সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৪৫ এএম
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক চলমান রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘিরে দেশ-বিদেশের নানা মহলে তো বটেই, এমনকি কোনো কোনো দেশের সরকারেরও তীক্ষ্ন নজর রয়েছে। আমরা দেখছি, বিদেশি বিভিন্ন মহল ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে অবাধ-স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকালে তার সহযোগী শক্তি সরকারের তরফে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ব্যাপারে ইতোমধ্যে অঙ্গীকারও ব্যক্ত হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত আরও কয়েক ধাপ বাকি রয়েছে। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ যে বহুমুখীÑ তা আর নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রাখে না।
আস্থার সংকট থেকেই বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে আমরা এও দেখেছি, তফসিল ঘোষণার পর থেকে মনোনয়ন দাখিল পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল ওঠে। তবে কমিশন আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে কয়েক প্রার্থীসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ১ ডিসেম্বর মাগুরা দায়রা ও জজ আদালতে কারণ দর্শানোর পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিয়েছেন। একই অভিযোগে তলব করা হয়েছে কক্সবাজার-১ আসনের দুই প্রার্থীকে। পাশাপাশি একাদশ জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীকেও কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় নরসিংদী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কমিশনের এসব পদক্ষেপ প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক বলেই মনে করি। তবে একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা থেকে এও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, শুধু নোটিস জারি কিংবা তলব করেই দায়িত্ব শেষ করার অবকাশ নেই। নির্বাচনী আচরণবিধি কেউই যাতে লঙ্ঘন করতে না পারেনÑ এ ব্যাপারে কমিশনকে অনমনীয় ও নির্মোহ অবস্থানে অনড় থাকতে হবে।
একই দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আরও জানা যায়, নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) পর্যায়ক্রমে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সাংবিধানিক এই সংস্থা ইউএনও এবং ওসিদের বদলির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আলাদা চিঠি দিয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের বদলির প্রস্তাব ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ইসিতে পাঠাতে হবে। আমরা জানি, ইতঃপূর্বে ইসির তরফে বলা হয়েছিলÑ পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে বড় রদবদল আনা হবে না। কিন্তু নির্বাচনে অংশীজনদের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলির যে নির্দেশ দিয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। অবাধ-সুষ্ঠু-প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্যে ইসির দৃঢ়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নির্বাচনকালে তাদের সহযোগী শক্তি সরকারেরও এক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা বাঞ্ছনীয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গÑ তা বলার অবকাশ রাখে না। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ থেকেই নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে আস্থার পারদ নিম্নগামী হতে শুরু করে। আমরা মনে করি, সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা কিংবা এখতিয়ার বলে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্বপালনের মধ্য দিয়ে আস্থার পারদ ঊর্ধ্বমুখী করার বিশ্বাসযোগ্য নজির নির্বাচন কমিশনকেই সৃষ্টি করতে হবে।
গণতন্ত্রের বিকাশ ও শোভা অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন অবশ্যই অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন ঘিরে নানা মহলে যে বিতর্ক-সমালোচনা-আশঙ্কা রয়েছে তা মিথ্যা প্রমাণে তাদেরই সক্ষমতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা এও মনে করি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত করার লক্ষ্যে যে গর্জন দিয়েছেন সেই অনুপাতে বর্ষণেও তিনি দৃশ্যমান সবকিছু করতে সক্ষম হবেন, যার মাধ্যমে তাদের চ্যালেঞ্জজয়ী হওয়ার পথ সুগম হতে পারে। অনিয়ম-অন্যায়ের যদি দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এর পুনরাবৃত্তি রোধ করাও অনেকাংশে সহজ। আমরা সাধুবাদ জানাই আইজিপিকেও। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ বিভাগের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যথাযথ ভূমিকা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সব সমালোচনা-আশঙ্কার যবনিকাপাত করা সম্ভবÑ এই প্রত্যাশাও অমূলক নয়।