জন্মদিন
ড. সালমা বিনতে শফিক
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:৩৩ পিএম
জাতীয় অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের
সম্মানে ৫৮৩ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছিলেন তার সবচেয়ে স্নেহভাজন ছাত্র
অধ্যাপক মাহমুদুল হক (১৯৫০-২০২১)। গ্রন্থের প্রথমার্ধে সম্পাদক তার প্রিয় শিক্ষকের
সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত রচনা করেন, যার শিরোনাম দেন ‘আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন
: টিচার রিসার্চার জুরিসপ্রুডেন্ট এডুকেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’। অধ্যাপক আলমগীর
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনকে চিত্রায়িত করতে গিয়ে কয়েকটি
জাদুকরী বিশেষণ ব্যবহার করেন লেখক, যা থেকে বোঝা যায় তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক,
আইনজ্ঞ এবং শিক্ষাপ্রশাসক হিসেবে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ৮৫ বছরের জীবন
পরিক্রমায় জ্ঞানচর্চার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ আছেন অধ্যাপক
সিরাজুদ্দীন। ১৯৩৭ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য শিক্ষাবিদ। ৮৭তম
জন্মদিনে তার প্রতি এক নগণ্য ছাত্রীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জন্ম তার অবিভক্ত ভারতবর্ষে; চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার
কাঞ্চনা ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত কৃষিজীবী পরিবারে। পিতা মৌলবি আবদুল বারী এবং মাতা
মোসাম্মাৎ গুলজান বেগমের ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম তিনি। বিদ্যানুরাগী বাবার কাছেই
লেখাপড়ার হাতেখড়ি, আরবি ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ
সমাপ্ত করেন গ্রামের স্কুলে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে সাফল্যের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে।
স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অসামান্য কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন ১৯৫৯ সালে।
পরের বছর প্রভাষক পদে যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম
কলেজে।
১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডন
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এ গমন করেন। তার
পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রফেসর জে বি হ্যারিসন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময় ইংরেজ মেজর হিসেবে জাপানি বোমার আক্রমণ থেকে চট্টগ্রাম সীমান্ত রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা
পালন করেছিলেন, এবং সেদিনের বালক আলমগীরের গ্রামের বাড়ি থেকে মাত্র ২ মাইল দূরে
দোহাজারী বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনাটি বহুবছর পর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের
এসওএএসে শিক্ষক ও ছাত্রের মাঝে একটা অদ্ভুত যোগসূত্র স্থাপন করে। গবেষক আলমগীর
সিরাজুদ্দীন প্রফেসর হ্যারিসনের নির্দেশনায় ‘দ্য রেভিনিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
অব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইন চিটাগাং’ শিরোনামে অভিসন্দর্ভ রচনা করে
পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬৪ সালে।
পিএইচডি গবেষণা চলাকালেই আলমগীর সিরাজুদ্দীনের সঙ্গে
সাক্ষাৎ হয় লাহোর থেকে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে আগত লন্ডনের হর্নজি আর্ট কলেজের
স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আসমা হকের। ১৯৬৬ সালে তারা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।
ইতোমধ্যে ড. সিরাজুদ্দীন লিংকনস্-ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন
(১৯৬৭)। একই সময়ে আসমা সিরাজুদ্দীন এসওএএসের প্রত্নতত্ত্ব
বিভাগ থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে তারা দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শিক্ষক
হিসেবে যোগদান করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। শিক্ষকতা, গবেষণা আর
গবেষণার প্রয়োজনে দেশবিদেশ পরিভ্রমণে দুজন ছিলেন দুজনের অনুগামী, সহযোগী,
সহযাত্রী। তারা দুজন এক দীর্ঘ আনন্দময় সৃষ্টিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে
ভালোবাসার অমর মহাকাব্য রচনা করেছেন মর্ত্যের বুকে।
জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানদানের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রশাসনেও
অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন অধ্যাপক আলমগীর সিরাজুদ্দীন। ১৯৮৮ সালে তদানীন্তন
উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ আলী পদত্যাগ করার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত
উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরের বছর জুনে সিনেট
নির্বাচনে ৭২/৮১ ভোট পেয়ে চার বছরের জন্য উপাচার্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৯১ সালের
৩১ ডিসেম্বর সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করতে
বাধ্য হন। প্রসঙ্গত, তার পরে আর কোনো উপাচার্য নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্বভার
গ্রহণ করেননি। উপাচার্যের পদে ইস্তফা দিয়ে বিভাগে প্রত্যাবর্তন করেন অধ্যাপক ড.
আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন। সিরাজুদ্দীন স্যারের পাঠদান পদ্ধতি,
বিষয়বস্তু উপস্থাপন, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং বাচনভঙ্গির জন্য দুই মহাযুদ্ধের
অন্তর্বর্তীকালীন জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সরল ও উপভোগ্য মনে হতো শিক্ষার্থীদের
কাছে। আন্তর্জাতিক আইনের মতো দুর্বোধ্য বিষয়ও তিনি মনোমুগ্ধকরভাবে উপস্থাপন করতেন।
নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা তার প্রধান দুই অবলম্বন। ৮টা ৪৫ মিনিটের ক্লাসে
কোনো দিন ৮টা ৪৬ মিনিটে প্রবেশ করেননি।
বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে অধ্যাপক আলমগীর সিরাজুদ্দীন অনেক
ফেলোশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকর্ম
সম্পাদন করেন। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও বিভিন্ন দেশে গমন করেন। দেশবিদেশের
খ্যাতনামা জার্নালে তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ত্রিশের অধিক। প্রকাশিত
গ্রন্থ সাতটি, তার মধ্যে তিনটিই প্রকাশিত হয় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ইংল্যান্ডের সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য
গার্ডিয়ানের চোখে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক দুটি গ্রন্থ ছাপাখানায় আছে
প্রকাশের অপেক্ষায়। এ ছাড়া দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য স্মারক বক্তৃতা ও
সমাবর্তন বক্তৃতায় বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার সংকট ও সমাধান, আইনব্যবস্থার সংস্কার,
মানবিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, ইতিহাসপাঠের গুরুত্বসহ অনেক বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য
উপস্থাপন করেন, যা থেকে দেশ ও জাতি উপকৃত হতে পারে।
অধ্যাপক আলমগীর সিরাজুদ্দীন শিক্ষা ও গবেষণা এবং শিক্ষাপ্রশাসকের ভূমিকায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর নিযুক্ত হন ২০১২ সালে। একুশে পদক লাভ করেন ২০১৭ সালে এবং ২০২১ সালে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদায় ভূষিত হন। ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রত্যুষে তাকে একা ফেলে পরলোক গমন করেন তার দীর্ঘ ছয় দশকের পথচলার সঙ্গী অধ্যাপক আসমা সিরাজুদ্দীন। রূপকথাকে হার মানানো ভালোবাসার গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায় না। একজন জাতীয় অধ্যাপক প্রিয়তমার স্মৃতির প্রদীপ জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে রাখেন, সমাধিতে ফুল ফোটান, আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করেন। একই সঙ্গে চলে তার নিরন্তর জ্ঞানসাধনা। শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীনের সুস্বাস্থ্য ও কর্মময় শতায়ুর প্রার্থনা।