ফিলিস্তিন সংকট
ইউসুফ জাজিলি
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:০৪ এএম
২০০৯ সালে গাজায়
অপারেশন কাস্ট লিডের খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। ফিলিস্তিন-মিসর সীমান্তের আল আরিস
নামক সংযোগস্থলের এক তাঁবুতে আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। তখনও সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সম্প্রচারের চল শুরু হয়নি। যদিও আমাদের ভুলে
গেলে চলবে না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নির্ভরযোগ্য
তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পেশাদার সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। খবর সংগ্রহ সাংবাদিকদের
পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু সাংবাদিকরাই এখন খবরে পরিণত হচ্ছেন। সম্প্রতি গাজা, লেবানন
ও ইসরায়েলে সংঘাত-সহিংসতার মুখে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক সাংবাদিক। তিন দশক ধরেই আন্তর্জাতিক
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে অনেক সাংবাদিক ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের তথ্য সংগ্রহের
কাজে নিযুক্ত। কিন্তু এবারই সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বপালনের পথ এতটা কণ্টকাকীর্ণ
বলে মনে হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস
ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যানুসারে, এবারে সাংবাদিকদের নিশানা করে হত্যা
করা হচ্ছে। গাজায় মানবিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংবাদিকতার পথে প্রতিবন্ধকতাও।
সাংবাদিকরা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের প্রাথমিক খসড়া তাদের হাতেই লেখা হয়। গাজায় স্বাধীন
সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ গোটা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে গাজার সাংবাদিকদের
গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জেনেভা কনভেনশনের গুরুত্বও বিবেচনা
করতে হবে। জেনেভা কনভেনশন যেকোনো সামরিক যুদ্ধজনিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের
নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দিচ্ছে, সাংবাদিকদের
প্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা ভেবেই যেন আক্রমণ করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল
সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গাজায় মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। নির্বিচার বোমা হামলার
ফলে অন্তত ১২ সাংবাদিক নিহত
হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ। নিহত সাংবাদিকদের সবাই চলমান যুদ্ধের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য
তথ্য জানাচ্ছিলেন। ইসরায়েলের নির্বিচার আক্রমণের ফলে যে মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি
হয়েছে সে বিষয়ে গোটা বিশ্ব জানতে পারছিল এই সাংবাদিকদের মাধ্যমেই। ১৫ ডিসেম্বর গাজায় সাংবাদিকদের
মৃত্যুর সংবাদের প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের পাঁচ সদস্য প্রেসিডেন্ট
জো বাইডেনকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগাদা দিয়ে চিঠি লিখেছেন। ওই চিঠিতে
বলা হয়েছে, ‘গাজায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তার
অভাব আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ঘাটতি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে
নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের পথেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।’ এমনকি গাজায় প্রতিবেদন
লেখার সময় মিসরীয়দের নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ারও তাগাদা দিয়েছেন তারা।
২০০৯ সালে যখন
আমি গাজায় সংবাদ সংগ্রহ করতে যাই তখন মিসরীয় প্রশাসন আমাকে টেপরেকর্ডার আর নোটবুক নিয়ে
প্রবেশ করতে দেয়নি। দুতাবাসের অনুমোদন ছাড়া সাংবাদিকদের একচুল নড়ারও ক্ষমতা দেওয়া হয়
না। বিষয়টি অদ্ভুত অবশ্যই। গাজার তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি তখন উদ্গ্রীব। আল মাসা পত্রিকার
সম্পাদক অর্থাৎ আমার নিয়োগকর্তা লিখে দিয়েছেন, তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাকে গাজায় প্রবেশ
করতে হবে। কিন্তু সেবার মিসরীয় প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমাকে সিনাই মরুভূমিতে
আট ঘণ্টার বাস ভ্রমণ করতে হয়েছিল। বাসে চেপে আমি কায়রোয় মরক্কো দূতাবাসে পৌঁছাই। সেখান
থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করি। মরক্কোর কনস্যুলার এ সময় আমাকে অদ্ভুত একটি অনুরোধ
জানান। তিনি বলেন, ‘এ কাগজটিতে স্বাক্ষর করুন। তথ্য সংগ্রহের কাজে আপনার কোনো ক্ষতি
হলে কিংবা আপনি মারা গেলে মরক্কো প্রশাসন এর কোনো দায় বহন করবে না।’ তথ্য সংগ্রহের
উৎসাহ থাকায় দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই স্বাক্ষর করি। তবে পরে আমারও মনে নানা প্রশ্ন
দেখা দিতে শুরু করে। আমারই দেশ আমার কোনো ক্ষতি হলে দায় নেবে না, এমনটি কী করে হয়!
