× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতি

শুধু নির্বাচন নয়, অর্থনীতিও সংকটে

হাসান মামুন

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৩৫ পিএম

 হাসান মামুন

হাসান মামুন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে তীব্র মতপার্থক্যজনিত সংকট চলছে, তা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায়ই তফসিল ঘোষণা হয়েছে। বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের কঠিন পথে। ২৮ অক্টোবরের পর শান্তিপূর্ণ উত্তরণের পথ যেন রুদ্ধ। নির্বাচন একতরফাভাবেই হবে!

একতরফা হয়েও নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলে না হয় কথা ছিল। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর তো আন্দোলন তীব্র করারই পথে বিরোধী দল। একতরফা নির্বাচন প্রতিরোধে অতীতে আওয়ামী লীগ যেভাবে আন্দোলন করেছিল; বিএনপি ও তার মিত্ররা সেভাবে পারছে না অবশ্য। তা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে না। তাতে সরকারে টেনশন আর জনজীবনে অস্থিরতা থেকেই যাবে। ভোটের দিনও হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি থাকবে বলে ধারণা।

এ অবস্থায় একতরফা নির্বাচনে যে হারে ভোট পড়ার কথা, তাও পড়বে বলে মনে হয় না। সরকারের তরফে হয়তো চেষ্টা থাকবে যত বেশি সম্ভব ভোটারকে কেন্দ্রে নিয়ে আসার। অন্তত নিজ সমর্থকদের কেন্দ্রে উপস্থিত করার কিছু কর্মসূচির কথা শোনা যাচ্ছে। তাতেও সারা দেশে উল্লেখযোগ্য ভোট পড়বে বলে মনে হয় না। এ ধরনের নির্বাচনে ভোট খুব কম পড়লে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও কমে যায়; যদিও তা বৈধতা হারায় না। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভোট বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টায় জাল ভোট দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অবশ্য ইতোমধ্যে সাবধান করে বলা হয়েছে, তেমনটি করতে যেন কেউ উৎসাহী না হয়। এরই মধ্যে দুটি উপনির্বাচনে জাল ভোট দেওয়ার কাজে লিপ্ত দলীয় কর্মী, এমনকি নির্বাচন কর্মকর্তার ভিডিও কনটেন্ট ভাইরাল হয়েছে। এতে ক্ষমতাসীন দল, সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিব্রত হওয়ার কথা। তারা তো সবাই মিলে বলছিল, অতীতে যা-ই হোক, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। প্রধান বিরোধী দল অংশ না নিলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, এ কথা তো বলছিল না। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলো না, আবার অনিয়মে ভরে উঠলÑ এমন চিত্র কিন্তু সরকারের বাড়তি সমস্যা হয়ে উঠবে। সঙ্গে নির্বাচনটি গোলযোগপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হলে তা হবে সমালোচিত হওয়ার আরেক কারণ।

প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণে অর্থবহ নির্বাচন চাইছিল যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, তারা কিন্তু নির্বাচনের আগে না হলেও তার পরে এর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। বাংলাদেশের নির্বাচনকে তারা নিছক ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানছে না। বরং মনে করছে, এ নিয়ে তাদেরও কিছু বলার রয়েছে। এটাকে তারা জনগণের মতপ্রকাশের অধিকারের অংশ বলে বিবেচনা করছে এবং বলছে, এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে মানবাধিকারের। তফসিল ঘোষণার পর আন্দোলন বেড়ে উঠে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি গোলযোগপূর্ণ হলে এ খবর কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছড়াবে। সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি খুব কম হলে এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাল ভোটের ঘটনা ঘটলে সেটাও বড় খবর হবে। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে যাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে এবং ইতোমধ্যে নির্বাচন ঘিরে নিয়েছে নানা পদক্ষেপ; তারা সেগুলোকে ‘ইস্যু’ করতে পারে বইকি। বাংলাদেশের নির্বাচনকে তখন আর নিছক ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করা যাবে না।

এখানে যে শুধু নির্বাচন ঘিরে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা তো নয়। অর্থনীতিতেও কিছু সংকট দানা বেঁধে উঠেছে। বিপুল ব্যয়ে সরকার যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, সেগুলোর বর্ণাঢ্য উদ্বোধন চলছে এখন। আর জনগণকে বলা হচ্ছে, সরকারের ধারাবাহিকতা থাকাতেই এসব সম্ভবপর হয়েছে এবং আগামীতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে এ ধারায় উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। এ দৃশ্যের পাশাপাশি জনজীবনে নিত্যপণ্যের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সংকট কিন্তু তীব্র। আশপাশের দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখালেও বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিক ব্যর্থতা।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধারাবাহিক পতনও বড় খবর হয়ে উঠেছে। ডলারের দুষ্প্রাপ্যতায় এর দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, কেউ বলতে পারছে না। মূল্যস্ফীতিতেও ডলারের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব রয়েছে। কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। প্রধান খাদ্যপণ্যের বড় অংশও আমদানি করতে হয়। এখন বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সেগুলোর আমদানিতে শুধু ডলার সংকটের কারণেই খরচ পড়ে যাচ্ছে বেশি। দেশের ভেতর বর্ধিত পরিবহন ব্যয়ও বড় সমস্যা। তাতে ভূমিকা রেখেছে ডিজেলের বড় মূল্যবৃদ্ধি। দেশে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী পরিবহনেও খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং এটাও মূল্যবৃদ্ধির কারণ।

ব্যবসায়ীদের সর্বস্তরে অতিমুনাফার প্রবণতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আছে আবার সিন্ডিকেটবাজির মতো অভিযোগ। মন্ত্রী পর্যায় থেকেও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করা হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আবার বলা হচ্ছে, সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না। জনগণের একটি বড় অংশ সম্ভবত এটা বিশ্বাস করছে। এ সময়ে যে অবরোধ চলছে, তাতে রাজধানীসহ বড় বড় শহরে যান চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও মহাসড়কে যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাত্রীর পাশাপাশি পণ্য পরিবহন হচ্ছে ব্যাহত। ঝুঁকি নিয়ে চালাতে হচ্ছে বলে বেশি ভাড়া দাবি করছে যানবাহন মালিকরা। তাতেও পণ্যসামগ্রীর দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিতে যখন আগে থেকেই আছে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি; তখন আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সবাই। অর্থশাস্ত্রে ‘মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা’ বলে একটা কথা চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই যদি ভাবতে থাকে দাম আরও বাড়বে,  তাহলে সেটা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় অর্থনীতিতে। এ মুহূর্তে গার্মেন্ট সেক্টরে যে অস্থিরতা চলছে, সেখানেও ‘মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা’ একটা ভূমিকা রাখছে মনে হয়।

শ্রমিকদের মধ্যে এ আস্থা তো নেই যে, তাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমে আসবে। বরং উল্টোটাই মনে করছে তারা। সেজন্য চাপ সৃষ্টি করে হলেও ন্যূনতম মজুরি যতটা সম্ভব বাড়িয়ে নিতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তারা ‘অ্যাডজাস্ট’ করে চলতে পারে। তবে এ পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধসহ যেসব ঘটনা ঘটছে, তা আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য অশনিসংকেত।

সাম্প্রতিককালে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতে এমনিতেই রপ্তানি কমে আসার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আমাদের পণ্যসামগ্রী আমদানিকারক দেশগুলোও যে সংকটে নেই, তা তো নয়। সে কারণেও রপ্তানি কমতে পারে। এখন বাংলাদেশের নির্বাচনকে যারা ‘অংশগ্রহণমূলক’ ও ‘মানসম্মত’ দেখতে চায় এবং সেজন্য আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার মনোভাব নিয়ে আছে, তারাই কিন্তু আমাদের রপ্তানি পণ্যের প্রধান বাজার। এদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আর ঋণসহায়তাও পেয়ে আসছি। নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত এবং তাতে অন্যান্য সমস্যা যুক্ত হলে তারা আমাদের বাণিজ্যের জন্য অসুবিধাজনক পদক্ষেপ নিতে পারে না, তা কিন্তু নয়।

তেমনটি ঘটলে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলেও রপ্তানিতে একটা ধসের শঙ্কা রয়েছে। তেমন কিছু না ঘটলেও গার্মেন্ট খাতে ইতোমধ্যে যা ঘটছে, তাতে সময়মতো পণ্যসামগ্রী তৈরি করে পাঠাতে আমাদের উদ্যোক্তারা ব্যর্থ হলে ‘বায়ার’রা হতাশ হবে। এ অবস্থায় সরকারকে গার্মেন্ট খাতে সৃষ্ট পরিস্থিতিও দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে হবে এবং শুধু কড়া বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন দমনে ‘অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ’ করা হলে সেটাও আমাদের রপ্তানি বাজারে দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে তাদের তরফে কিছু প্রশ্ন কিন্তু তোলা হয়েছে, যেহেতু শ্রম অধিকার বিষয়ে তারা আর যেকোনো মহলের চেয়ে বেশি স্পর্শকাতর। নির্বাচন ঘিরে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলায় প্রশাসনের বাড়াবাড়িও তাদের অপছন্দের বিষয়। সহিংস আন্দোলনে বিরোধী দলকে নিরুৎসাহ করার পাশাপাশি তারা সরকারকেও বলছে এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে।

কথা হলো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে যে শ্লথগতি চলছিল, এমন পরিস্থিতি সেটাকে আরও শ্লথ করবে। বিদেশি ঋণছাড়ও বেশি ঘটবে না। উৎপাদন আর রপ্তানি আয় কমার ধারাও থাকবে অব্যাহত। ডলার বাজারের অস্থিরতায় কমবে না হুন্ডির ব্যবহার। রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিও ভালো হওয়ার কারণ নেই। সরকার টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিতে পারবে না এমন মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি হবে ধীর। তাতে এ সম্পর্কিত ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। এদিকে নির্বাচন ঘিরে সরকারের ব্যয় বাড়লেও দুর্ভাগ্যজনক হবে যদি সেটা অগ্রহণযোগ্য হয়। অল্প বিরতিতে নতুন করে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের অভিজ্ঞতাও তো আমাদের রয়েছে।

  • সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: protidinerbangladesh.pb@gmail.com

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: pbad2022@gmail.com

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: pbonlinead@gmail.com

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: pbcirculation@gmail.com

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা