ফিলিস্তিন সংকট
ইয়োসি মেকেলবার্গ
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:০১ এএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৩৪ এএম
ইয়োসি মেকেলবার্গ
সাত সপ্তাহব্যাপী ইসরায়েল ও হামাসের
মধ্যকার রক্তাক্ত সংঘর্ষে গোটা বিশ্ব আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অবশেষে চার দিনের
যুদ্ধবিরতি এবং নানা বিবেচনায় যুদ্ধবিরতি আরও কিছুদিন বাড়ানোর পালা। যুদ্ধবিরতি ভীষণ
প্রয়োজন ছিল । তবে শান্ত পরিস্থিতি এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়নি। অস্থায়ী
যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাসের অধীনে জিম্মি বন্দিদের মুক্ত করার
প্রক্রিয়া শুরু হয়। তা ছাড়া গাজা উপত্যকায় মানবিক সহযোগিতা পাঠানোর সুযোগও তৈরি
হয়। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংকটের অন্ধকার মুহূর্তে এই কটি দিন খানিকটা আশার আলো ছড়ালেও
তা স্থায়ী হয়নি। ইসরায়েলিরা ফের পূর্ণোদ্যমে হামলা শুরু করেছে। ইসরায়েলিদের সহিংস
এই আচরণ অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কি ইঙ্গিত করে?
কয়েক দিন যুদ্ধ বন্ধ রাখলে দুই অঞ্চলের মধ্যকার সহিংস পরিস্থিতির মীমাংসা করা যাবে এমনটি একেবারেই অমূলক প্রত্যাশা। তবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটুকু নিশ্চিত হয়ে বলা যায়, হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করার আগ পর্যন্ত ইসরায়েল তাদের হামলা থামাবে না। যুদ্ধবিরতির সুযোগে হামাসের কাছে যারা জিম্মি রয়েছেন তাদের যতজনকে সম্ভব উদ্ধার করার চেষ্টা করেছে তারা। সেজন্য হামাসকে আবার পুনঃসংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিতেও তারা রাজি ছিল। তবে তৃতীয় পক্ষের সমঝোতায় অবশ্য ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধবিরতি দেওয়া হবে না, এমনটিও বলা যাবে না। যুদ্ধবিরতির সময় দুই পক্ষেরই নানা রাজনৈতিক সুবিধা আদায় হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার সরকার ভয়াবহ চাপের মুখে ছিল পুরোটা সময়। হামাসের বন্দিদশা থেকে ইসরায়েলিদের মুক্ত করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব হয়।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একমাত্র
হামাসেরই ইসরায়েলে বন্দিদের মুক্ত করার রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে। এই মুহূর্তে
যুদ্ধবিরতিতে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের রাজনৈতিক ক্ষমতা কিছুটা
হলেও বেড়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় কাতার, মিসর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
অবদান থাকলেও ভয়াবহ এই যুদ্ধের পরিণতি এখনও অনুমান করা যাচ্ছে না। শিগগিরই
যুদ্ধাবস্থা শেষ হবে তাও বলা যাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতির সময় বন্দিবিনিময়ের দিকেই সবার
মনোযোগ ছিল। তবে এই যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণের ভয়াবহতা কিছুদিনের জন্য
দূর করেছে। অবশেষে ফিলিস্তিনিদের কাছে ওষুধ, কাপড় ও খাবারের মতো মানবিক সহযোগিতা
পৌঁছাতে পেরেছে। সাত সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মানুষকে নানা কষ্ট সহ্য করে। অবশেষে
মানসিক সহায়তা পৌঁছানোর মাধ্যমে সেই কষ্ট কিছুটা লাঘব হলেও ফের দেখা দিয়েছে
অনিশ্চয়তা।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট যে ইসরায়েলিরা
হামাসের কাছে জিম্মি হয়ে আছে তাদের উদ্ধার করার দরকষাকষির প্রক্রিয়া আরও জটিল হবে।
ইসরায়েলের বিভিন্ন জেলে হামাসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা আটক আছেন। হামাস এই সদস্যদের
উদ্ধার করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাদের কাছে আটক গুরুত্বপূর্ণ ইসরায়েলিদের মুক্তি
না দিলে এই লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব। সংগঠনটি দীর্ঘদিন সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের
মুক্তির বিষয়ে আগ্রহী। সম্প্রতি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন
আব্দুলরহমান আল-থানি, সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নস, মোসাদের প্রধান ডেভিড
বার্নিয়া এবং মিসরের জেনারেল ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান আব্বাস কামেলের
মধ্যকার এক বৈঠকে ভবিষ্যতে ইসরায়েলে বন্দি থাকা পাঁচ শ্রেণির ফিলিস্তিনি কয়েদিদের
মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের আলোচনার তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ভবিষ্যতে
বন্দিবিনিময়ের আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠবে। যেহেতু ইসরায়েল সামরিক আক্রমণ পূর্ণোদ্যমে
শুরু করেছে তাই আলোচনার পথ আরও জটিল হয়ে গেছে। দুই পক্ষই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে
জড়িয়ে পড়তে চাচ্ছে। তাই সমঝোতার জন্য আলোচনার পথ প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে।
ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের দাবি, তাদের
রাজনৈতিক চাপেই হামাস বন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই দাবি মেনে নেওয়া
কঠিন। ইসরায়েল হামাসকে ধ্বংস করার জন্য নিয়মিত অভিযান করছে। এমন একটি সংগঠনের জন্য
বন্দি বা জিম্মি ইসরায়েলি নাগরিক এক ধরনের রাজনৈতিক সম্পদ। তাই রাজনৈতিক চাপে
বন্দিবিনিময় করার বিষয়টি খাপছাড়া। যদি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা হতো তাহলে এই
দাবি বিশ্বাসযোগ্য হতো। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রশাসন ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া
শুরু করায় ফিলিস্তিনিদের কাছে হামাসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্য ইসরায়েলি প্রশাসন কিছুটা হলেও প্রশংসিত হবে।
কিন্তু হামাসের নেতৃত্বকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘর্ষ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে চলেছে। আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায় এ বিষয়ে কী ভূমিকা পালন করে, তা দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে
শান্তি প্রতিষ্ঠার দায় নিতে হবে। বিশেষত ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে হবে,
যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও স্থায়ী হলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হবে। সামরিক অভিযানের
মাধ্যমে এই অঞ্চলে উদ্বাস্তু সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করবে। বিশেষত দক্ষিণ গাজায়
যারা আশ্রয় নিচ্ছে তারা নতুন সংকট তৈরি করবে।
ইসরায়েল সম্প্রতি ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে
নানা কৌশল অবলম্বন করছে। অন্তত দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকে তারা কর্মপরিকল্পনা
বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবে সামরিক শক্তিমত্তার ভিত্তিতে হামাসকে প্রতিহত করার
পথ থেকে সরে আসাই তাদের জন্য শ্রেয়। রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে
সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। ফিলিস্তিনের অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
বিকাশের স্বার্থ, সমতা, নিরাপত্তা, অধিকার সুনিশ্চিত এবং মানবতার বিপর্যয় ঠেকাতে
বিদ্যমান সংকট নিরসনের পথ বের করতেই হবে। তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা
সামান্যতম হলেও দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তা অসম্ভব।
আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন