× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

একটি মৃত্যু, অনেক প্রশ্ন ও দায়

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৪৪ এএম

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:৫২ পিএম

একটি মৃত্যু, অনেক প্রশ্ন ও দায়

‘…কেউ আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে না উদিত সূর্যের সাথে/ কপোতের জলসায় ডেকে নেবে না কেউ উজ্জ্বল প্রভাতে।/ জাগ্রত রাখো মনে উড্ডয়নের বাসনা/ হয়তো মৃত্যু হবে পাখিটির/ কীটদ্রষ্ট হবে তার শুভ্র ডানা।’ ইরানের কবি ফোরুগ ফারখজাদ-এর ‘পাপ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলো কত জীবনের সঙ্গে মিশে আছে এর হিসাব মেলানো ভার। আমাদের সমাজবাস্তবতায় কত জীবন কীটদ্রষ্ট হচ্ছে এর নজিরও কম নেই। কতভাবেই তো মানুষের জীবন সংহারে মর্মস্পর্শী বেদনার ছায়া ছড়িয়ে যায় চতুর্দিকে। এর সর্বসাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত কিশোর মো. সিয়াম। ৩ জানুয়ারি ‘আগুনে দ্বগ্ধ সিয়ামকে বাঁচানো গেল না’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা যেমন মর্মস্পর্শী তেমনি জিজ্ঞাসারও। সিয়ামের জীবনের অন্তিম অবসান ঘটে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপনের আনন্দের উন্মত্ততায়। এ কেমন আনন্দ, যে আনন্দ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়! এ কেমন আনন্দ, যে আনন্দ মানুষের মনে বেদনার গভীর রেখাপাত করে!

থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন আমাদের কতটা সংস্কৃতি-সংলগ্ন সেই বিতর্কে না গিয়েও আমরা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন রাখি, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খ্রিস্টীয় বর্ষবরণের আতশবাজি-ফানুসে কেন জনজীবন ফিরে ফিরে তটস্থ হয়ে ওঠে? বিধিনিষেধ তো নয়ই, সংকটের মাঝেও আতশবাজি-ফানুসজনিত তথাকথিত আনন্দে পরিস্থিতি কত প্রাণসংহারী হয়ে উঠতে পারে এরই ফের নজির মিলেছে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখ রাতে। পরের দিন সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, ‘পটকা-ফানুসে তিন স্থানে আগুন, ৯৯৯-এ ও ৯৭১-এ কল’ শিরোনামে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের জরুরি সেবা নেওয়ার লক্ষ্যে ফোনকল। যেকোনো সভ্য ও মানবিক সমাজে নাগরিকের শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিবিধান রয়েছে এবং সামাজিকভাবেও নাগরিকরা নিজ উদ্যোগেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের পাশাপাশি এক্ষেত্রে দায়বোধ থেকে দায়িত্ব পালন করলেও আমাদের সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই এসব ব্যাপারে এখনও অনেক পিছিয়ে। যদি তাই না হতো তাহলে সিয়াম তথাকথিত আনন্দ কিংবা বর্ষবরণ উদযাপন উল্লাসের নির্মম বলি হতো না। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বর রাতে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন দেখতে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে বাসার ছাদে উঠে ফানুসের আগুনে ঝলসে যায় সিয়ামসহ আরও তিনজনের দেহ। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলেও দেহের সিংহভাগ পুড়ে যাওয়া সিয়ামকে নিয়ে চিকিৎসকরা শঙ্কায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সিয়ামের জীবন রক্ষা করা গেল না, প্রায় ২৮ ঘণ্টা চিকিৎসাধীন থাকার পর ২ জানুয়ারি তার প্রাণপ্রদীপ নিভে যায়।

প্রতিবছর খ্রিস্ট্রীয় বর্ষবরণে থার্টি ফার্স্ট নাইট আয়োজনে আতশবাজি পোড়ানো ও ফানুস না ওড়ানোর নির্দেশনা জারি করা হয় পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তরফে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিবছরই নগরজুড়ে পোড়ানো হয় আতশবাজি, ওড়ানো হয় ফানুস আর এই প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমে মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন উঠে আসে। কিন্তু তারপরও দায়িত্বজ্ঞানহীনদের সংবিৎ ফেরে না। ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউসুফ রায়হান নামের এক শোকার্ত বাবার আহাজারির একটি পোস্ট বেদনার ঝড় তুলেছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘কী ভীষণ শব্দে আতশবাজি! আমার ছোট্ট বাচ্চাটি এমনিতেই হার্টের রোগী। আতশবাজির প্রচণ্ড শব্দে শিশু বাচ্চাটি ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে। খুব ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। খুবই আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছি।’ এর পর ওই বাবারই আরেকটি পোস্টে জানা গেল, ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠা ওই শিশুটিকে শেষ পর্যন্ত ঢাকার হার্ট ফউন্ডেশন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজনে এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই তার জীবনাবসান ঘটে! হয়তো অনেকেরই এ-ও মনে আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক আহমেদুর রহমানের পোস্টটির কথাও। তিনি লিখেছিলেন, ‘একজন তরুণের সরাসরি চোখেই আগুনে কর্নিয়া ইনজুরি, একজন পথচারীর ফানুসের আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখ, এক শিক্ষার্থী ফানুসের আগুনে বৈদ্যুতিক তার পুড়ছে দেখে তা নেভাতে গিয়ে নিজের হাত পুড়িয়ে ফেলা, আরেকটি বাচ্চার চোখমুখ ঝলসিত মর্মস্পর্শিতা; এ রকম কয়েকজন এসেছে চিকিৎসা নিতে। চিকিৎসা করতে গিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়ি।’ আমরা এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন রাখি, অন্যদের কথিত আনন্দ উদযাপনের নামে মাত্রাজ্ঞানহীন উল্লাস আর কত পরিবারে বেদনার ছায়া গাঢ় হবে, কত স্বজনকে শোক হতবিহ্বল করবে। আমাদের এও মনে রাখতে হবে আতশবাজি এবং ফানুস পরিবেশ এবং প্রাণ-প্রকৃতির জন্যও ক্ষতিকর। আতশবাজির বিকট শব্দে শত শত পাখির মৃত্যুর খবরও ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি।

আমরা এর যথাযথ প্রতিবিধান চাই। একই সঙ্গে এ-ও বলতে চাই, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনায় এমন দায়িত্বহীনতা কিংবা ‘বেপরোয়া’ উদযাপনের রাশ টানা যাবে না, যদি না একই সঙ্গে সমাজের ভেতর থেকে সচেতনতার বোধ পুষ্ট না হয়ে ওঠে। আমরা উৎসব-আনন্দ অবশ্যই চাই কিন্তু কোনোভাবেই চাই না কারও তথাকথিত আনন্দের খেয়ালে করুণ পরিণতি হোক যেকোনো প্রাণ। মানুষের উত্তেজনা দেখে বরাবরই শিবরাম চক্রবর্তীর চুটকি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছিলেন, ‘বহু বছরের কঠিন পরীক্ষার পর আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে নতুন বছর, নতুন বছর বলে খুব হইচই করার কিস্যু নেই। যখনই নতুন বছর এসেছে, এক বছরের বেশি টেকেনি।’ বছর আসে বছর যায় কিন্তু মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অর্জন ও সাফল্যের ইচ্ছা কিংবা স্বপ্নের শেষ নেই, তা যেন আমরা ভুলে না যাই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা