অরূপ রতন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:২৬ পিএম
অরূপ রতন চৌধুরী
‘স্বাধীন বাংলা
বেতার কেন্দ্র’ মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একটি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষ
থেকে মুক্তিযোদ্ধারা অধীর আগ্রহ নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান, সংবাদের
জন্য অপেক্ষায় থাকতেন। সূচনা সংগীত হিসেবে বেতার কেন্দ্রটিতে প্রচার করা হতো ‘জয় বাংলা,
বাংলার জয়’ উদ্দীপ্ত সৃষ্টিকারী বিখ্যাত গানটি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বাংলার
মাটি থেকে বিতাড়িত করার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি যে যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের
উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহস জুগিয়েছে, সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা এবং হানাদার বাহিনীকে
সর্বক্ষণ রেখেছে ভীতসন্ত্রস্ত তা হলো ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। আর এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
পরিচালনা করেছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
যথার্থ না থাকলেও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা ছিলেন উদ্যম। বালিগঞ্জ সার্কুলার
রোডের বাড়িটির দোতলার ছোট কক্ষটিতে (যেখানে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন
আহমদ থাকতেন) দুটি ভাঙা টেপরেকর্ডার, সীমিতসংখ্যক বাদ্যযন্ত্র, কতিপয় যন্ত্রশিল্পী,
চাদর টাঙানো রেকর্ডিং রুমেই চলে রেকর্ডিং কাজ। প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট
ট্রান্সমিটারে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র সংগঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বেতারের
১০ জন নিবেদিত কর্মী (দুজন বেতার কর্মী ছিলেন না), স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনগণ এবং ইস্ট
বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতায়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের পর প্রবাসী সরকার
কাজ শুরু করে। ১৯ এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আব্দুল মান্নানকে মন্ত্রী
পদমর্যাদায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান
‘চরমপত্র’-এর পাশাপাশি যুদ্ধের খবর, নাটক,
সাহিত্য আসরসহ কিছু অনুষ্ঠান পরিধি বেড়ে দৈনিক ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত নিয়মিত প্রচার হতো।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যুদ্ধে
যাব। ১৯৭১ সালের জুন মাস মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখনই কোনো এক ভোররাত, ঘুম থেকে উঠলাম। আমি
পরিবারের সবার ছোট ছেলে, খুব আদরের, তাই মাকে বলতে গেলে হয়তো পরিবেশ আরও দুঃখ ভারাক্রান্ত
হবে, আবেগ ধরে রাখতে পারব না। মাকে ছেড়ে যেতে পারব না, কান্নাকাটি শুরু হয়ে যাবে। তাই
ভোর ৫টায় চুপি চুপি দরজাটা খুলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের
উদ্দেশে। নীলক্ষেত থেকে ইপিআরটিসি (বর্তমান বিআরটিসি) বাসে উঠলাম। কাঁচপুর, দাউদকান্দি
হয়ে কুমিল্লা পৌঁছালাম। কুমিল্লার আড়িখোলা গ্রামের এক পরিবারের সঙ্গে রাত কাটিয়ে তাদেরই
সহযোগিতায় পরদিন পার হলাম বর্ডার। পৌঁছালাম আগরতলা, সেখানে কলেজটিলায় গণসংগীতের একটি
দল ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করেছে। সেখানে এক মাস থাকলাম। এরপর পল্লীগীতি
শিল্পী মরহুম সরদার আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে আগরতলা থেকে কলকাতায় ৫৭/৮, বালীগঞ্জ সাকুর্লার
রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে
গান শুরু করলাম।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৭১ সালের ২৫ মে মুজিবনগর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করে, যা ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই অবদানের কথা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি এই বেতার কেন্দ্রের সব শিল্পী কলাকুশলীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও যুদ্ধে তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয় ও সব পর্যায়ে সমাদৃত। বাংলাদেশ সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শব্দসৈনিককে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা ও স্বীকৃতিই দিয়েছেন, তাদের জন্য ভাতাও বরাদ্দ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।’ আমাদের হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা অনন্য এই স্থাপনাটির অবস্থান আজীবন আকাশ সমান। নতুন প্রজন্মের কাছে যেন এ কথা, আমাদের এ অনুভূতি অব্যক্ত থেকে না যায়।