বিজয়ের মাস
সৈয়দ হাবিব
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:০৬ এএম
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪২ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ফুসফুসে ক্যানসার,
৯ মাস ধরে কেমোথেরাপি নিচ্ছি। আমার নাতি ক্লাস সেভেনে পড়ে। একদিন সে আমাকে হঠাৎ প্রশ্ন
করে, ‘দাদা, একাত্তরে তুমি কী করছিলে?’ প্রশ্ন শুনে স্মৃতিকাতর হই। উত্তাল দিনগুলোর
কথা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি নিজের অজান্তে। তখন আমার বয়স তেরো। টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ি। পঁচিশে মার্চ ডিস্ট্রিক্ট টাউন গেটে একজন
বাঙালি আর্মি অফিসার পথ আটকে বলে, ‘এই খোকা কোথায় যাচ্ছ? তাড়াতাড়ি বাসায় যাও। যেকোনো
সময় পাকিস্তানি আর্মি চলে আসবে।’
বাসায় ফেরার পর
মা গোছগাছের জন্য তাড়া দেন। পাকিস্তানি আর্মির ভয়ে অনেকেই গ্রামে পালিয়ে যাচ্ছে। সাতাশ
তারিখ শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। বিপদের আশঙ্কায় আমরা চলে আসি দাদাবাড়ি মির্জাপুরের
বানিয়ারা গ্রামে। সেখানে তিন মাস কাটে। ততদিনে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমার
মন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। বন্ধু বেলালকে যুদ্ধে যেতে রাজি করাই।এক ভোরে বাড়ি
থেকে পাঁচশ সত্তর টাকা চুরি করে দুই বন্ধু ঢাকার দিকে রওনা দিই। এরপর ঢাকা থেকে ট্রেনে
চেপে জামালপুর। পরদিন সকালে বেলাল পালিয়ে গেলে ফিরে আসি ঢাকায়। বাসে উঠে বিক্ষিপ্ত
ঘোরার সময় দুজন পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাসে ওঠে। তারা আমাকেসহ পাঁচজনকে বাস থেকে
নামিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পাড়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গীরা বলছিল, আমাদের মেরে ফেলবে।
কিন্তু তাঁবু থেকে ওদের একজন অফিসার বেরিয়ে এসে আমাদের আবার বাসে উঠতে বলে। চলতে চলতে
বাস একটি গ্রামের বাজারের কাছে থামে। আমি নেমেই কান্না শুরু করি। এক হৃদয়বান দোকানদার
আমাকে সান্ত্বনা দেন। লোকটিকে তারপরও আমি মিথ্যা পরিচয় দিই।
কারণ আমাকে ভারতে পৌঁছতে হবে- সে যে উপায়েই হোক।
লোকটি জানায় আমাকে আলগি বাজার দিয়ে ভারতে নিয়ে যেতে পারবেন। তার মাধ্যমেই বাজারের কমান্ডারের
সঙ্গে পরিচয়। পরের দিন নৌকায় যাত্রা শুরুর পর আরেকজনের সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি আমাকে
আসাম নিয়ে যেতে পারবেন জানান। দুদিন পর মোহনপুরে এসে এক হোটেলে আশ্রয় পাই। রাতে একটু
তন্দ্রামতো আসছিল। তখন দোকানের টিনে টোকার শব্দে ঘুম ভাঙে। পুলিশের লোক এসে আমাকে নিয়ে
যায় থানায়। জানায়, ‘জয় বাংলার’ লোক এলে এভাবেই তলব করা হয়। ওরা আমার হাতে কার্ড দিয়ে
পাশের বিল্ডিংয়ে পাঠায়। সেখানে একজন ৫ কেজি চাল, দুই কেজি ডাল আমার হাতে ধরিয়ে দেয়।
নিয়ে যাওয়া হয় রেডক্রসের তাঁবুতে। সেখানে ডাক্তার সাহেব বুঝতে পারেন আমি টাঙ্গাইলের।
তিনি আমার ব্যাপারে খোঁজখবর নেন।
আমার ফুফা আমজাদ
হোসেন, পাকুটিয়ার স্থানীয় ডাক্তার। তার কথা ডাক্তারকে বলতেই উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাতে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং এসডিও সাহেব এসে আড্ডা বসালেন, তারা সবাই অবাক, আমি
একা একা কীভাবে এসেছি। পরদিন ডাক্তারের সঙ্গে আবার ক্যাম্পে যাই। আমার নতুন চাকরিÑ
রোগী এলে তাদের নাম লেখা। এইভাবে প্রায় তিন মাস কেটে যায়। কিন্তু আমার মন ছটফট করছে
কীভাবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করব। ডাক্তার সাহেবকে বলি, আমি যুদ্ধে যাব। উনি বলেন, এটাও
তো একরকম যুদ্ধ। তুমি যা করছ, তা যুদ্ধেরই শামিল। বললাম, ‘না, আমি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ
করব।’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাক্তার সাহেব আমাকে যেতে দেন। ক্যাম্পে যাই, কিন্তু আমাকে
নেবে না। বয়স কম। মাত্র ১৩ বছর। অনেক কান্নাকাটি করেও কারও মন গলাতে পারলাম না। পাশেই
ছিলেন রিক্রুটিং অফিসার আওয়ামী লীগ নেতা আমির আলী। তিনি জানান আমি যেন জানুয়ারিতে
যাই। তখন নতুন রিক্রুট হবে। কী আর করা! যেহেতু স্কাউট ছিলাম, তাই সবাইকে লেফট রাইট,
লেফট রাইট শেখাতাম। এভাবেই ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ এসে গেল। দেশ স্বাধীন হলো। আমার আর
অস্ত্র ধরা হলো না।
আমির আলী আমাকে
পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। উনার সঙ্গে উনার গ্রামের বাড়ি গোলাপগঞ্জ থানার ভাদেশ্বর
গ্রামে চলে আসি। মার্চের দিকে উনি নিজে আমাকে নিয়ে টাঙ্গাইল এসে মায়ের হাতে দিয়ে
যান। মায়ের সে-কী কান্না! সবাই ভেবেছিল, আমি মারা গেছি। আমি যে বেঁচে আছি, এটা একটি
আশ্চর্য ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যাকে রাজাকার হিসেবে চিনতাম তার হাতেই দেখি মুক্তিযোদ্ধা
সার্টিফিকেট। এটা দেখে সার্টিফিকেটের প্রতি আমার একটা বিতৃষ্ণা আসে। সার্টিফিকেট নিইনি।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন।