× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফিরে দেখা

নির্বাণহীন আলো একজন অসিত কুমার

সুমনা বিশ্বাস

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৩ ১৫:৩২ পিএম

সুমনা বিশ্বাস

সুমনা বিশ্বাস

মোহনবীণাটি বেজে চলেছে। মঞ্চের বাইরে, ঠিক সামনের আলো-আঁধারিতে মঞ্চের দিকে মুখ করে বসে তিনি। মাটির খুব কাছে তার জীবনবীণার তারটি বেঁধে নিয়েছেন। মানুষের পথ যেটুকু তার কালের, তার চারপাশের, সেটুকু প্রজ্ঞা, জ্ঞান আর সুরের জলে ধুয়ে তিনি ব্যক্তিক আর নৈর্ব্যক্তিকের ব্যবধান বুদ্ধিদীপ্ত সারল্যে আর সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আমার শিক্ষাগুরু অসিত কুমারের কথা বলছি। তিনি প্রাণপ্রকৃতির কথা ভাবতেন। উত্তরণের উপায় খুঁজে যাওয়াই কাজ, ভেবে গভীর সংকটেও নিরাশ হতেন না। দেশের সেবা করে গেছেন নিজের কাজের পাশাপাশি শত শত তরুণ হৃদয়ে সৌন্দর্য, সততা, নিষ্ঠা আর দায়িত্বের বোধ জাগিয়ে দিয়ে।

একজন অসাধারণ শিক্ষক শিক্ষার্থীর চিন্তার ঘুম ভাঙান, সীমাবদ্ধতা পেরোতে শেখান, উদ্বুদ্ধ করে চলেন জ্ঞানচর্চায়, আত্মবিশ্বাস ভরে দেন অন্তরে। অসিত কুমার স্যারের শিক্ষার্থীরা জানেন কতটা সত্য এ কথা তার ক্ষেত্রে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে আরও যুক্ত থাকত মমতা, আত্মীয়তার বোধ, পরিবারচৈতন্য। তিনি আমাদের বন্ধু ছিলেন। ইংরেজি বিভাগের আনুষ্ঠানিকতার বলয়টি ক্রমে সরল হতো, তরল হতো জলের মতো। সে জল বিশ্ব পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ত, সমুদ্রে গড়াত। মহাকালের সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে নবীনেরা ইতিহাস অনুভব করত; অতীতের সুরে সুর মিশিয়ে জীবনের গান গাইত। শ্রেণিকক্ষ-নাট্যমঞ্চ-জীবন কোনো এক বিন্দুতে এসে একাকার হয়ে যেত। অসিত স্যার-ইউলিসিস-টেনিসন অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতায় মিলেমিশে যেতেন। আমরা শুনতে পেতাম ইউলিসিস ডাকছেনÑ অভিযাত্রাই জীবন; আলস্য, প্রকৃত জীবনযাপনের পথে এক গভীরতর বাধা...। অসিত কুমার আমাদের জাগিয়ে রাখেন; ‘আরাম হতে ছিন্ন করে’ গভীরতর চিন্তাপথে আমাদের ডেকে নেন। তাকে অনুসরণ করে এক অভিযাত্রী দল প্রস্তুত হয়ে যায়। ‘চলার বেগে পায়ের তলায় রাস্তা’ জাগানোর স্পর্ধা তারই দান। কত কত ছেলেমেয়ে যে তার সান্নিধ্যে থেকে বিকশিত হয়েছে! তারা সবাই অনুভব করেন নিশ্চয়ই!


অসহজ যা কিছু, দুরূহ যা কিছু, ‘দেখা যাক’ বলে এগিয়ে চলার ও সফল করে তুলবার জাদুকর অসিত কুমার। সময়কে শ্রদ্ধা করতেন তিনি। স্থূল চিন্তা আর কাজে স্যার বিরক্ত হতেন। কাছের মানুষকে বুঝতে দিতেন; নইলে চুপ করে থাকতেন। অসিত কুমার কর্মযোগী ছিলেন। এমন দেখেছি, একসঙ্গে কাজ করেও অনেকেই তাকে বুঝতে ভুল করেছেন। কোনো কাজ পড়ে রয়েছে বলে স্বভাবসুলভ স্বতঃস্ফূর্ততায় করে ফেলেছেন হয়তো বাড়তি সময় আর শ্রম দিয়ে; অন্যরা ভেবে বসলেন সব একাই করে ফেলছেন তিনি। কিন্তু তার মতো একজন সময়সচেতন, কর্তব্যনিষ্ঠ, বিশুদ্ধতাবাদী মানুষের পক্ষে নানানরকম প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বড় হয়ে থাকত কাজটাই।

সময় পরিভ্রমণ করে জীবনের সত্য আর রহস্য উন্মোচনের অভিযাত্রা চলছে মঞ্চে, চলছে কর্তব্য নির্ণয়; সে অভিযাত্রা অন্তর্লোকেরও। ঐকিক থিয়েটারের প্রযোজনা ‘অন্তর্যাত্রা’র সুরবলয় আমাদের কাল পরিভ্রমণের মাধ্যম আর সত্যানুসন্ধানের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। অসিত কুমার তার প্রজ্ঞা, সংবেদনশীল মন ও মনন নিবেদন করেছিলেন যথারীতি সে কাজেও। নারায়ণগঞ্জকে ভালোবেসেছেন গভীরভাবে। সমৃদ্ধ আর অগ্রসর দেখতে চেয়েছেন শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, চিন্তায়। অনেক ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে এড়িয়ে গিয়ে স্যার নারায়ণগঞ্জেই থেকে গেছেন। ঐকিক থিয়েটারের নবীন সদস্যদের তৈরি করেছেন পরম মমতায়, স্নেহে। কথন আবৃত্তি সংগঠন আর ঐকিক থিয়েটারে অসিত স্যারের আহ্বানে যুক্ত হই। আমার মনে হতো, সাহিত্যের ব্যবহারিক ক্লাসের আয়োজন এসব। কথন আবৃত্তি সংগঠন আমায় একটা দায়িত্ব দিয়েছিল, নারায়ণগঞ্জের শিশুদের আবৃত্তি নিয়ে কাজ করতে হবে। না বুঝে, অকারণ সুর-ঝোঁক ব্যবহার করে, অভিনয় মিশিয়ে আবৃত্তি করার প্রচলিত প্রবণতা বদলে দিতে হবে; শিশুদের চিন্তা উস্কে দিতে হবে কাব্যে-কথায়। স্যারের সঙ্গে আলাপ হতোÑ প্রাণ, প্রকৃতি, দেশ, ভাষা ও সমাজসচেতন হয়ে বিকশিত হতে দিতে হবে শিশুদের। শিল্পের জীবনঘনিষ্ঠতা অনুভব করা যাবে তখনই, যখন নিত্যদিনের কাজে নান্দনিক বোধের সমন্বয় ঘটানো যাবে। জ্ঞানচর্চা নিয়ে তাত্ত্বিক আলাপে খুব কম পেয়েছি তাকে। কেবল দেখেছি কথায়, কাজে, জীবনবোধে একজন পরার্থপর মানুষ অসিত কুমারকে। তার অনুসারী হতে চেয়েছি, চাই।

দায়িত্বের প্রতি এত সৎ-মানুষ দুর্লভ। নিজের অনুভব-অনুভূতি-আবেগের প্রতি সততা তাকে অন্য উচ্চতায় রেখেছে সব সময়। একজন আধুনিক মানুষের আদর্শতম রূপ যেমন হওয়া উচিত, তা স্যারকে ছাপিয়ে যাবে না নিশ্চিত। অসিত কুমার নান্দনিকতার বোধ তার নিত্যদিনের জীবনে চর্চা করেছেন। তাই শিল্পমাধ্যমে তার প্রকাশ এক অনন্য মান ধারণ করেছে। নিত্যদিনের আলাপের সাধারণ, সামান্য বিষয়ও কত অসামান্য হয়ে উঠত তার কথায়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় তার স্বতঃস্ফূর্ততা অতুলনীয়। তার বাগ্মিতা সহজাত, আনন্দময়। অসিত স্যারের বাদনের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, সুর কথা বলতে থাকে, যেটা চেনাশোনা গানের বাণীকে ছাপিয়ে যায়। হাওয়াইয়ান গিটার আর মোহনবীণাতে নিজের উৎকর্ষ আড়ালেই রাখলেন। অন্তর্যাত্রা নাটকের একেবারে শেষের মোহনবীণাতেই কেন্দ্রীভূত হতো সারকথাটুকু; তার আগের অত কথা-কাব্যে-নাট্যেও যেন ততটা নয়। স্যারের প্রিয় গানগুলোর বাদন ধারণের কথা, অন্তত একটা অ্যালবাম তৈরির কথা বলেছি কতবার! স্যার হাসতেন। হাসির ভেতরে কোথাও মৃদু বিষণ্নতা লেগে থাকত। কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দ্যে ডুবে গিয়ে আবার ভেসে উঠতেন, হেসে উঠতেন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। ২০২০-২১ সাল থেকে স্যার নিয়মিত চর্চায় বসছিলেন, একটা-দুটো করে গিটার বাদনের রেকর্ড পাঠাতেন মাঝে মাঝে। স্যার গভীরতর অনুভবে অসাধারণ গাইতেন রবীন্দ্রনাথের গান! আদি রেকর্ড সংগ্রহে আনন্দ ছিল তার।

শিল্পের প্রতি সৎ থাকতে হলে নিবেদন যে লাগবেই, তা তো নিত্যদিনের কাজে, মহড়ায়, শ্রেণিকক্ষে শিখেছি তার কাছে। তিনি সুরের সঙ্গে জীবন বেঁধেছিলেন, শরণ নিয়েছিলেন সুন্দরের। সামান্যেও অসামান্য দেখতে পাওয়া সব নয়নে সহজ নয়। ‘লক্ষ্যাপার’ তার অপার মমতা আর যত্নে বেড়ে ওঠা সংগঠন। শাস্ত্রীয় সংগীতকে জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার এই চাওয়া, তার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, উদ্দীপনা দেখে আমার মনে হতো, স্যার তো সংগীতেরই মানুষ; সবচেয়ে আপন কাজে তিনি ফিরেছেন। লক্ষ্যাপারের যুগপূর্তি নিয়ে কত পরিকল্পনা ছিল তার! কত দুর্যোগে তা পিছিয়ে গেল, সংক্ষিপ্ত করা হলো; তবু হলো। স্যারের স্বপ্ন ছিল লক্ষ্যাপার বিদ্যালয় হবে শীতলক্ষ্যার তীরে। আবাসিক বিদ্যালয়ে শিশুরা রোজ ভোরে একসঙ্গে কণ্ঠ সাধবে, তারপর সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্রাম; বিকালে আবার শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা। জলে নেমেও হবে কণ্ঠের প্রশিক্ষণ; প্রাণায়াম, যোগব্যায়াম হবে নিয়মিত। স্যার হিসাব করতেন মাসে, বছরে কত ঘণ্টা কণ্ঠ সাধা হবে তবে প্রতিটি শিশুর। আমরা সবাই মিলে স্কুলটা করব, তেমন কথা তো হয়ে আছে! সুন্দর আর সূক্ষ্ম অনুভবকে ‘জীবননাথ’ করেছিলেন স্যার। ৯ মে ২০২৩ ভোরে তিনি আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন বটে কিন্তু বেঁচে আছেন ও থাকবেন তার বিস্তৃত কর্ম অধ্যায়ে।

 যে মানুষটি চারপাশের সব সুন্দর উদ্‌যাপন করেন, ভালোবেসে কাজ করেন, নিজের কাজের ব্যস্ততা একপাশে সরিয়ে অন্য কারও আহ্বানে অন্য কাজে মগ্ন হন পরম আনন্দে, চলে যাওয়ার ডাক তার কাছে কী গভীর ব্যথার! স্যার বলতেন না। হয়তো কেমো চলছে, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কত বিষয়ে কথা বলছেন, হাসছেনও, কিন্তু গভীর বিষণ্ন চোখগুলো আপনজন আর আপন কাজগুলোর কথা বলতে থাকত।মোহনবীণাটি বেজে চলেছে। লক্ষ্যাপার শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলন, ঐকিক থিয়েটার, কথন আবৃত্তি সংগঠনের কর্মীদের চিত্তবীণার তার যেন তারই সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে যায়। সন্ধ্যায় সবার যখন বাড়ি ফিরবার কথা, আমরা তখন ঐকিক থিয়েটারের মহড়াকক্ষে ব্যায়াম আর প্রাণায়াম সেরে কণ্ঠ সাধতাম। প্রস্তুতি নিতাম নাটকের।

প্রার্থনার মতো হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে নাট্যচর্চা; আসলে অসিত স্যার করে তুলেছিলেন। অমেয় আনন্দের উৎস ছিলেন তিনি আমাদের জীবনে। আগুন-মানুষ নাটকের মহড়া চলছে। পাশেই আগুন লাগল কোথাও। স্যার আমাদের কয়েকজনকে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঘিরে থাকা ভিড় পার করিয়ে দিয়ে ছুটলেন বাকিদের কাছে। কথা প্রসঙ্গে একদিন স্যার জানলেন, শিশুদের নিয়ে আমরা একটু অন্যরকম কাজ করেছি, হয়তো সামান্যই সে কাজ। স্যার বললেন অন্যদেরÑ ‘কতটা প্যাশনেটলি কাজ করলে শিশুদের কাজ এমন করে করা যায়, বলো?’ আমার বর একদিন স্যারকে আমার সম্পর্কে অভিযোগ করেছিলেন, আমি মধ্যরাতে স্নান করে নিজের কাজ করতে বসি, তাই আমার গলা বসে থাকে। ভাবলাম স্যার বকবেন। আমায় চমকে দিয়ে স্যার চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলে উঠলেন, ‘তাই না? মধ্যরাতে স্নান সেরে মনে হয় যেন আরেকটা দিন শুরু হলো! কত কাজ করা যায় মন দিয়ে!’ এমনি করে তিনি আমাদের খেপিয়ে বেড়াতেন। আবার নিজেই বলতেন, ‘আমি জানতাম, পাগলটা এ কাজ করেই ছাড়বে।’ স্যার আমার ওপর আস্থা রাখতেন। আমায় বিশ্বাস করতেন।

একদিন ঝোড়ো বাতাসে খেয়া পেরিয়ে ঐকিক থিয়েটারের মহড়ায় গেছি বন্দরের এক স্কুলে; বিদ্যুৎ নেই; আবার সবাই পৌঁছাতেও পারেননি। একটা মোম জ্বেলে চারধারে বিন্দু, রেখা হয়ে আমরা কজন বৃত্তে পৌঁছেছিলাম। আমরা ঝড়ের সঙ্গে সুর সেধেছিলাম। সেই থেকে বুঝি ঝড় আমাদের সাথি হতে চেয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল! স্যার নেই, জেনেছি। সত্যি হলো এই, মেনে নিইনি এখনও। এ লেখায় ‘স্মৃতি’ আছে, বাক্যের বোধগম্যতার চেয়ে ‘কাল’-এর প্রভাব আছে, কিন্তু অসিত কুমার অতীত নন মোটেই। অনেককে নিয়ে জীবন তার! একটু আগে পেরিয়ে যাওয়া তো মৃত্যু নয়। হয়তো কেবল চলার ধরনটি বদলে ফেলা! অসত্য থেকে সত্যে, তমসা থেকে আলোয় উদ্ভাসিত করবার সাধনা যার, তিনি মৃত্যু পেরিয়ে চললেন অমরত্বের পথে। তার চিন্তাস্রোত বহমান থাক তার সান্নিধ্যধন্য সব স্বজনের অন্তরে, কর্মে।

  • শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মী 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা