বিজয়ের মাস
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম
আমাদের
ভূখণ্ডের রাজনৈতিক
ইতিহাস বেশ
ঘটনাবহুল। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ঘটনাবহুল
ঘটনার জন্ম। ছাত্রাবস্থায়
ব্রিটিশ আন্দোলন
দেখেছি, দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব
দেখেছি, স্বাধীনতা
আন্দোলন দেখেছি।
তারপর পাকিস্তান
হলো, রাষ্ট্রভাষা
আন্দোলন হলো।
যুক্তফ্রন্টের বিজয়
এবং সামরিক
শাসন দেখলাম।
পরে শুরু
হলো মানুষের
বিক্ষোভ। ’৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থান হলো,
নির্বাচন হলো।
’৭১-এর
যুদ্ধের মাধ্যমে
স্বাধীন রাষ্ট্র
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত
হলো। রাষ্ট্রকে
বাদ দিয়ে
সমাজে পরিবর্তন
আনয়ন সম্ভব
হলো না।
কিন্তু মানুষের
জন্য সামাজিক
পরিবর্তন ছিল
আবশ্যক। অথচ
সামাজিক পরিবর্তনের
বিরুদ্ধে থেকেছে
ব্রিটিশ আমলের
রাষ্ট্র, পাকিস্তান
রাষ্ট্র। এমনকি
’৭১-এর স্বাধীনতার
পরও যে
নতুন রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠিত হলো,
সেই রাষ্ট্রও
সামাজিক পরিবর্তন
তথা সমাজ বিপ্লবের
পক্ষে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কাজ
করল না।
আমাদের দেশের
রাজনৈতিক দলগুলো
ভোটের জন্য
জনগণের কাছে
গেলেও তারা
জনগণের ওপর
নির্ভর করে
না। ক্ষমতায়
থাকার এবং
যাওয়ার জন্য
তারা সাম্রাজ্যবাদের
ওপর নির্ভর
করে, অনুকম্পা
প্রার্থনা করে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্বের
কারণে সরকারি
ও বিরোধী
দল সাম্রাজ্যবাদের
কৃপালাভে সচেষ্ট।
এ দুই
দলের বিপরীতে
কোনো ভালো
বিকল্প না
পেয়ে জনগণ
আওয়ামী লীগ-বিএনপি
এ দুই
দলকে পর্যায়ক্রমে
ভোট দিয়ে
এসেছে এর মধ্যে অন্য দু’একটি দলেরও কিছু কার্যক্রম দেখা যায়।
কিন্তু জনগণের
ভাগ্য তথৈবচ।
জনমতের
প্রতি উপেক্ষা
করেই বড় দুটি দলই
জামায়াত ও
হেফাজত দুই
সাম্প্রদায়িক শক্তির
সঙ্গে হাত
মিলিয়েছে, এতে
স্বাধীনতার মূল
লক্ষ্য এবং
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।
অতীতে ইরাকে
মার্কিন আগ্রাসনের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
আমাদের দেশে
সর্বজনীন হয়নি।
সাম্প্রতিক ফিলিস্তিনে
গণহত্যা বিষয়েও
তারা মুখে
কুলুপ এঁটেছে।
বামপন্থি ও
মৌলবাদীরা সেই
আগ্রাসনের বিরুদ্ধে
তবু দৃষ্টিগ্রাহ্য
কিছুটা প্রতিবাদ করেছে
কিন্তু বুর্জোয়া
রাজনৈতিক দলগুলোর
অংশগ্রহণ কতটা ছিল।
এতেই বোঝা
যায় তারা
কত বেশি
সাম্রাজ্যবাদনির্ভর।
স্বাধীন এ
রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণ
দরকার কেবল
নয়, ছিল
অতি আবশ্যিক।
ক্ষমতা শুধু
সচিবালয়ে কেন্দ্রীভূত
না রেখে
স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে
দেওয়া উচিত
ছিল। নৈতিকতার
উপাদান কাজে
লাগাতে হবে,
শক্তিশালী করতে
হবে। এমন
রাষ্ট্র গড়ে
তুলতে হবে
যেখানে সাম্রাজ্যবাদের
সঙ্গে আপস এবং
সন্ত্রাসের লালন
হবে না
এবং সংখ্যালঘুর
ওপর নিপীড়ন
ও অনিরাপত্তার ছাায়া
থাকবে না।
মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাসম্পন্ন একটি
বিকল্প ধারার প্রয়োজন
ছিল,
অথচ স্বাধীনতার
৫২ বছর
অতিক্রান্তেও তা
পূরণ হলো
না। যার
সামনে লক্ষ্য
হিসেবে চির জাগরুক থাকবে গণতন্ত্র,
সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা।
যে গণতন্ত্রে
সমাজতন্ত্রের উপাদান
আছে, যে
ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি
হলো ইহজাগতিকতা
এবং যে
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়
সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদ মুক্ত অঙ্গীকার
আছে; সে
ধরনের অঙ্গীকার
নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা
গঠনের জন্য
গণভিত্তিক রাজনৈতিক
দল গঠন
করা প্রয়োজন।
আমাদের দুর্ভাগ্য
বাম দলগুলো সে
সুযোগ কাজে
না লাগিয়ে
দশকের পর
দশক ব্যর্থ
হয়েছে। বাম
দলগুলো বড়
দলের জোটভুক্ত
হয়ে কিছুই
করতে পারবে
না। এসব
দল ব্যর্থ
হলেও তাদের
প্রয়োজন আছে
গণচেতনার সংগ্রামের জন্য।
তবে তাদের
অবশ্যই ক্ষমতার
লেজুড়বৃত্তির মোহ
ত্যাগ করতে
হবে। তাদের
প্রধান কাজই
হবে জনগণের
মুক্তির লক্ষ্যে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
এসেছিল প্রধান
দলগুলোর ব্যর্থতা
ও দুর্বলতার
কারণে। যারা
নির্বাচন পরিচালনা
করতে পারে
না, তারা
দেশ চালাবে
কী করে?
