সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:১৮ পিএম
চলতি বছরের এইচএসসি
ও সমমান পরীক্ষার ফল ২৬ নভেম্বর ওয়েবসাইট ও স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়।
এর আগে সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী,
শিক্ষা উপমন্ত্রী ও বোর্ড চেয়ারম্যানেরা। ২৭ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এবারে গড় পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে। চলতি বছর ১১ শিক্ষা
বোর্ডে গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে
এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯২ হাজার ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী। গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে জিপিএ-৫
পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২। চলতি বছর ১১ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষায়
অংশ নেন সাড়ে ১৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। ১৭ আগস্ট শুরু হয়েছিল এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।
অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের
পরীক্ষা কিছুদিন পর শুরু হয়। এবার পুনর্বিন্যাস করা পাঠ্যসূচি অনুযায়ী একটি ছাড়া সব
বিষয়ে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণ সময়ে পরীক্ষা হয়েছে। শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)
পরীক্ষা শেষ সময়ে এসে ১০০-এর পরিবর্তে ৭৫ নম্বরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এবার পাসের হার
ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ইতিবাচক। আমরা কৃতকার্য প্রত্যেককে অভিনন্দন জানাই।
সঙ্গে যারা কৃতকার্য হতে পারেননি, তাদেরও হতাশা না হয়ে আগামী দিনে সফলতার পরিশ্রমের
জন্য বলি। সেইসঙ্গে যারা কৃতকার্য হতে পারেননি, তাদের ফল কেন খারাপ হলো, তাদের ঘাটতির
জায়গাটি কোথায় সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকদের সচেতনতার সঙ্গে
নজর দেওয়া প্রয়োজন। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
এ স্তর অতিক্রমের মাধ্যমেই তারা উচ্চ শিক্ষার জগতে প্রবেশের সুযোগ পান। যে বিপুলসংখ্যক
শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তাদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়সহ
অন্যান্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ
ভর্তিযুদ্ধ। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আসন সংখ্যার তুলনায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা
বেশি। ফলে পছন্দের প্রতিষ্ঠানে তো বটেই, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবাই ভর্তি হতে পারবেন
কি না, এ প্রশ্ন আছে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মনে রাখতে হবে, একাডেমিক
পড়ালেখা আর ভর্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ আলাদা।
যতসংখ্যক শিক্ষার্থী
এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের সবার জন্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ নেই,
এটাই বাস্তবতা। নির্দিষ্ট নম্বরের সঙ্গে জিপিএ সম্পর্কিত হলেও ভর্তি পরীক্ষায় তেমনটি
নেই। সেখানে পয়েন্টের ব্যবধান যেমন কয়েক হাজারের পার্থক্য তৈরি করে, তেমন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
আসনসংখ্যাও সীমিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শীর্ষপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও
ভর্তি এখন প্রতিযোগিতামূলক। আবার শহর ও মফস্বলের শিক্ষার্থীদের মাঝেও রয়েছে মোটা দাগের
পার্থক্য। শহরের নামি স্কুলের সঙ্গে মফস্বলের স্কুলগুলোর শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ, পড়ালেখায়
যে পার্থক্য গড়ে দেয়, এর প্রভাব দেখা যায় ভর্তিযুদ্ধেও। তাই আমরা জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন
জিপিএ’র চেয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করি। একই সঙ্গে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
আসনসংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা সমধানে উদ্যোগী হতে হবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য
যেমন মনুষ্যত্ব অর্জন, তেমন শিক্ষা শেষে উপযুক্ত কাজের সুযোগও। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই
কর্মমুখী শিক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। তাতে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও।
তাই শিক্ষাকে কর্মমুখী করা এবং সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্র ও কার্যক্রম
বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
এবার ফল প্রকাশের
পরই রাজধানীর নামি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে
ঘুরছে। ‘আমি গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছি’ তার ইংরেজি কী হবে, জানা নেই বলে শিক্ষার্থীর হাসিমুখের
ছবিটি আমাদের উদ্বেগ বাড়ায়। ব্যতিক্রম কখনও উদহারণ নয় স্বীকার করেও আমরা শিক্ষার মান
কতটা বাড়াতে পেরেছি, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা অমূলক নয়। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ডÑ এ আপ্তবাক্য
শুধু পাসের হার বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিনিয়ত সার্টিফিকেটধারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
থেকে বের করে আনলেই আমরা শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মাত্রা এবং মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারব,
এমন মনে করে আপ্ততৃপ্তিরও সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা
তথা জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে যেতে হবে। শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া বর্তমান বিশ্বের ক্রমবর্ধমান
উন্নয়নের ধারা গ্রহণ করা কঠিন। তাই পাসের হার বা জিপিএ-৫-এর চেয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর
দিকে নজর দেওয়া অধিক জরুরি।