সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:২৩ এএম
আমাদের সমাজে
সিন্ডিকেট শব্দটি বহুল প্রচলিত, বিশেষ করে বাজারের ক্ষেত্রে। সিন্ডিকেটের হোতারা অতিমুনাফার
লোভে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে নিজেদের আখের গুছিয়েছে এর নতুন চিত্র
উঠে এসেছে ২৬ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে। জানা গেল, কীভাবে
তিন মাসে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে ২৯ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। আয়-ব্যয়ের
ভারসাম্য এতটাই বেড়েছে যে, জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নিত্য চাহিদায় কাটছাঁট
করেও জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে সংসার চালাচ্ছে
সঞ্চয় ভেঙে। এমন প্রেক্ষাপটেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিমানুফার ছক কষে নিজেদের
ফুলে-ফেঁপে ওঠা অপপ্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের
প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে আরও জানা যায়, ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে টাকার
পরিমাণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পাশাপাশি একই সময়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বা কৃষিকাজের সঙ্গে
সম্পৃক্ত মানুষের ব্যাংক হিসাবে কমে এসেছে টাকার অঙ্ক। পাশাপাশি নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত
কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষের যাপিত জীবন আরও কতটা দুরূহ হয়ে উঠেছে এর চিত্রও কিছুদিন
আগে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। একেবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর
মূল্যস্ফীতির অভিঘাত আরও প্রকটভাবে লেগেছে। একদিকে আয় বৈষম্য, অন্যদিকে স্বেচ্ছাচারীদের
কোনোরকম নিয়ম-নীতি কিংবা আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের আখের গোছানোর পাঁয়তারা সমাজের
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জন্য যে ত্রাহি ত্রাহি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে
সরকারের দায়িত্বশীলদের তরফে অনেক কথা হলেও প্রতিকার কিংবা প্রতিবিধানের দৃষ্টান্তযোগ্য
নজির বিরল।
একেক সময়ে একেকটি
ভোগ্যপণ্য সিন্ডিকেট তাদের কবজায় নিয়ে নিজেদের উদরপূর্তি করছে নানা অজুহাত কিংবা খোঁড়া
যুক্তি দাঁড় করিয়ে। আলু, পেঁয়াজ, ডিম নিয়ে দফায় দফায় তাদের তুঘলকি কাণ্ড দূর-অতীতের
নয়। এই প্রেক্ষাপটে এই পণ্যগুলো ভোক্তা আমদানির ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ সুবিধা দিলেও
এর সুফল প্রকৃত অর্থে ভোগ করতে পারেনি। পেঁয়াজ-আলুর এখন ভর মৌসুম। কয়েক দিন আগে সংবাদমাধ্যমেই
উঠে এসেছে, পেঁয়াজ-আলুর যে মজুদ আছে তাতে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদার নিরিখে কোনো ঘাটতি
থাকার কথা নয়। অথচ এই দুটি ভোগ্যপণ্য নিয়ে কারসাজি শুরু হয় আরও দু’মাস আগে। একদিকে
মজুদ অন্যদিকে আমদানি ও মাঠ থেকে নতুন পেঁয়াজ-আলু ওঠার পরও ফের বাজারে এই দুটি ভোগ্যপণ্য
নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেখছি, উৎপাদক পর্যায় থেকে ভোক্তাপর্যায় পর্যন্ত
দামের বিস্তর ফারাক এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের হোতারা তাদের আখের গোছাচ্ছে নিজেদের
ছকমাফিক! মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফে দৃশ্যত কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর কোনো
সুফল মেলেনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করে দফায় দফায়
যেসব কথা বলেছেন, তার বেশিরভাগই এই অশুভ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের শামিল। কৃষক তার
উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে না, ভোক্তাকে বারবার মূল্যবৃদ্ধির তাপ সইতে হবে আর
সিন্ডিকেটের হোতারা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনতেই থাকবে, এটা তো হতে পারে না।
আমরা দেখছি, যেসব
পণ্য আমদানি করতে হয় না সেসব পণ্যের দামও হুটহাট বেড়ে যায় সিন্ডিকেটের ইশারায়। এই সম্পাদকীয়
স্তম্ভেই আমরা বহুবার প্রশ্ন রেখেছি, সিন্ডিকেটের হোতা কিংবা অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত
আইনের হাতের চেয়েও লম্বা হয় কী করে। বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি নতুন কিছু নয়। বাজার
নিয়ন্ত্রণের নাটাই যে সরকারের হাতে নেই, বরং সিন্ডিকেটই তাদের ইচ্ছামাফিক নাটাই ঘোরায়,
এই বাস্তবতাও দৃশ্যমান হয়েছে দফায় দফায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন এরই বাস্তব প্রতিফলন
বৈ কিছু নয়। দুর্বল বিপণনব্যবস্থা, বাজারের নজরদারি-তদারকি বাড়ানো, অসাধুদের বিরুদ্ধে
আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে বহুবার তাগিদ দিয়েছি। অর্থনীতি
বিশ্লেষক ও বাজার পর্যবেক্ষকদের তরফেও নানারকম সুপারিশ উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক
হলেও সত্য, সিন্ডিকেটের হোতাদের কালো হাতের থাবায় সবই যেন উবে গেছে।
আমরা বাজারে সুশাসন
প্রতিষ্ঠায় পুনর্বার তাগিদ দিই। আমরা স্পষ্টতই মনে করি, আইন এবং সরকারের শক্তির চেয়ে
সিন্ডিকেটের শক্তি কখনও, কোনোভাবেই বড় হতে পারে না। আমরা চাই না, বারবার হাঁসের ডিম
বাগডাসে খেয়ে যাক। আমরা চাই, অচ্ছেদ্য সিন্ডিকেট ভেঙে স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা গড়ে
উঠুক। মধ্যস্বত্বভোগী এবং সিন্ডিকেটের হোতাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হোক বাজার। এভাবে স্বেচ্ছাচারিতা
এবং আইনের প্রতি অতি মুনাফাখোরদের অবজ্ঞা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল সব পক্ষ এ ব্যাপারে কথা বলেছে বিস্তর, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই দৃশ্যমান
হয়নি। আশু এর নিরসন ঘটুক।