রাষ্ট্রক্ষমতা
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৪০ এএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
ক্ষমতা, ক্ষমতার শত্রুমিত্র দুই-ই হতে পারে এমন নজিরের অভাব নেই দেশে-বিদেশে। বিশেষ করে যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের ক্ষমতার তাপে বেসামাল হয়ে পড়ার নজির উন্নত-অনুন্নত-উন্নয়নশীল অনেক দেশেই আছে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এমনটি আর কোথাও এত কদর্যভাবে দৃশ্যমান কি নাÑএ প্রশ্নে বিতর্কের খুব একটা অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। আমাদের অনেক মন্ত্রী-এমপি তো বটেই এমনকি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘চুনোপুঁটি’রাও ক্ষমতার তাপে বেসামাল হয়ে পড়েন। তাদের আচার-আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ নানা ক্ষেত্রেই দেখা যায়। অভিজ্ঞতায় আছে, এমন অনেককে নিয়ে সরকার কিংবা দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

১৭ ডিসেম্বর কৃষিমন্ত্রী
ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে এক রাতেই তাদের সব নেতার মুক্তির
প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তারা রাজি হয়নি।’ তার এই কথার পার্শ্বকথা আরও আছে। যত দূর জানি,
ড. আব্দুর রাজ্জাক একজন সজ্জন এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার মান্য করেই চলেন। কিন্তু তিনিও
জিহ্বার শাসন করতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত। তার এ মন্তব্যে সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক
অঙ্গনে যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, এর ব্যাখ্যা একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। নিশ্চয়ই কৃষিমন্ত্রীর
এমন বক্তব্য তার এখতিয়ারবহির্ভূত এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কোন দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে
তিনি এমন ‘অনাচারী’ ব্ক্তব্য রাখলেন তা জিজ্ঞাস্য হতেই পারে। ১৮ ডিসেম্বর সংবাদমাধ্যমে
জানা গেল, অনেক সাংবাদিকই তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে ফোন করলে তিনি তো বটেই,
একই সঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও ফোন গ্রহণ করেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি বিরোধী
রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা তাদের জামিন
পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়গুলো সরকারের ইচ্ছায় সম্পন্ন হয়? তিনি এমন বক্তব্য দিয়ে নিজে তো
প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেনই, দল এবং সরকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। একই সঙ্গে আদালতকেও দাঁড়
করিয়েছেন প্রশ্নের মুখোমুখি।
অভিযুক্তকে অভিযোগের
প্রমাণ সাপেক্ষে মামলায় দণ্ড দেওয়া কিংবা মুক্তিদানের বিষয়গুলো আদালতের এখতিয়ার। তবে
মহামান্য রাষ্ট্রপতি দণ্ডিত যেকোনো ব্যক্তির সাজা মওকুফের এখতিয়ার রাখেন সংবিধান অনুসারে।
যে বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন, এ বিষয়টি আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। ১৭
ডিসেম্বর একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের
বক্তব্যের সিংহভাগই নেতিবাচকভাবে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। একজন মন্ত্রী কোনোভাবেই আইনের
শাসন কিংবা ন্যায়বিচারের পথ কণ্টকাকীর্ণ হয় এমন কোনো কাজ করতে পারেন না। সরকার কিংবা
প্রশাসন যে-কাউকে ইচ্ছা করলেই মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার কিংবা হেনস্থারও অধিকার রাখে
না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অসংখ্য
ঘটেছে। নিঃসন্দেহে এমনটি সুশাসনের অন্তরায়, একই সঙ্গে সংবিধান-প্রদত্ত অধিকারের পথ
রুদ্ধ করা বই কিছু নয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট
নিয়ে যখন দেশে-বিদেশের নানা মহল থেকে আলোচনার তীর চরদিকে ছুটছে, এমনকি কোনো কোনো বহিঃরাষ্ট্রের
সরকারও আমাদের বিদ্যমান সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে শুধু বক্তব্যই নয়, স্বার্থের প্রতিকূলে
পদক্ষেপও নিচ্ছে, তখন কৃষিমন্ত্রীর এমন বক্তব্য যেন আগুনে ঘি ঢালার শামিল।
আমাদের স্মরণে
আছে, পাট মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে বেফাঁস মন্তব্যের জন্য মন্ত্রিপরিষদ থেকে বিদায়
নিতে হয়েছিল। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকেও একই কারণে চলে যেতে হয়েছিল মন্ত্রিপরিষদের
পাশাপাশি দল থেকে পদ খুইয়ে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান মূল্যস্ফীতির চাপে জনজীবন ব্যতিব্যস্ত
এবং দফায় দফায় নিত্যপণ্য নিয়ে কারসাজির ফলে বহুল আলোচিত সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গ যখন নানা
মহলে আলোচনায়, তখনও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যর্থতার পাশাপাশি
বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার পরও উল্টো বেফাঁস মন্তব্য করেছেন! এমনটি শুধু সিন্ডিকেটের
কাছে আত্মসমর্পণই নয়, তার দায়িত্ববোধের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। অনেকেরই হয়তো এও স্মরণে
আছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন গত বছর কুড়িগ্রামে জাতীয় শোক দিবসের
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কায়মনোবাক্যে দোয়া করব বঙ্গবন্ধুকে যেন
আল্লাহ জাহান্নামের ভালো জায়গায় স্থান করে দেয়।’ সম্প্রতি তিনি চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ
থেকে টাকা নিয়ে তা ঢাকার মিন্টো রোডের ডিবি অফিসে ফেরত দিয়ে এবং ক্ষমতার জোরে দখলবাজির
কারণে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ সংবাদ শিরোনাম হন। তার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ ও সমাজমাধ্যমে ঝড়
তুললে প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যকে ‘স্লিপ অব ট্যাঙ’ বলে মন্তব্য করেন। স্থানীয় সরকার,
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও
বেফাঁস মন্তব্য করে সমালোচিত হন। এমন ‘স্লিপ অব ট্যাঙ’ অনেকেরই অনেকবার হয়েছে, তার
পরও বেসামাল মন্ত্রীরা স্বীয় জিহ্বার শাসন দৃশ্যমান করতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াত জোট
সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ঢাকার রামপুরায় ছিনতাইকারীদের গুলিতে
নিহত শিশু নওশীনের শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর
মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।’ তার মন্তব্যও ব্যাপক সমালোচনার খোরাক জুগিয়েছিল। বিএনপি সরকারের
প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাসা থেকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইমদাদুল হক ইমদুকে অস্ত্রসহ
গ্রেপ্তারের ঘৃন্য ঘটনাটিও হয়তো অনেকেই বিস্তৃত হননি। দুর্ধর্ষ ডন হিসেবে কুখ্যাত ইমদুকে
গ্রেপ্তারের পর প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমও বিস্ময়কর এবং আপত্তিজনক মন্তব্য করেছিলেন।
এমন বেফাঁস মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে কেউ কেউ এসবই মন্ত্রীদের
নিজস্ব বক্তব্য বলে দায় শেষ করেন।
প্রায় প্রতিটি
রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই কোনো কোনো মন্ত্রীর দফায় দফায় এমন ‘অমিয় বাণী’ আমরা শুনেছি,
যা কোনো পক্ষের জন্যই শেষ পর্যন্ত হিতকর হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ইতিহাস
থেকে শিক্ষা নেওয়ার শিক্ষা আমাদের অনেকেরই নেই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ধারাবাহিক তিন
মেয়াদের সরকারের অর্জনের তালিকা কম দীর্ঘ নয়। উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ বিশ্বদরবারে নতুনভাবে
উপস্থাপিত ৫২ বছরের বাংলাদেশ এরই নজির। কিন্তু সরকারের এ অর্জনের বিসর্জন কোনো কোনো
ক্ষেত্রে ঘটেছে কিছু মন্ত্রী-এমপি ও ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতাকর্মীর স্বেচ্ছাচারিতায়
কিংবা অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে। আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার
মন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মী এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংযত থেকে কথাবার্তা
বলার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার তাপে অনেকেই তা বিস্মৃত
হয়ে গেছেন। যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজব্যবস্থায় আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নাগরিকসমাজের
সঙ্গত প্রত্যাশা। একই সঙ্গে এও সত্য, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কিংবা দায়িত্বশীলদের স্বীয় জিহ্বার
শাসনও জরুরি।
আমাদের সমাজে
এমন অনেক নজির আছে, জিহ্বার শাসন নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক অঘটন ঘটেছে এবং কোনো কোনো
ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপটে অপশাসনের নজিরও স্থাপিত হয়। বেফাঁস কথাবার্তা বলা মন্ত্রী-এমপি-রাজনৈতিক
নেতার তালিকা ছোট নয়, বরং বলা ভালো হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী
লাগামহীন ও বিবেচনাহীন কথাবার্তার কারণে নেতিবাচক অর্থে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। এ তালিকায়
আছেন অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তাও। মন্ত্রী উবাচ কিংবা তাদের অনেকেরই চলাফেরায়, কাজে-কর্মে
ভুল হলে এর যে কী মাশুল দিতে হয়, এ নজিরও তো কম নেই। অতএব সাধু সাবধান!
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা, এ খবরও সংবাদমাধমেই উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে যারা বেফাঁস মন্তব্য করে দল ও সরকার থেকে ছিটকে পড়েছেন, তাদের পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে বহুবার দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। তার পরও তাদের অনেকেরই অতিকথনের কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতির নিরসন ঘটেনি। মন্ত্রীদের বচনবিধি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। এক মন্ত্রী অন্য মন্ত্রণালয় নিয়ে কেনইবা কথা বলবেন? পাশাপাশি অযাচিত কথা বলতে গিয়ে তাদের অনেকেই যা বলে ফেলেন তাও যেমন হাস্যকর, অস্বস্তিকর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের শাসনের মূলে কুঠারাঘাত। কোনো কোনো মন্ত্রীর অতিকথনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রবাদটিই স্মরণে আসে, ‘কথা বললে মূর্খ হয়, শুনলে জ্ঞানী হয়।’ রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোয় ভবিষ্যতে যাদের সংযুক্তি ঘটবে তারা যেন যোগ্য হন এবং যেখানে যার বসার কথা সেখানে যেন তিনিই বসেন। রাজনীতিতে তো বটেই, সরকার পরিচালনা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এমনকি সমাজের বিভিন্ন স্তরেও জিহ্বার শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। ক্ষমতার তাপ যেন সব ভুলিয়ে না দেয়।