× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্রচিন্তা

জাগরণ ঘটুক আদর্শিক চেতনার

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:২১ এএম

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই সহিংসতা বাড়ছে, সংবাদমাধ্যমের এমন বারবার শিরোনামে চোখ আটকে যাচ্ছে। চলমান আন্দোলনে ঢাকাসহ নানা স্থানে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। সম্প্রতি মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটিও দুবার নাশকতার কবলে পড়েছে। দুর্ঘটনায় ও আগুনে পুড়ে প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপিসহ কয়েকটি দলের ডাকা হরতাল-অবরোধের খবরও পাওয়া গেলেও মাঠে তাদের উপস্থিতি নেই। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণার বাইরে তাদের কর্মকাণ্ড তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ যত এগিয়ে আসছে, দিনটি ঘিরে সংঘাত-সহিংস পরিস্থিতি আরও তীব্র হবে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনে ইসি বদ্ধপরিকর। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসির সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত এবং ভোট দেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা অবশ্যই তাদের মূল চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। মানুষ যেন তার ভোট নিজে দিতে পারে তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করে তোলা সম্ভব।

আমরা দেখছি, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকটে রাজনৈতিক অঙ্গন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে উঠেছে। একটি অংশ ভোট বর্জন করেছে এবং নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য তারা নানাবিধ অপকৌশলের আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটদানের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশলের সিংহভাগ জুড়েই থাকবে ভোটারদের কেন্দ্রে আসা থেকে শুরু করে ভোটদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রক্রিয়া। অবশ্য বিরোধী দল ও সমমনারা এমন রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেবে কি না বলা কঠিন। তবে নির্বাচনে ভোটারের অংশগ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরির আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধু বিরোধী দলই নয়, যারা নির্বাচনে জনসমর্থনের ভিত্তিতে বিজয়ী হতে পারবেন না বা যাদের মনে হবে তারা পরাজিত হতে চলেছেন, তারাও নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে পারেন। অর্থাৎ নির্বাচনের দিন শুধু বিরোধী দলই পরিবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বিষয়টি এমন নয়। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমনটি নতুন কিছু নয়। অতীতেও ঘটেছে।

সুষ্ঠ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গোয়েন্দা তৎপরতার বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ইউনিট নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই নির্বাচনের যে কদিন বাকি রয়েছে এবং নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি কেমন হতে পারে এ বিষয়ে তাদের কিছু বাড়তি ধারণা থাকে। এ ধারণার ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো মহল স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করবে। এই তৃতীয় পক্ষ সম্পর্কে সরকার যথেষ্ট সচেতন। এ সংকট নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে সামলাবে এবং কতটা সামলাতে পারবে তার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়টি। গত দুটি সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে নানা মহলে সমালোচনা রয়েছে। ফলে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে সরকার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে এক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন দ্রুত গুজব ছড়ানো সম্ভব। কোনো মহল যদি গুজব ছড়ায় তাহলে ভুল বার্তা সরিয়ে ফেলা এবং তা ভুল প্রমাণ করাও সময়সাপেক্ষ। অর্থাৎ নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চাইলে নানাভাবে করা সম্ভব। নির্বাচনের আগে আমরা শুধু কিছু অনুমান করতে এবং এ বিষয়ে সতর্ক নজরদারির তাগাদা দিতে পারি। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তার ভিত্তিতে তাদের নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসার মাধ্যমেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব। ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ইসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরাও তাদের সমর্থকদের কেন্দ্রে আনার বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রচারের আশ্রয় নেবে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে হরতাল-অবরোধের ঘটনা কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না।

যদিও ২৮ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত সংঘাত-সহিংসতা এবং আগুনসন্ত্রাসের মতো নাশকতা চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্কতা ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারেনি। কিন্তু তার মানে এই নয়, আগামীতে এ ধরনের সংঘাত-সহিংসতা বাড়বে না। তাই জননিরাপত্তা শঙ্কায় নেই, এ কথা বলা যায় না। অদ্ভুত এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ অস্বস্তিও এক ধরনের রাজনৈতিক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতার বিষয়ে আগ বাড়িয়ে অমূলক কথা বললে তা নতুন সংকট সৃষ্টি করে। এ সংকট দেশ-জাতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে না। বরং সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য যা করা প্রয়োজন সেদিকে নজর গভীর করাই বরং জরুরি।

যেকোনো নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশার পারদ সঙ্গত কারণেই বেশি থাকে। ইতোপূর্বে এই স্তম্ভেই লিখেছি, দেশে পশ্চিমা কাঠামোর যে নির্বাচনপদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এও লিখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই আইডেন্টিটি পলিটিক্স করতে শুরু করেছে। সমস্যা হলো, বিরোধী আইডেন্টিটি যেকোনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্মতি পোষণ করার গণতান্ত্রিক মনোভাব রাখে না। রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে এমনটিও দেখা যায় না। জাতীয় ইস্যুতেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন চোখে পড়ে। আমরা দেখছি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পর্ব, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্টসহ নানা রাজনৈতিক প্রসঙ্গে কিছু দল দ্বিমত পোষণ করে। আর মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত থাকায় পারস্পরিক আস্থা গড়ে উঠছে না।

পশ্চিমা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির নির্বাচনের ন্যূনতম শর্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে আস্থার সংকট নিরসনে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিরা প্রায়ই নানা মন্তব্য করেন। কিন্তু তারা বিবাদ নিরসনে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। একটি বিষয়ে পরিষ্কার থাকতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বিদেশিরা ঠিক করে দিয়েছে, এমন নজির নেই। যেটুকু গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি, তা এখানকার মানুষের লড়াই-সংগ্রামের ফল। ভাষা আন্দোলন থেকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের আন্দোলনের ফল। যারা রাজনীতি করছেন, তাদের উচিত জনগণের ওপর ভরসা রাখা। এখান নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। এই পথ রুদ্ধ করতে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। টাকার প্রবাহ বন্ধ হলে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে।

এব সংকট নিরসনে বড় ধরনের সংস্কার আনা জরুরি। দেশ-জাতির স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের উদাহরণযোগ্য কাঠামো যাচাই করে এ সংস্কার করতে হবে। রাজনীতিতে যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা যেন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, এমন গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথও মসৃণ করা জরুরি। রাজনীতি যদি ঠিক পথে না চলে তাহলে সব শুভ প্রত্যাশাই হোঁচট খাবে। তাই অনুশীলনের মাধ্যমে রাজনীতি পরিশীলিত করার অব্যাহত প্রয়াস চালাতে হবে রাজনীতিকদেরই। স্বাধীনতা অর্জনের আগে তো বটেই, স্বাধীন দেশেও রাজনীতি সুপথেই ছিল, কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে রাজনৈতিক আদর্শিক চেতনার মূলে অপঘাত করা হয় এবং রাজনীতি বিপথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, এ থেকেই পতনের শুরু। আমাদের রাজনীতিকদের অতীতের দিকে তাকিয়ে শুদ্ধাচারের পথ তাদেরই সুগম করতে হবে। সহিংসতা গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা নয়, হতে পারে না।

  • রাজনীতি ও কূটনীতি-বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা