প্রেক্ষাপট
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:২৯ পিএম
দুর্নীতি একটি
বৈশ্বিক সমস্যা। মানবসভ্যতার বিকাশ, বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি
অন্যতম অন্তরায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নানান উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন
হওয়ায় দেশে অগ্রগতির চওড়া সড়েকে তা অসত্য নয়। তবে দুর্নীতি বাড়ার অভিযোগও আছে। দুর্নীতি
বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ফলে এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হলেও প্রত্যাশিত
উন্নয়ন এখনও হয়নি। যদিও দুর্নীতির অভিযোগে দলের ক্ষমতাবান অনেককেই আদালতের কাঠগড়ায়
দাঁড়াতে হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশে এটি এক ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত। দুর্নীতি দমন কমিশন
দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর এ নীতি বাস্তবায়নে কতটুকু আন্তরিক, কতটুকু সক্ষম,
কতটুকু প্রস্তুত তা-ও প্রশ্নসাপেক্ষ।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে
দুদকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এও নানা মহল থেকৈ বলা হয়েছে, ‘সরিষায় ভূত’ রেখে তথা দুদকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী
রেখে ‘দুর্নীতর ভূত’ তাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর হবে না। অবশ্য ইতোমধ্যে দুদক তাদের হারানো
‘ইমেজ’ পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছিরকে
গ্রেপ্তার ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, কমিশনের তথ্য পাচার ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে
বরখাস্ত করা হয়। একইভাবে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো.
শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের
উপপরিচালক মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংকে
অর্থ গচ্ছিত রাখার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম কার্যালয়ে থাকাকালে অনুরূপ
অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। অনুরূপ দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক
ফজলুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আসামিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ,
আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির অনুসন্ধানের তথ্যফাঁস। তিনি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের
প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। এসব বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের দাবি, দুর্নীতির
বিরুদ্ধে তাদের সরকারের জিরো টলারেন্স রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী
পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘কোনো দুর্নীতি’ই ছোট নয়। আর ছোট করে দেখার সুযোগ
নেই। দুদক কর্মকর্তাই যদি দুর্নীতিবাজ হন, আর সেটা যদি দুদকের তদন্তেই উঠে আসে তাহলে
সাধারণ মানুষ দুদকের ওপর আস্থা রাখবে কেন? দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে
দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের অধিকাংশ সূচক নিম্নগামী। এটা হতাশাজনক। কয়েক
দফায় দুদকের জনবল বাড়লেও কাজে গতি বাড়েনি। তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত তিন বছরে উল্লেখ করার
মতো তেমন কোনো সাফল্য নেই সংস্থাটির। উল্টো দুর্নীতির অভিযোগ থাকা দেড় হাজার ব্যক্তি
ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অনুসন্ধান শেষে দায়মুক্তি বা ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে
জনপ্রতিনিধি, সাবেক সচিব, পুলিশ, ব্যাংক কর্মকর্তা, ওয়াসা, রাজউক, গণপূর্ত, বাপেক্স,
তিতাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। দায়মুক্তিপ্রাপ্ত অনেকের
বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে। তার পরও অনুসন্ধানে
দুদক কোনো সত্যতা খুঁজে পেল না এই প্রশ্ন থেকে যায়। দুর্নীতির অভিযোগ প্রাপ্তির পর
এ-সংশ্লিষ্ট কমিটি অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলে তা ৭৫ কার্যদিবসের
মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু তা যথাযথ অনুসরণ করা হয় না বলে বিভিন্ন সময়ে
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের একমাত্র কাজ দুর্নীতি দমন। এ ক্ষেত্রে অপরাধীদের মধ্যে কে কোন দলের অনুসারী, কতটা প্রভাবশালী তা বিবেচনায় আনা ঠিক নয়। অথচ দুদকের কাজকর্মে তা প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা অটুট রাখতে হলে দুদককে অবশ্যই কাজের মধ্য দিয়ে শতভাগ নির্মোহভাবে নিষ্ঠা, সততার প্রমাণ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পদক্ষেপ নিতে দেশে প্রকৃত উন্নয়নের স্বার্থে দুর্নীতির মূলোৎপাটন জরুরি। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদারে এবার স্ট্রাইকিং ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতিবাজদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে সংস্থাটির গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। ভালো উদ্যোগ, তবে কাজের মাধ্যমে এর যথাযথ প্রমাণও প্রত্যাশিত।