জাগায়।
দেশের তরুণ প্রজন্ম স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতিতে এগিয়ে আসবে, তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনকে ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও বিশ্বদরবারে গর্ব করার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করবে- এটাই প্রত্যাশা। তরুণদের ও উন্নতির সম্ভাবনা অনেক। তবে সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণ বিকশিত করার জন্য অনিয়ম-দুর্নীতি বা রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর সবকিছুর নিরসন জরুরি। রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা ও নীতিহীন বিভাজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার বিরোধ-দ্বন্দ্বের জেরে জড়িয়ে পড়ছে ছাত্র রাজনীতিকরাও। কমে আসছে জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতির অনুশীলন। দলীয় পদবাচ্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তরুণদের অনভিজ্ঞতার মতো মূল্যবান অবলম্বনকে ব্যবহার করছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা, এমন অভিযোগও নানা মহলের। আমরা এসব কিছুর পরিবর্তে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিশুদ্ধের অনুশীলন প্রত্যাশা করি। আমরা আশা করি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা চতুর্থবার সরকার গড়তে যাওয়া আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাবে। তরুণদের গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্বতস্ফূর্ততার বিষয়টিকে তাই গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের মধ্য থেকেই খুঁজে আনতে হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতিকদের। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার বিষয়ে অতীতেও আওয়ামী লীগ সরকারের উৎসাহ দেখা গেছে। সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা- তরুণ প্রজন্মের পূর্ণ বিকাশের পথে যা কিছু বাধা হয়ে আছে সেই অনিয়ম-দুর্নীতি, ক্ষমতার রাজনীতি ও রাজনৈতিক নৈরাজ্য দূর করে মেধাভিত্তিক রাজনীতির পথ গড়ে তোলা হবে।