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে
আদর্শবাদিতা
নিম্নস্তরে
নেমে গেছে,
স্বার্থবাদিতা
প্রবল
হয়েছে।
ছাত্র
রাজনীতিকে
চাঁদাবাজি
ও সন্ত্রাসের
অভিমুখে
ঠেলে দেওয়া
হয়েছে।
আগে ছাত্ররা
রাজনীতি
করত জনগণের
পাশে দাঁড়ানোর
জন্য।
এখন করে
অর্থনৈতিক
মুনাফার
অভিপ্রায়ে।
নব্বইয়ের
গণঅভ্যুত্থানের
পর ভোটে
নির্বাচিত
হয়ে ক্ষমতায়
এসেছে
একের পর
এক সরকার
কিন্তু
জনগণের মুক্তি মেলেনি যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার।
সন্ত্রাস
দমনের জন্য
সত্যিকার কার্যকর
পদক্ষেপ কোনো
ক্ষমতাসীন সরকারই
নেয়নি। বিপরীতে
দলীয় রাজনীতির
অনুকম্পায় সন্ত্রাসীদের
দণ্ড মওকুফসহ
নানাভাবে ছাড়
দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র
নয়, মুসলিম
রাষ্ট্রও নয়।
এখানে বিভিন্ন
সংখ্যালঘু জাতিসত্তা
রয়েছে। বাংলাদেশ
একটি গণতান্ত্রিক
রাষ্ট্র। বড়
দুটি দল
নিজেদের জাতীয়তাবাদী
বলে বড়াই
করে। অথচ
সংখ্যালঘু জাতিসত্তার
কোনো স্বীকৃতি
দিতে চায়
না। সচেতন
আদর্শবাদী মধ্যবিত্ত
ও শ্রমজীবীদের
স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের
মাধ্যমে সব
জাতিসত্তার সমান
অধিকার প্রতিষ্ঠার
ভিত্তিতে বাংলাদেশকে
গড়ে তুলতে
হবে। ঘরে-বাইরে
নৃশংসতা ও
ভোগবাদিতা প্রবল
হচ্ছে। সমাজ
রূপান্তরের জন্য
সাধারণ মানুষের
অংশগ্রহণের মাধ্যমে
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্থানীয়
ও জাতীয়
আন্দোলন গড়ে
তোলা এখন
সময়ের দাবি।
রাষ্ট্র
ও রাজনীতির
মাধ্যমেই সমাজ
বদলাতে হবে।
রাজনীতিকদের দুর্বলতা
ও ব্যর্থতার
কারণে অগণতান্ত্রিক শক্তি
ক্ষমতায় আসে,
আমলারা ক্ষমতা
গ্রহণ করেন।
অথচ তারা কোনো
রাজনৈতিক দল
নয়। জাতীয়
উন্নয়নে রাষ্ট্রকেই
উপায় বের
করতে হবে।
জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয়
ও স্থানীয়
ইস্যু নিয়ে
রাজনীতি করা
দরকার অথচ
বড় রাজনৈতিক
দলগুলো তা
করে না।
স্থানীয় পর্যায়ে
সন্ত্রাস দমন,
দুর্বল ও
সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা
বৃদ্ধি, যুব
উন্নয়নে পাঠাগার
স্থাপন, প্রশিক্ষণ
দান ও
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
করা, দুর্যোগে-বিপদে
সাহায্য-সহযোগিতা
করা রাষ্ট্রের
কর্তব্য। সরকারি
হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা
ব্যবস্থার পথ মসৃণ নয়, শ্রমিকের
কর্মসংস্থান নেই
বরং চালু
কলকারখানা বন্ধ
হয়ে গেছে।
মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা,
সাম্রাজ্যবাদ ও
দুর্নীতি প্রভৃতি
জাতীয় পর্যায়ের
প্রধান ইস্যু
এখন। সর্বাগ্রে
দরকার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারের অভিযান চালানো।
এত দিন
চালু ছিল
আধুনিকতা মানে
পাশ্চাত্যকরণ।
আধুনিকতা মানেই
আমেরিকানায়ন, ইউরোপীয়
ভাবধারায় চালিত
হওয়া। এ
ধারণায় অতিদ্রুত
পরিবর্তন ঘটেছে,
মোহ ভেঙে
গেছে। এখন
আধুনিকতা বলতে
আমেরিকান আধুনিকতাকে
বোঝায় না।
কারণ আমেরিকান
আধুনিকতার মধ্যে
যে নিষ্ঠুরতা
আছে তা
লক্ষণীয়। আধুনিকতার
প্রয়োজনে এখন
দরকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা,
মাতৃভাষার চর্চা,
নিজস্ব সংস্কৃতি
বিকশিত করা।
আর একটি
দার্শনিক মতবাদ
হলো উত্তরাধুনিকতাবাদ।
এর মোহ
এ দেশের তরুণ
সমাজ কাটিয়ে
উঠতে পেরেছে।
উত্তরাধুনিকতার প্রবণতা
হলো খণ্ড-বিখণ্ডতা,
বিচ্ছিন্নতা।
এটি পরিবার,
সমাজ, প্রতিষ্ঠান,
নারী-পুরুষ,
ট্রেড ইউনিয়ন
প্রভৃতির মধ্যে
দ্বন্দ্ব-বিচ্ছিন্নতার
ধারণা ও
তৎপরতা উস্কে
দিয়েছে। উত্তরাধুনিকতাবাদ
বিশ্বায়ন ও
সাম্রাজ্যবাদের দর্শন।
বিশ্বায়ন মানেই
আধিপত্য; সে
আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধী।
আন্তর্জাতিকতাবাদে বহুজাতি
ও বহুভাষার
অস্তিত্ব আছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা
পরিষদে নানা
ভাষার অনুমোদন
আছে। যুক্তরাষ্ট্রের
নেতৃত্বে যে
বিশ্বায়ন সৃষ্টি
হয়েছে তার
আধিপত্যবাদী হাতিয়ার
হচ্ছে ইংরেজি
ভাষা। সব
রকমের আদানপ্রদানের
ক্ষেত্রে এ
ভাষা ব্যবহৃত
হচ্ছে। কিন্তু
ভাষার মাধ্যমে
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
মেনে নেওয়া
যায় না।
আমাদের দাঁড়াবার
জায়গা হচ্ছে
সংস্কৃতি। সংস্কৃতিচর্চার
ক্ষেত্রে মাতৃভাষার
গুরুত্ব বেড়েছে।
আমরা গণতান্ত্রিক
বিশ্ব চাই
কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী,
পুঁজিবাদী ও
আধিপত্যবাদী বিশ্ব
চাই না।
আমরা এমন
গণতান্ত্রিক বিশ্ব
চাই যেখানে
সমঅধিকার ও
সহমর্মিতা হবে
সম্পর্কের ভিত্তি।
রাষ্ট্রের অধীনে
নাগরিকের অধিকার
সংহত থাকবে।
সাম্রাজ্যবাদ আকাশে থাকে না। তাদের প্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করে। সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্য বিস্তার করছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রভু হয়ে। সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত বিশ্বায়নের রূপ নিয়ে সমস্ত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে দিয়ে পদানত করতে চায় সারা বিশ্ব। পৃথিবী এখন সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এ দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশে যারা উদারনীতির চর্চা করেছেন এবং যারা ভেবেছেন উদানীতির মাধ্যমে একটা ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আসবে আজ তারাও বুঝতে পেরেছেন সাম্রাজ্যবাদ কত নৃশংস ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। আমাদের মাটির নিচে যে সামান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, যে তেল ও গ্যাস আছে সাম্রাজ্যবাদের চোখ সেখানেও। আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। এ উপলব্ধিটা সর্বজনীন হয়েছে। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর-ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান-একথা বারবার প্রতীয়মান হচ্ছে। তারা মার্কিনিদের সব হামলা-আগ্রাসনের বৈধতা দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের দাঁড়াতে হবে বড় শক্তি সেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হবে, আন্দোলন করতে হবে মুক্তির জন্য। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় আন্দোলন প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গণমুক্তির লক্ষ্যে এ উপলব্ধি কাজে লাগাতে হবে। নয়তো বছরান্তে বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করবে। আমাদের সমষ্টিগত স্বাধীনতা ও মুক্তি নিশ্চিত হবে না।