ফিলিস্তিন সংকট
বারিয়া আলামুদ্দিন
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:১৪ পিএম
শুধু ফিলিস্তিনেই
সহিংসতা চলছে, বিষয়টি এমন নয়। তবে গণমাধ্যম আপাতত এ মর্মন্তুদতার দিকেই নজর দিয়ে রেখেছে।
গাজায় চলছে চার দিনের যুদ্ধবিরতি। এর পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে চলেছে সে বিষয়ে আমাদের ধারণা
ক্ষীণ। কিন্তু পুরো বিশ্বেই এতগুলো ঘটনা ঘটে চলেছে যার সমন্বয় গড়ে তুলে ভাবতে হবে কীভাবে
সংকট সমাধানে সচেষ্ট হওয়া যায়। ইতালিতে জর্জ মেলোনির কট্টরপন্থি শাসনে দেশটি পৌঁছে
গেছে মুসোলিনির আমলে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনেও কট্টরপন্থি সমমনারা একত্র হওয়ার কথা ভাবছে।
জার্মানি, অস্ট্রিয়ায়ও কট্টরপন্থিদের জয়জয়কার। ফ্রান্সের ভোটকেন্দ্রে ম্যারিন লে পেন
অনেকটা এগিয়ে আছেন।
হাঙ্গেরির ভিক্টর
ওরবান তো বহুদিন ধরেই অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায়
গোঁড়া কট্টরপন্থি জ্যাভিয়ার মিলেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। গত নির্বাচনে পোল্যান্ডের ন্যাশনালিস্ট ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি
বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপন্থি দলের কারণে তাদের কোয়ালিশন সরকারও ভেঙে পড়ার পথে। সেপ্টেম্বরেই
স্লোভাকিয়ার নির্বাচনে জনপ্রিয় রবার্ট ফিকো বিজয়ী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালেই
ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিরে আসছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসেও যেতে পারেন অথবা যেতে
পারেন কারাগারে।
ইউরোপীয়
ইউনিয়ন ত্যাগ করার বিষয়ে কট্টরপন্থিদের তোড়জোড় অনেক রাজনীতিকের রাতের ঘুম হারাম করে
দিয়েছে। ব্রেক্সিটের মতো একটি ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব অনেক রাষ্ট্রই সামাল দিতে পারবে
না। ইউরোপ দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার পেছনে গাজা ইস্যুটি জরুরি। জার্মানি ও ব্রিটেনে ইসরায়েলের
পক্ষপাতী মনোভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও স্পেন ফিলিস্তিনের পক্ষাবলম্বন
করছে। পশ্চিমা প্রান্তে প্রো-ফিলিস্তিন সংহতি প্রকাশের বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি
করে। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প প্রতিরোধে পশ্চিমাদের তোড়জোড় শিথিল করার ক্ষেত্রেও গাজায়
সংকটের প্রভাব রয়েছে।
একজন
জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা দেখে এখনই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে
জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা নেই কারও।’ অথচ তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ সক্রিয় ইউরেনিয়াম রয়েছে এমন
খবর পাওয়া গেছে। তারা চাইলে অন্তত তিনটি বড় মাপের বিস্ফোরক অস্ত্র বানাতে পারে। পশ্চিমা
বিশ্ব থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ যে অনেকটাই হারিয়ে গেছে তার বড় প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের
বিভিন্ন দেশে ইরানের মোতায়েন প্রক্সি সেনা। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনে তাদের প্রক্সি
সেনা রয়েছে। পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণহীনতা থেকে শঙ্কা জাগে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এ অঞ্চলেই
সীমাবদ্ধ থাকবে না। ছড়িয়ে পড়বে আরও বড় পরিসরে। তা ছাড়া ক্রেমলিনের সহযোগিতা তো ইরানের
রয়েছেই।
গাজায়
সহিংসতা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বরং ইতিবাচক ফল এনে দিয়েছে। গণমাধ্যম
থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের খবর নিমেষেই উধাও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তো বটেই বিশ্বের অন্য
সংকট ছাপিয়েও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি এখন গাজায়। এত মর্মস্পর্শীতা দৃষ্টি না কেড়ে
না কি পারে? পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
ও তাদের মিত্রশক্তিরা ইসরায়েলকে ক্ষমতাধর অস্ত্র সরবরাহে ব্যস্ত। ফলে অস্ত্রের চাহিদায়
হিমশিম খেতে থাকা ইউক্রেন থাকবে বেকায়দায়। এমনকি শান্তিচুক্তির জন্য বাধ্যও হতে পারে
তারা। আন্তর্জাতিক এ সংকটে চীনও কিছুটা খুশি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এখন ইসরায়েলে।
তাই এখন দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের দখল বাড়ানোর সুবিধা নেওয়া যেতে পারে। এমনকি তাইওয়ানে
তাদের সামরিক বাহিনীর সংখ্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নাগোরনো-কারাবাখ,
মিয়ানমার, ভেনেজুয়েলা, লিবিয়া, সিরিয়া, ইথিওপিয়া, ইয়েমেনের মতো দেশগুলোয়ও সংঘাত কিংবা
সংকটাবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু বিশ্বের মনোযোগ আর সেদিকে নেই। আফ্রিকার সাহেল বেল্ট অঞ্চলে
সংঘাত-সহিংসতা বেড়েই চলেছে। সুদানে প্যারামিলিটারি অভিযান চালাচ্ছে। মালি, নাইজার,
বারকিনা ফাসো জিহাদিদের নিয়ন্ত্রণে। আফগানিস্তানে তালেবানদের ওপরও চাপ বাড়ছে। চীন,
রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনেকটা অথর্ব
হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক সংকট নিরসনে গড়ে
তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবেই মীমাংসার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না। বিভাজনের ফলে
জলবায়ু সংকট ও আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো ক্ষতিকর বিষয় নিয়েও আলোচনার কেউ নেই।
আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায়কে অক্ষম ভাবার কারণ নেই। যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে একাধিক জটিল সংকট পর্যবেক্ষণের
অধীনে এনে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। গোটা বিশ্বে কূটনৈতিক সমীকরণের
নানা হিসাব চলছে। কিন্তু বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ দৃষ্টির অভাব থাকায় সংকট নিরসনের
পথ কঠিন হয়ে পড়েছে। সভ্য বলে অভিহিত দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে
দায় চাপিয়ে দেয় এমন এক বিধ্বংসী শক্তির ওপর, যে উল্টো ওই দেশে আরও বড় সংকটের সৃষ্টি
করে। অন্যায়ের বীজ বপনের মাধ্যমে অন্যায়ের ফসল ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৩৯ দিন গাজায় অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। তাদের অভিযানে ১৪ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃতের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। ধারণা করা হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে আরও ৭ হাজার লাশ। ইউক্রেন কিংবা গাজা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। প্রতিটি ঘটনাতেই মানবতার ভিত কেঁপে উঠেছে বারবার। বিশ্বনেতাদের এই যে খেলা তা বন্ধ করে এবার মানবিক হতে হবে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই অন্যায় আর বিষবাষ্প মাথা চাড়া দেবে সেখানেই তাদের সক্রিয় হতে হবে। সংকটময় পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি, সুদানিজ, সিরিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানদের পক্ষে দাঁড়াতে না পারলে ক্ষতি আখেরে সবারই।
আরব
নিউজ থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন