মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২২ ২২:০৫ পিএম
আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২ ১৪:১৬ পিএম
একান্ন বা যৌথ পরিবারের বিষয়টি বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। কেননা সময়ের বিবর্তনে একে একে একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন বহুপূর্ব হতেই শুরু হয়েছিল। এখন অবশিষ্ট যদি থেকেও থাকে তবে সেটা অতিনগণ্য। বাস্তবে শহর, গ্রাম, মফস্বল কোথাও একান্নবর্তী পরিবারের দেখা পাওয়া যায় না। সর্বত্রই পরিবার মাত্রই স্বামী, স্ত্রী এবং তাদের সন্তানেরা। এর বাইরে পরিবারভুক্ত হিসেবে কাউকে গণ্যও করা হয় না। যদি বৃদ্ধ বাবা-মা বেঁচে থাকেন তবে তাদেরকে নিয়েও ভাইয়ে-ভাইয়ে নানা টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাবা-মায়ের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনীহা দেখায় সন্তানেরা। গলায় ফাঁসের মতোই কোনো কোনো পরিবারে বাবা-মায়েরা ত্রিশঙ্কুর ন্যায় ঝুলে থাকেন, অনাদরে-অবহেলায়। একমাত্র নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-শ্রেণির পরিবারে শত কষ্টে হলেও বাবা-মায়েদের ত্যাগ না করে সন্তানেরা সঙ্গে রাখে। শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এটি কমে কমে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। গ্রাম-মফস্বলে যে রয়েছে তাও নয়।
একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাবার মূল কারণটি অর্থনৈতিক বৈষম্য তো বটেই, পাশাপাশি সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ক্রমাগত তীব্র আকার ধারণ করে চলেছে তার প্রভাবই মূলত দায়ী। মানুষের সমষ্টিগত ভাবনার জগৎ বলে বাস্তবে এখন আর কিছু নেই। সবাই যার যারÑতার তার। অর্থাৎ ব্যক্তি তার একান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে কিছুই ভাবছে না। এজন্য ব্যক্তিকে অবশ্য এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সমস্যার মূলেই ব্যবস্থা। আমরা কোন ব্যবস্থার অধীনে, সেটা অনুধাবন করতে না পারলে সমাধানের পথ কিন্তু খুঁজে পাবো না। তাই ব্যবস্থাটাকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা পরিবর্তন করা ব্যতীত আমাদের সামনে সমষ্টিগত আকাক্সক্ষা পূরণের কোনো দিশা নেই। একান্নবর্তী পরিবার মানেই যে আদর্শ পরিবার, সেটা কিন্তু নয়। একান্নবর্তী পরিবারে নিপীড়ন, যন্ত্রণা, হতাশা, বৈষম্য ইত্যাদি খুবই পরিচিত বিষয়। একই পরিবারের সকল সদস্যের আয়-উপার্জন সমান হয় না। কারও বেশি কারও কম। এই আয়ের কম-বেশিতে শ্রেণি অসমতাই বৈষম্যের জন্ম দেয়। পরিবারের কর্তৃত্ব সে-ই লাভ করে যে সর্বোচ্চ আয় করে। তারই বশবর্তী হতে হয় অন্যদের। সবচেয়ে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয় তাদেরই, যাদের স্বামীর আয়-উপার্জন স্বল্প সে সকল নারীর। সংসারে তাদের অত্যন্ত অমর্যাদাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।
কেবল নারীদেরই নয়, সে সকল পুরুষ সদস্যরও যাদের আয়-রোজগার স্বল্প। পুরো পরিবারের কর্তা-কর্ত্রী তারাই যাদের উপার্জন অধিক এবং সংসারের সর্বাধিক ব্যয়ভার যারা বহন করেন। একই পরিবারভুক্ত হবার পরও নানা ক্ষেত্রেই পরিবারের ধনী-নির্ধনের বৈষম্য প্রকাশ পায়। যে ভাইটি বা ভাইদের অধিক উপার্জন তারা একান্নবর্তী থাকাবস্থায়ও আলাদা উন্নতমানের পৃথক রান্নার আয়োজন করেন। পরিবারের অন্যদের পাশ কাটিয়ে ঘরে নিয়ে সে খাবার তারা চরম নির্লিপ্ততায় খেয়ে থাকেন। এতে পরিবারভুক্ত অন্যদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোনো উপায়ও থাকে না। তারা হতাশ হন, দুঃখিত হন, নিরুপায়ে মেনে নিতে বাধ্য হন, একান্নবর্তী পরিবারের অভ্যন্তরের এই নজরকাড়া বৈষম্য। একান্নবর্তী পরিবারের সংস্কৃতি সুদীর্ঘকাল আমাদের বঙ্গদেশে বলবৎ ছিল। পরিবারবিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। তাই বৈষম্যপূর্ণ একান্নবর্তী পরিবার দীর্ঘ মেয়াদে টিকেছিল। খাওয়া-খাদ্যের ভিন্নতার পাশাপাশি আয়াসে-বিলাসে, পোশাক-পরিচ্ছদে, সন্তানদের শিক্ষাঙ্গনের ভিন্নতাও অতিসাধারণ বিষয়। এখনও যদি কোনো একান্নবর্তী পরিবার থেকে থাকে তবে সেখানেও একই চিত্র দেখা যাবে। শ্রেণিবৈষম্য আমাদের সমাজে যেমন বিদ্যমান, একইভাবে যৌথ পরিবারেও সেটা বিলক্ষণ দেখা যায়।
আমার দেখা একটি যৌথ পরিবারের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। আমি তখন কিশোরবয়সি। আমাদের পাশর্^বর্তী একটি পরিবারে অনেকগুলো ভাই-বোন। সাত ভাই, চার বোন এবং তাদের বাবা-মা। ছোট তিনভাই স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। অপর তিন বোন স্কুল-কলেজগামী। যে চার ভাই চাকরি করতেন, তাদের দেখতাম সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিদিন হাতে করে পরিবারের সমস্ত সদস্যর জন্য ফল-মূল, নানা পদের খাবার নিয়ে বাসায় ফিরতেন। পরিমাণেও ছিল যথেষ্ট। অথচ ওই পরিবারের ছেলেরা একে একে বিয়ে করার পর যৌথ ওই সংসারে বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে। চাকরিজীবী চার ভাই কর্মস্থল থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন হাতে করে খাবারের প্যাকেট আনতেন বটে, তবে পরিমাণে এতই নগণ্য যে সে খাবার দু’তিনজনের অতিরিক্ত নয়। অর্থাৎ বিয়ের পর ভাইয়েরা সামষ্টিক ভাবনা থেকে একে একে সরে এসে আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবারে থাকলেও একান্নবর্তী রান্না তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হতো না। তাই উপার্জনকারী ওই চারভাই এবং তাদের স্ত্রীরা দামি মাছ, গরু, খাসি, মুরগির মাংস আলাদাভাবে এনে রান্না করে নিজেদের ঘরে তুলে রাখতো এবং স্বামী-স্ত্রী এবং নিজ সন্তানদের নিয়ে সেই পৃথক রান্না খেতো। এতে পরিবারটির ভেতরে নানা ক্ষোভ-হতাশার কথা শুনতাম কিন্তু সাহস করে এর বিরুদ্ধে কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখিনি। আদর্শিক ওই যৌথ পরিবারটিতে বৈষম্য এতটাই প্রকট হয়ে পড়ে যে, প্রায় এ নিয়ে নানা ক্ষোভের কথা শুনতাম। প্রকৃত গৃহকর্তা পিতা-মাতাও এ নিয়ে মনোকষ্টে ভুগতেন বটে তবে উপার্জনকারী ছেলেদের বৈষম্যপূর্ণ আচার-আচরণ নিয়ে কিছু বলতেন না, নিজেদের অবস্থার কথা বিবেচনা করে হয়তো বলতে সাহসও করতেন না। যে পরিবারটিতে সমষ্টিগত একটি জগৎ তৈরি হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে সেটি একে একে ভেঙে পড়ল। আন্তরিকতা পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। পরিণতিতে পরিবারের মধ্যে পৃথক দুইপক্ষ গড়ে ওঠে। একপক্ষ সুবিধাভোগী, অপরপক্ষ সুবিধাবঞ্চিত। তীব্র টানাপোড়েনের পরও পরিবারটি ভাঙেনি বৃদ্ধ পিতা-মাতার কারণে। পিতার মৃত্যুর পর অধিক উপার্জনকারী ভাইয়েরা পাশের এলাকায় নতুন আবাসে চলে যায়। মা-বোনসহ স্বল্প আয়ের ভাই এবং বেকার ভাই পুরোনো আবাসে থেকে যায়। পূর্বের একান্নবর্তী পরিবারের অর্থনৈতিক জৌলুস ক্রমে ম্লান হয়ে নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে পরিণত হয়। অথচ অবস্থাপন্ন ভাইয়েরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিতরূপে নিজেদের শ্রেণিগত দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। যতদিন ভাইয়েরা বিয়ে করেনি, ততদিন পরিবারটিতে যে-রূপ একতা-সহমর্মিতা, সামষ্টিক আচার দেখেছি, ভাইদের বিয়ের পর থেকে সেই সংস্কৃতিতে ভাটির টান পড়ে। ক্রমেই অর্থনৈতিক কারণে তাদের ভেতরে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। পিতার বর্তমানে সেটা বাহ্যিকভাবে না ভাঙলেও ভেতরে কিন্তু চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
যৌথ পরিবার কখনোই বৈষম্যহীন ছিল না। পরিবারের ভেতরে মন কষাকষি, মনোমালিন্য, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বৈরিতা, বৈষম্য, দুঃখ-হতাশা, অমানবিকতা বিরাজ করত। শ্রেণি বৈষম্যপূর্ণ সমাজের প্রভাবমুক্ত ছিল না যৌথ পরিবারগুলোও। পরিবারের সদস্যরা যতই নিকটবর্তী হোক না কেন, শ্রেণিগত অবস্থান তাদের দূরবর্তী করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। সৃষ্টি করে পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার। এখনকার একক পরিবারগুলোতে সদস্য সংখ্যা তিন-চারজনের অধিক নয়। অথচ পূর্বে প্রতিটি পিতা-মাতার অধিক সন্তানের কারণে একান্নবর্তী পরিবারের পরিসর ছিল বৃহৎ। একটি যৌথ পরিবারে ত্রিশ-চল্লিশজন সদস্য থাকাটাও ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। মানুষের মধ্যে বিশেষ করে উচ্চ এবং মধ্যবিত্তদের সচেতনতার কারণে পরিবারে সন্তানদের সংখ্যা বড় জোর দু’জনের বেশি নয়। তাই একক পরিবারে বৈষম্য দেখা যায় না। তারা কেবল তাদের নিয়েই ভাবে, শ্রেণিগতভাবে নিচু অবস্থানের নিকটজন বা নিকট আত্মীয় পরিজনদের বিষয়ে মোটেও ভাবে না। তাদের হৃদয়জুড়ে কেবলই নিজেদের নিয়েই ভাবনা। অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিকতায় বৃত্তবন্দি থাকা। সমষ্টিগত ভাবনা পরিবার থেকে যেমন বিদায় নিয়েছে, তেমনি সমাজ থেকেও। বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ব্যতীত এই রাহুর কবল থেকে আমাদের পরিত্রাণের কোনোই উপায় নেই।
দলভুক্ত সমাজতন্ত্রী দাবিদার ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রায়শ বলে থাকেন, ‘একান্নবর্তী পরিবার সমাজতন্ত্রেরই অভিন্ন রূপ। একান্নবর্তী পরিবার মাত্রই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবিকল।’ কোন বিবেচনায় তিনি ওই দৃষ্টান্ত তুলে ধরছেন, জানি না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় এতে প্রকাশ পায় তিনি কোন এবং কীরূপ সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখেন!
লেখক : প্রাবন্ধিক ও নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত