সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৩৬ এএম
আমাদের অভিজ্ঞতায়
আছে, নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে সমাজবিরোধীরা নানাভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বাদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। দেশে মাদক বাণিজ্যের জাল পাতা রয়েছে
আরও অনেক আগে থেকেই। উদ্বেগের বিষয় হলো, এ জাল ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। এরই ফের সাক্ষ্য
মিলেছে ২৩ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে জানা যায়,
মাদক কারবারি চক্র দেশে-বিদেশে নানা কৌশল অবলম্বনে তা আরও বিস্তৃত করছে। কক্সবাজার-টেকনাফ
অঞ্চল দিয়ে মিয়ানমার থেকে বিশেষ করে ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল জাতীয় মাদক দেশে অনুপ্রবেশ
ঘটে এ বার্তা পুরোনো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শুধু মাদকই আসছে না, দেশে বিরাজমান ডলার
সংকটকালে মাদকের বিনিময়ে ডলারও পাচার হয়ে যাচ্ছে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, কক্সবাজার-টেকনাফ
অঞ্চলে নির্ধারিত এজেন্টের মাধ্যমে মাদক বিক্রি ও অর্থ সংগ্রহ করে জমানো হয় ব্যবসায়ীদের
কাছে। ওই ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বিক্রয় কর্মীর মাধ্যমে তা পাঠান টেকনাফের সংঘবদ্ধ হুন্ডি
কারবারিদের কাছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, হুন্ডি কারবারিরা টেকনাফের কয়েকটি ব্যাংকের
মাধ্যমে টাকা চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠিয়ে দেন, যা ডলারে রূপান্তরিত
হয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ঘুরে পৌঁছে যায় মিয়ানমারে অবস্থানরত মাদক ডিলারদের কাছে।
২২ ডিসেম্বর ভোরে
টেকনাফের রঙ্গিখালী গহিন পাহাড়ে র্যাব সদস্যরা অভিযান চালান। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা,
আইস, অস্ত্রসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেন তারা। র্যাবের ভাষ্য, আটক দুজন মিয়ানমারের
নাগরিক হলেও তারা বসবাস করেন বাংলাদেশে এবং তারাই এ অঞ্চলের মাদক চোরাকারবারির অন্যতম
হোতা নবী হোসেনের সহযোগী। এর আগে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, কক্সবাজার-টেকনাফ
অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক শুধু বিস্তৃতই নয়, তারা স্থানীয় ক্ষমতাবান কতিপয়ের
পৃষ্ঠপোষকতাও পাচ্ছে নানাভাবে। দেশের নানাবিধ সমস্যার মধ্যে মাদকের আগ্রাসন অন্যতম
এবং এর ভয়াবহতা কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এরই ফের সাক্ষ্য মিলেছে ২২ ডিসেম্বর
টেকনাফের গহিন জঙ্গলে অভিযানের মধ্য দিয়ে। নিয়ন্ত্রণহীন মাদক বাণিজ্যের হিংস্র থাবা
দেশজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। মাদকের দংশনে তারুণ্য, মেধা, বিবেক, মূল্যবোধ, নৈতিকতা
সবকিছু ধ্বংস করে সমাজে অবক্ষয়ের ছায়া ক্রমেই প্রলম্বিত করছে। পরিবার ছাপিয়ে সমাজের
সংক্ষিপ্ত পরিসর ডিঙিয়ে এখন যেন এ সর্বনাশা ছায়া পড়েছে আরও বৃহৎ পরিসরে।
আমরা স্পষ্টতই
মনে করি, মাদকের সর্বনাশা থাবা থেকে প্রজন্মকে রক্ষাকল্পে লাগাতার অভিযানের কর্মসূচি
অন্তর্ভুক্ত করে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দরকার। মাদকের আগ্রাসন ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে
পরিণত হয়েছে এবং বিদ্যমান বাস্তবতা এও সাক্ষ্য দেয়, কোনো টোটকা দাওয়াইয়ে এ ব্যাধি সারানো
কঠিন। এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা ইতঃপূর্বে এও বলেছি, মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে একেবারে
গভীর উৎসে নজর দেওয়ার পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জরুরি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শর্ষের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভূতের মূলোৎপাটন।
আরও জরুরি সীমান্তে নজরদারি কঠোর করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগে মনোযোগ
বাড়ানো। মাদকের আগ্রাসনে মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত সামাজিক অপরাধও ক্রমেই বাড়ছে। আমরা
উদ্বেগের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমেই লক্ষ করেছি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত মাদকের
অপচ্ছায়া পড়েছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের পাশাপাশি সচেতন মহলের জানা আছে, মাদকের
প্রধান উৎস সীমান্তের বাইরে। আমাদের সীমান্তের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভারত ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে
মিয়ানমার। এ প্রেক্ষাপটে সীমান্তে নজরদারির বিষয়টি সঙ্গত কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মিয়ানমার
নয়, ভারত থেকেও মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে। এর আগ্রাসন কিংবা ছোবল থেকে সমাজ ও প্রজন্মের
সুরক্ষা নিশ্চিতে সর্বাগ্রে মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। দেশি-বিদেশি
গডফাদারদের চিহ্নিত করে অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিদেশে কূটনৈতিকভাবে
এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর
জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার তো বটেই, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়েও কার্যক্রম চালাতে হবে।
এক কথায়, সব দিকে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধমূলক বেষ্টনী। মাদক মামলার সংখ্যা বহুগুণে
বাড়লেও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের সংখ্যা সে অনুপাতে বাড়েনি। প্রকৃত সমস্যা সমাধানে
দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি অসাংবিধানিক বা আইনবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপ
যাতে না নেওয়া হয়, সেদিকেও দৃষ্টি গভীর করা বাঞ্ছনীয়।