গাজায় সাংবাদিক হত্যার বিষয়টি এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য কারও দায়বদ্ধতাও
নেই।
সাংবাদিকদেরও
নিজস্ব সংগ্রাম ও প্রতিকূলতা রয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তারা নিজ দেশে স্বজনদের
হারানোর সংবাদ পাচ্ছেন। একবার শেষ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। ওয়ায়েল দাহদুর কথা ভুলে
গেছেন কি? আলজাজিরার এই প্রতিনিধি গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের হামলার খবরের প্রতিবেদন পাঠাতে
ব্যস্ত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে নিজ পরিবারের সদস্যদের হত্যার মর্মন্তুদ সংবাদ পেয়েও
পেশাগত দায়িত্ব থেকে একচুল নড়েননি। মধ্যপ্রাচ্যে দাহদুকে গাজার প্রতিনিধি ধরা হয়। গাজায়
কোথাও আগুন লাগলে তখনই আলজাজিরার প্রতিবেদক বলবেন, ‘অ্যান্ড নাউ টু ওয়ায়েল দাহদু’।
আরব অঞ্চলের বাসিন্দারা বুঝতে পারেন গাজায় ফের মর্মন্তুদ কোনো ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি
দাহদু গুরুতর আহত হয়েছেন। আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও ব্যান্ডেজ হাতেই তিনি প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন।
দাহদুর সঙ্গেও
আমার পরিচয় ২০০৯ সালে। তখন সে টগবগে তরুণ। সত্য প্রকাশে তার দৃপ্ত কণ্ঠস্বর সদা জাগরূক।
গাজার আল আয়াম সংবাদপত্রের সাংবাদিক মুহাম্মদ ইসা সাদাল্লাহ আমাকে দাহদুর সঙ্গে পরিচয়
করিয়ে দিয়েছিলেন। ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি সোচ্চার এক সাংবাদিক। চলমান
ফিলিস্তিন সংকটে সাদাল্লাহ নিরাপদ আছেন কি না জানা নেই। এখনও কোনো খবর পাইনি।
গত বছর ফিলিস্তিনি
বংশোদ্ভূত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ পশ্চিম উপত্যকার জেনিন নগরে প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহকালে
নিহত হওয়ার ঘটনায় গোটা বিশ্ব হতবাক হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেছিলেন,
‘কঠিন এই সময়ে আমাকে মনের ভেতর জমে থাকা দুরন্ত ভয়টাকে বাগে আনতে হয়েছে। সাংবাদিকতা
পেশায় এসেছি সত্য প্রকাশের জন্য। আমার পক্ষে বাস্তবতা বদলে ফেলা সহজ না। কিন্তু নিজের
সর্বস্ব দিয়েই আমি চেষ্টা করেছি পৃথিবীতে সত্য তুলে ধরার।’ ২০২২ সালের মে মাসে ইসরায়েলের
প্রতিরক্ষা বাহিনীর তরফে দুঃখপ্রকাশ করে জানানো হয়, শিরিনকে ভুলবশত কোনো ইসরায়েলি সেনা
গুলি করে থাকতে পারে। ওই সময় আইডিএফের মুখ্য প্রতিনিধি ড্যানিয়েল হাগারি জানিয়েছিলেন,
‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। এ সময় সাংবাদিকরা যেন নিরাপদ থাকেন তার
সর্বোচ্চ চেষ্টাই আমরা করছি।’ বিদ্যমান বাস্তবতায় এ সবই ফাঁকা বুলিমাত্র। প্রতিদিনই
গাজায় সাংবাদিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং এসব ঘটনায় আইডিএফের তরফে দায় নেওয়ার
কোনো তাগাদাই যেন নেই। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে যুদ্ধের ময়দানের তথ্য সরবরাহ করবে
কে?
লস অ্যাঞ্জেলেস
টাইমস থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন