× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ন্যায়বিচার

কাটে না আঁধার আর অপেক্ষার প্রহর

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৩ ১০:৪৪ এএম

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

শুরুতেই উদ্ধৃত করি বিশ্বসাহিত্যের এক ধীমানকে। তিনি পাওলো কোয়েলহো। পাওলো ব্রাজিলীয় ঔপন্যাসিক-গীতিকার। ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরোতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বিখ্যাত উপন্যাসের নাম ‘দ্যা আলকেমিস্ট’ এবং সেটি ৮০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘অপেক্ষা করাটা কষ্টকর, ভুলে যাওয়াটাও কষ্টকর; কিন্তু কোনটা করা উচিত, না বুঝতে পারাটা আরও বেশি কষ্টের।’ পাওলোর এই অমর উক্তির প্রতিছায়া আমাদের সমাজজীবনের পরতে পরতে যেন ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে বিচারপ্রার্থী অনেকের অন্তর্জ্বালার প্রেক্ষাপটে এর অমিল খুঁজে পাওয়া ভার, খুব ভার।

এই গৌড়চন্দ্রিকার কারণ সংবাদমাধ্যমের অনেক খবরের ভেতরের একটা খবর। ১৭ নভেম্বর একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের একটি খবরের শিরোনাম, ‘বিচারের আশা আর করেন না, ২০ বছর ধরে ঘুরতে ঘুরতে এখন ক্লান্ত বিমল শীল’। কে এই বিমল শীল? ২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর। ওই রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর শীলপাড়ায় বিমলদের বাড়ির সবাইকে ঘরে আটকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন দেওয়া হয়। কোনোরকমে বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন তিনি। ঘটনাচক্রে পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও একসঙ্গে মা-বাবা, ভাই-বৌদিসহ ১১ স্বজনকে হারান বিমল। কি ভয়াবহ দুঃসহ চিত্র! এ ঘটনা তখন দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত-সমালোচিত হয়। তখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বাঁশখালী ছুটে গিয়েছিলেন। তখনকার বিরোধী দলের নেতা আজকের প্রধানমন্ত্রী হয়তো বিমলকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বর্বরতার বিচার হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আদালতে যাতায়াতে বিমলের পায়ের অনেক জুতা ক্ষয়ে গেছে, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন; তবুও বিচারের বাণী এখনও কাঁদছে নিভৃতে! ওই মর্মন্তুদতার পর শীলপাড়া ছাড়েন বিমল। তখন থেকে তিনি চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করছেন। শীলপাড়ার নিহত পরিবারের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় এবং প্রতিবছরের মতো এবারও ১৮ নভেম্বর সেই স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেওয়া হয়েছে। বিমলরা সান্ত্বনা খোঁজেন এর মাঝেই!


বিলম্বিত বিচারকে অবিচারের শামিল বলা হয়। বিচারপ্রক্রিয়া যত বিলম্বিত হয়, ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা ততই হ্রাস পায়। এজন্যই দ্রুত বিচার আবশ্যক। কোনো কোনো মামলার নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচারের অর্থাৎ ফাস্টট্র্যাক আদালতের সংস্থান করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অনেক স্পর্শকাতর মামলা, যেগুলো সমাজে বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, এমন অনেক মামলাই পড়ে আছে হিমাগারে! বাঁশখালীর ১১ হত্যা মামলাটি এরই একটি খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। দৃষ্টান্ত আরও আছে। এক দশকেরও বেশি সময়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় ইতোমধ্যে একশ একবার পিছিয়েছে! আমরা জানি, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি খুনের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ‘আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে’। কিন্তু এক দশকের বেশি সময়েও আটচল্লিশ ঘণ্টা শেষ হলো না! এ-ও অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকারও বলেছিলেন, ‘তদন্তের ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে’। অথচ হত্যাকান্ডের এগারো বছরের মাথায় তদন্ত সংস্থা র‍্যাবের দায়িত্বশীলদের মুখে আমরা শুনলাম সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতি, ‘যত দ্রুত সম্ভব আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’

কী বিস্ময়কর! স্মরণ করি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে। তনু খুন হওয়ার পর ইতোমধ্যে গড়িয়ে গেছে সাত বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু আজ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তদন্তকারীরা তনু হত্যাকাণ্ড তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি করতে পারেননি! তনু হত্যাকাণ্ডের পরও এ পর্যন্ত চারটি সংস্থা মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়েছে। কিন্তু ফল শূন্য! আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকুতি যেন ‘অরণ্যে রোদন’। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, বাঁশখালীর ১১ হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও বারবার তদন্ত সংস্থার হাতবদল হয়েছে কিন্তু রহস্য উন্মোচিত হয়নি, কাটেনি আঁধার। এই আঁধারের মধ্যেই বিচারপ্রার্থীরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন আর কেউ কেউ হয়তো ব্রাজিলীয় ঔপন্যাসিক ও গীতিকার বিশ্বাসাহিত্যের ধীমান পাওলো কোয়েলহোর সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করে সান্ত্বনা খোঁজেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’Ñ তা-ই যেন আমাদের সমাজবাস্তবতার অনাকাঙ্ক্ষিত অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি সেই কবে বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বা অবিচারের বিষয়ে তার কবিতায় এই খেদোক্তি করেছিলেন। অসত্য নয়, আমাদের দেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারকাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নিরপেক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতা শুধু আঁধারই ঘনীভূত করেনি, বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। খ্যাতিমান ইংরেজ কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক ডেভিড হার্বার্ট রিচার্ডস লরেন্স যিনি ডি. এইচ. লরেন্স নামে সমধিক খ্যাত তিনি বলেছেন, ‘নীতিশাস্ত্র-ন্যায় ও ন্যায়বিচারের মূলনীতি ও উপাদান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না। এটি চিরকালের জন্য একই এবং অপরিবর্তনীয়’। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া আমাদের দেশে বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান চিত্রগ্রাহক উইলিয়াম এ গ্ল্যাডস্টোন বলেছেন, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রনায়ক আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের বক্তব্য, ‘দ্য ফার্স্ট ডিউটি অব সোসাইটি ইজ জাস্টিস’। বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের বিচারসংক্রান্ত এই মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায়Ñ সমাজ তথা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আমাদের সংবিধানেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তাছাড়া বিদ্যমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ন্যায়বিচার না থাকলে রাষ্ট্র বিশ্বসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকেÑ এ কথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকও গত ২১ জানুয়ারি বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্র এবং সমাজে এর প্রতিফলন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দৃশ্যমান হয় না কেন? মানবাধিকারের মূল ভিত্তিই যেখানে ন্যায়বিচার সেখানে বিলম্বিত বিচার তো প্রত্যাশার মূলে কুঠারাঘাত বৈ কিছু নয়। ন্যায়বিচার ও সমতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই সঙ্গে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়, এ-ও নিখাদ সত্য। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, সমাজের সব শ্রেণির নাগরিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা বিধান করা। ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’, এই প্রবাদ-প্রবচন আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত।

ফিরে তাকাই একটু পেছনে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন-উত্তর তথাকথিত বিজয়োল্লাসের নামে তখন বিএনপি-জামায়াত জোটের তাণ্ডব এ দেশের বিভিন্ন জনপদে কী ভয়াবহ ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, অনেকের মতো আমিও এর একজন সাক্ষী। একজন নগণ্য সংবাদকর্মী হিসেবে তা প্রত্যক্ষ করেছিলাম পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। প্রয়াত বিজ্ঞানী-শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. অজয় রায়ের নেতৃত্বে একটি মানবাধিকার সংস্থার পক্ষে সংবাদকর্মী হিসেবে তখন কাজ করতে গিয়ে লালমোহন, আগৈলঝাড়া, রামশীলসহ আরও কয়েকটি জনপদে যে বিপন্ন-বিপর্যস্ত মানুষের আকুতি শুনেছিলাম তা কোনো দিন বিস্মৃত হওয়ার নয়। লালমোহনে এক ধর্ষিতা কিশোরী আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে যখন তথ্য দিচ্ছিল তখন আকারে-ইঙ্গিতে তারই পেছনে দাঁড়িয়ে সেই ধর্ষককেও সে আমাদের দেখিয়েছিল! এসব নিয়ে খ্যাতিমান সাংবাদিক ও চিত্রনির্মাতা এবং ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেছিলেন, যা পরে ঢাকায় একটি সেমিনারে প্রদর্শিত হয়েছিল। সেদিন সমস্বরে দাবি উঠেছিল, ‘বর্বরতার বিচার চাই, পাষণ্ডদের ক্ষমা নাই’। কিন্তু না, বিচার আজও হয়নি।

আমাদের অনেকেরই তিক্ত অভিজ্ঞতায় এ-ও আছে, নির্বাচন এলেই (বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন) শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষই নয়, অন্য সম্প্রদায়ের নিরীহ-শান্তিপ্রিয় মানুষরাও সেই ‘ঘরপোড়া গরু’র মতো নির্বাচনকে সিঁদুররাঙা মেঘ ভেবে ভয় পান। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে আর কতদিন! বিচারের বাণী এভাবে আর কত নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে? বিমল শীল থেকে শুরু করে ২০০১-এর ক্ষতচিহ্নধারী পূর্ণিমারা কিংবা সাগর-রুনি ও তনুরা এরই মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত। দৃষ্টান্ত আরও আছে, যা নিবন্ধের কলেবরই শুধু বড় করবে। কাটুক আঁধার। আসুক আলো। পেছনের দিকে হাঁটা তো চলতে পারে না। আঁধারে বন্দি থেকে মুক্তির জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা কোনোভাবেই হতে পারে না নিয়তি। যারা মানবাধিকার নিয়ে এত সোচ্চার তাদের কাছে ২০০১ সাল কি বিস্মৃত? তাদের বিদেশি বন্ধুদের চোখ মুদিত?

  • সাংবাদিক ও কবি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা