সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:৩৮ এএম
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা নতুন কিছু নয়। এর মধ্যে পেঁয়াজ
অন্যতম একটি পণ্য, যা চাহিদার নিরিখে খুব বেশি আমদানির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বিগত
কয়েক মাসে দফায় দফায় পেঁয়াজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ী নামক সিন্ডিকেটের
হোতারা। ১০ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দিনেই
পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা ভোক্তার পকেট থেকে লোপাট করে নিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা!
বিস্ময়কর বৈকি, এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়ে গেল একশ টাকা! অভ্যন্তরীণ
বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত সপ্তাহে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ভারত।
আমরা জানি, চাহিদার নিরিখে বেশিরভাগ পেঁয়াজই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু তাদের
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া মাত্র আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা যে
কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা যে এবারই প্রথম তাও কিন্তু নয়।
সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, বাজার বিশ্লেষকরা তো বটেই, কৃষি সম্প্রসারণ
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এক রাতে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি একশ টাকা বেড়ে যাওয়ার কোনো
যৌক্তিক কারণ দেখছেন না। তাদের ভাষ্য, ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ
আমদানি হয়েছে। তার পাশাপাশি ছিল আগের মজুদ পেঁয়াজও। এরই মধ্যে দেশে নতুন পেঁয়াজও উঠতে
শুরু করেছে। নানা সমীকরণে কোনোভাবেই বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজের মজুদে যেমন ঘাটতি
নেই, তেমনি বিঘ্ন নেই সরবরাহেও। ভোক্তা অধিদপ্তরের ডিজি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বাজারে
এই প্রেক্ষাপটে জোরদার অভিযান শুরু হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত
অভিযান চলবে। আমরা তার এই প্রত্যয়কে সাধুবাদ জানাই বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও
রাখতে চাই- এমন ঘটনা কি এবারই প্রথম? নিকট অতীতেও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম
সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে ভোক্তার পকেট কেটেছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। তখন যদি যথাযথ প্রতিকার-প্রতিবিধান
নিশ্চিত করা হতো, তাহলে হয়তো ফের এ রকম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটত না। কাজেই দায়িত্বশীলদের
প্রতিশ্রুতি কিংবা আশ্বাসে বিশ্বাস রাখা দুরূহ।
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী বাজারে যদি কোনো পণ্যের চাহিদার
বিপরীতে ব্যাপক ঘাটতি থাকে কিংবা সরবরাহ চেইন নির্বিঘ্ন না হয়, তাহলে কখনও কখনও বিরূপ
প্রভাব পড়তে পারে। তবে ব্যবস্থাপনা যদি সুচারু হয় এবং তদারকি-নজরদারির পাশাপাশি জবাবদিহি
নিশ্চিত হয়, তাহলে চাপে-তাপে ভোক্তার প্রাণ ওষ্ঠাগত না হওয়ারই কথা। কিন্তু বিদ্যমান
পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয়, এসব ক্ষেত্রেই রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। আমরা ইতঃপূর্বে বহুবার এই
সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছি, শুধু নজরদারি-তদারকি বাড়িয়েই অতি মুনাফাখোরদের মুনাফার লালসা
থেকে নিবৃত্ত করা যাবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা। বাজারে
সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও আমরা উপস্থাপন করেছিলাম।
কিন্তু, বাজারের নাটাই সিন্ডিকেটের হোতাদের হাত থেকে যেন কোনোভাবেই নেওয়া যাচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা ফের প্রশ্ন রাখতে চাই, সিন্ডিকেটের হোতাদের কাছে সরকারের দায়িত্বশীল
মহলগুলোর অসহায় আত্মসমর্পণের হেতুটা কী? ইতঃপূর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রীসহ
সরকারের আরও কয়েক মন্ত্রী সিন্ডিকেটের কারসাজির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। একদিকে সরকারের
মন্ত্রীরা সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করবেন, সংশ্লিষ্ট অন্য মহলগুলোর দায়িত্বশীলরাও
একই কথা বলবেন, অথচ এর কোনো প্রতিকার-প্রতিবিধান নিশ্চিত হবে নাÑ তা তো হতে পারে না।
আমাদের স্মরণে আছে, গত সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে সাংবাদিকরা পরিকল্পনামন্ত্রী
আব্দুল মান্নানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘সাপের খেলা যে জানে সে ঠিকই মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’ মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায়
গদলের চিত্রই ফের উঠে এসেছিল।
বাজারের সাপুড়েকে খুঁজে বের করে ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত করার দায় সরকারেরই। আমরা মনে করি, উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বরং সংশ্লিষ্টদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনে নিষ্ঠার পরিচয় দেওয়া জরুরি। পেঁয়াজের বাজারে ফের যারা অস্বাভাবিকতার তাপ ছড়িয়েছে, তাদের অনুসন্ধান করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায় যাদের সর্বাগ্রে দরকার তাদের নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান। মূল্যস্ফীতির ক্রমাগত চাপে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে আর যাদের এসব দেখভালের কথা তারা শুধু অবিরত ‘অমিয় বাণী’ই দেবেন, তা তো হতে পারে না। আমরা মনে করি, অতি মুনাফাখোরদের নীতি-নৈতিকতার পাট চুকিয়ে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের উদর স্ফীত করার উদগ্র বাসনা নিবৃত্ত করতে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রশক্তির চেয়েও কি সিন্ডিকেটের শক্তি বেশি? এদের মূলোপাৎটন করতেই হবে।