দিবস
রত্না খাতুন
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:০০ এএম
মাটি অনবায়নযোগ্য ও সসীম সম্পদ। জীবিকা নির্বাহের জন্য সমস্ত জীব
মাটির ওপর নির্ভরশীল। মাটিতে হাজার হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মায়। উদ্ভিদ মাটি থেকে
বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি সংগ্রহ করে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী উদ্ভিদ থেকে তাদের পুষ্টি
গ্রহণ করে। উদ্ভিদ থেকে মানুষ খনিজ, ভিটামিন ও প্রোটিন গ্রহণ করে; যা তাদের বেঁচে থাকার
জন্য প্রয়োজন। অর্থাৎ খাদ্যের জন্য মানুষ মাটির ওপর নির্ভরশীল। যখন আমরা ফসল সংগ্রহ
করি, তখন ফসলের সঙ্গে সঙ্গে মাটির কিছু পুষ্টি উপাদানও আমরা নিয়ে যাই। একে বলা হয় মাটির
পুষ্টি রপ্তানি। এর ফলে মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। উদ্ভিদ মাটি থেকে যে
পুষ্টি গ্রহণ করে তা সার বা অন্য কোনো উপায়ে মাটিতে ফেরত দিতে হবে। এতে মাটির উর্বরতামান
বজায় থাকবে।
ভূমির ওপর প্রাকৃতিকভাবে এক ইঞ্চি পরিমাণ মৃত্তিকা গঠিত হতে ৫০০-১০০০
বছর পর্যন্ত সময় লাগে। অথচ নানা কারণে ভূমির উপরিভাগের মাটি নষ্ট হচ্ছে। অপরিকল্পিত
শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, কীটনাশকের অপরিকল্পিত ব্যবহার, ব্যাপকভাবে বনভূমি ধ্বংস করা, পাহাড়ে
জুমচাষ, ইটের ভাঁটা বিপুল পরিমাণ ভূমি ক্ষয় ঘটাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩
শতাংশ করে বনভূমি বিনাশ হচ্ছে, যা ব্যাপকভাবে ভূমি ক্ষয়ের কারণ। একটি পরিসংখ্যান বলছে,
বিশ্বে বছরে প্রায় সোয়া কোটি হেক্টর জমির অবক্ষয় হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক
মানুষ (৩২০ কোটি) নানা জায়গায় মাটি অবক্ষয়জনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের মানুষের
মাঝে মৃত্তিকা সম্পদ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সয়েল সায়েন্স
২০০২ সালের ৫ ডিসেম্বরকে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫ ডিসেম্বরকে ‘বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস’ ঘোষণা করে। ২০১৪ সাল থেকে
আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস’ পালিত হয়। দিনটি মাটির
স্বাস্থ্য এবং এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিজ্ঞানী, ছাত্র, কৃষকদের অবহিত ও অনুপ্রাণিত
করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এ বছর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মাটি ও পানি :
জীবনের একটি উৎস’।
সরকারি এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আমাদের মোট ভূমির প্রায় ৭৫ শতাংশই
এখন উর্বরতা ঘাটতিতে ভুগছে। মৃত্তিকা গবেষণা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০০০
সালে দেশে উর্বরতার ঘাটতিযুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর। পরের ২০ বছরে
আরও প্রায় এক লাখ হেক্টর ভূমি এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশে উর্বরতা
বা পুষ্টি ঘাটতিযুক্ত ভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ১১ লাখ হেক্টরে, যা দেশের মোট জমির
প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে মাটিতে পুষ্টির ঘাটতিজনিত ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ অঞ্চলে।
আগামী ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৯০০ কোটিতে পৌঁছাবে। মাটির উর্বরতা ক্ষয়রোধে ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে; যা খাদ্য, পানি ও বাতাসকে করে তুলবে বিষাক্ত। বিশ্বের খাদ্যের চাহিদা পূরণে মাটি অত্যাবশ্যক। বিশ্বের প্রায় ৯৫ ভাগ খাদ্য জোগান দেয় মাটি। সুস্থ মাটি পৃথিবীর ক্ষুধা দূর করতে এবং আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর একটি গ্রহ উপহার দিতে সক্ষম। মাটির স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানবস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিবিড়। মাটি বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে। পরিবেশ বাঁচলে রক্ষা পাবে প্রাণী ও উদ্ভিদজগৎ।