× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দেশে জঙ্গিদের সক্রিয় হওয়ার দুই কারণ

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২২ ১৮:২৭ পিএম

দেশে জঙ্গিদের সক্রিয় হওয়ার দুই কারণ

দেশে জঙ্গি কিংবা উগ্রবাদীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও অভিযানের সফলতা সন্তোষজনক। এরপরও আমরা দেখছি জঙ্গিরা সময় সময় নানা নামে সংগঠিত হয়ে অপতৎপরতা চালাতে চেয়েছে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তড়িৎ তৎপরতার কারণে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে এজন্য সাধুবাদ জানাই। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে জঙ্গিরা অবস্থান করছে ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে- এই খবরের ভিত্তিতে র‌্যাব ১০ অক্টোবর থেকে পার্বত্য এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে আটক করে র‌্যাব। জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া যায় অনেক তথ্য। র‌্যাবসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ ব্যাপারে যে কর্মতৎপরতা সময় সময় দেখা গেছে, এর ফলে জঙ্গিদের অনেক পরিকল্পনার ছক ভেঙে দিতে পেরেছে তারা । অকল্যাণের থাবা থেকে তাদের এমন উদ্যোগ আমাদের রক্ষা করেছে।   

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ উত্থানের মূলে দুইটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। একটি হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি। এ দুটির মধ্যেই জঙ্গিবাদের উত্থান নিহিত রয়েছে। একাডেমিক জায়গা থেকে বিশ্ব জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে নানা কারণের বর্ণনা থাকলেও সর্বশেষ আমরা দেখি, নাইন ইলেভেনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে সারা পৃথিবীতে এধরনের ঘৃণ্য অপরাধ ছড়িয়ে গেছে। নাইন ইলেভেনের পরবর্তী সময় মুসলমানদের ওপর বিভিন্নভাবে নানা ধরনের লাঞ্ছনা, অপমান বা গ্লানি এসেছে। সেগুলো যেমন একদিকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠিকে তাদের জিহাদি রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের আর্থসামজিক উন্নয়নের যে ঐতিহাসিক বিকাশ- ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে ইসলামিকরণের কথা বলে রাষ্ট্রের মূলনীতি উপড়ে ফেলে জঙ্গিবাদকে প্রসারিত করার বড় ধরনের প্রয়াস আমরা লক্ষ্য করে থাকি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত যে দেশের চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, তা সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে এখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশ্বরাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি একাকার হয়ে এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্ভব হয়েছে। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে যে অপশক্তির উত্থান ঘটেছিল  এবং উগ্রবাদীদের ফেঁপে-ফুলে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল বিশ্বরাজনীতির ধারক-বাহকরা। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে থেকে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছে, শুধু তারা জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়েছে- এমনটি বললে অসম্পন্ন থেকে যাবে। বরং বলতে হবে বিশ্বরাজনীতির ধারক-বাহক ও বাংলাদেশের ৭৫ পরবর্তী অবৈধ শক্তি- এই দুইয়ে মিলে জঙ্গিবাদকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। হলি আর্টিজনের হামলা আমাদের সামনে নতুন করে যে বিষয়টি নিয়ে এসেছিল, তা হলো- ৮০’র দশকের শেষে বা ৯০ দশকের শুরুতে আমরা দেখেছি জঙ্গিবাদ উত্থানের সঙ্গে দারিদ্র্যের একটা সম্পর্ক ছিল। সেসময় আমরা দেখেছি যারা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হতো তারা আর্থসামাজিক বাস্তবতায় নীচের দিকে ছিল। তাদের নানাভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এরপর আফগানফেরত মুজাহিদদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে হুজি, জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের উত্থান দেখেছি। আমরা দেখেছি তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়েই টিকে ছিল। 

উন্নত বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ইতিহাস যদি আমরা দেখি, সেখানেও শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে কোনো না কোনোভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায়ও এ ধরনের কার্যকলাপ খুবই ক্রিয়াশীল আছে। ক্রিয়াশীল আছে বলেই আমরা বলি বর্তমান তরুণ প্রজন্ম খুবই ঝুঁকিপ্রবণ। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নানাভাবে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপ্রবণ বলছি এই কারণে যে, একসময় তরুণ সমাজের নানা ধরনের সামাজিক কাজ ও দেশের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ক্ষেত্র প্রসারিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তাদের সামাজিকীকরণ, নৈতিক মূল্যবোধ, শরীরচর্চা, মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে নানাভাবে তারা প্রযুক্তির ভেতর আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। এই আচ্ছন্নতার কারণে তাদের মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতায় বড় ধরনের শূন্যতা হওয়ার পথ তৈরি হয়। এই প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে খুব বেশি অবহিত নয়। ঠিক একইভাবে তাদেরকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার প্রক্রিয়াও নেই। ফলে তারা ভারনাবল। একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, তাদের এই বয়সটি হলো প্রতিবাদ করার বয়স। তারা সমাজে নানারকম অসমতা, ন্যায়বিচার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখে আসছে। কিন্তু নানা কারণে তাদের প্রতিবাদ করার সুযোগ কমে গেছে। ফলে এ থেকে তাদের ক্ষোভ সুপ্ত থাকছে। আর মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে তাদের সেই সুপ্ত ক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো। ইন্টারনেটে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাসহ নানা ধরনের বিষয় উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তাদেরকে উগ্রবাদে জড়ানো হচ্ছে। এরপরও জাতির কাছে এটা খুবই অপ্রতাশিত যে, এই বয়সের ছেলে-মেয়েরা এধরনের জঘন্য কাজ সংঘঠিত করবে। সমাজতাত্ত্বিকভাবে মনে করি, আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এখানে বড় দায় আছে। তারা কখনও তাদের রাজনৈতিক কার্যসূচিতে এই প্রজন্মকে যুক্ত করেনি। এর ফলে আমরা দেখেছি অরাজনৈতিক ছদ্মাবরণে বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলো নানাভাবে এই সন্তানদের সংগঠিত করতে পেরেছে। আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবে যদি যুবসমাজকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে, তাহলে এই বিভ্রান্তি অনেকটাই কেটে যেত। বড় রাজনৈতিক দলগুলো যে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করেছে তা মনে হয় না। আমরা জঙ্গিবাদকে একেবারেই নির্মূল করে ফেলব- বিশ্ববাস্তবতা আমাদের সেটা বলে না। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা ধরনের পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের যুবসমাজকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণই আমাদের মূল লক্ষ্য বা কাজ হওয়া উচিত।  

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে নানারকম সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তা বিশ্ব রোল মডেল স্থাপন করেছে। এমনকি ইন্টারপোলের প্রধান বাংলাদেশে একটি সম্মেলনে এসে এদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবে জঙ্গিবাদের মতো একটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু কঠোর পদক্ষেপ নিলেই হবে না, বরং যারা এ সমস্ত কাজে যুক্ত হচ্ছে, তাদেরকে সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করার ওপর জোর দিতে হবে। হলি আর্টিজেনের ঘটনার পর এধরনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। জঙ্গিবাদ ঠেকাতে গোটা জাতি উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। এজন্য শিক্ষার মানবিক চেহারা দেওয়া দরকার। আমরা এজন্য নানা সুপারিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই কাজটি হয়নি বললেই চলে। সরকারসহ প্রত্যেককেই এই কোমল পদক্ষেপে যেতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তরুণদের দেশ গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানে জঙ্গিবাদ থেমে থাকেনি। এর অর্থ হলো জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। এটাকে শতভাগ উপড়ে ফেলা যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। 

হলি আর্টিজেনের রায়ে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম অধিক সঙ্গত কারণেই। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসম্পর্ক ও আন্তঃযোগাযোগের মধ্য দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় এ যুগান্তকারী রায় আসে। এটি ছিল আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ গোটা জাতি এধরনের একটি রায় প্রত্যাশা করেছিল। ভুলে গেলে চলবে না- এই দেশ এমন একটি দেশ, যে দেশে তার প্রতিষ্ঠাতাকে সপরিবার হত্যা করা হয়েছিল। সেই রায় পেতে আমাদেরকে ২১ বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এ ছাড়াও, আরও কিছু হত্যার বিচার এখন পর্যন্ত হয়নি। ফলে আমাদের বিচারব্যবস্থা ধ্বংসের উপক্রম হয়েছিল। এই রায়ের পর আমি বলেছিলাম, আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যারা পর্দার আড়ালে থেকে এসব ঘৃণ্য কাজের নেতৃত্ব দেন, তারা কতটা চিহ্নিত হয়েছেন। 

আবারও বলি, জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। হলি আর্টিজেনের পর আমরা অনেক বিতর্ক দেখেছি। গোয়েন্দারা সজাগ থাকলে তাদের কার্যক্রম সহজেই নস্যাৎ করা যাবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পুলিশের কাউন্টার টেরেরিজম ইউনিটসহ যেসব বিভাগ চালু করা হয়েছে, সেগুলোকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনে গবেষণা, সভা, সেমিনার জোরদার করা দরকার। এর বহুমুখী সুফল আশা করা যায়। এক কথায় এ ক্ষেত্রে খুব জরুরি যূথবদ্ধ কার্যক্রম।

লেখক : সমাজবিজ্ঞানী। অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা