মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ
ম্যাথু বি আর্নল্ড
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ০০:৪০ এএম
আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ০০:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
গত কয়েক দিনে
মিয়ানমারের অবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। জান্তাবিরোধী বিদ্রোহী যোদ্ধারা ইতোমধ্যে
দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে। চীন সীমান্তের সঙ্গে জান্তা সরকারের
সংযোগ এখন বন্ধ। অপারেশন-১০২৭-এর অধীনে দেড়শর বেশি সামরিক আউটপোস্ট দখল করে নিয়েছে।
জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। অপারেশন-১০২৭-এর পেছনে
রয়েছে বড় ইতিহাস। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতেই মিয়ানমারে মিলিটারি ক্যু পরিচালিত হয়। ৩২
মাস ধরেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ফল তারা ইতোমধ্যে পেতে শুরু
করেছে। অপারেশন-১০২৭-এর মাধ্যমে জান্তা সরকারের পতনও ত্বরান্বিত হতে শুরু করেছে। এই
আঙ্গিক থেকে বলা যায়, অপারেশন-১০২৭ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। বলা যেতে পারে, এই প্রক্রিয়ার
মাধ্যমেই মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
সংঘর্ষময় পরিস্থিতিই
মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছে। একনায়কতান্ত্রিক সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ বিক্ষুব্ধ
বহুদিন ধরেই। দেশটিতে আগেও একাধিকবার গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ২০২১ সালে যে বিদ্রোহের
শুরু তাকে কোনোভাবেই অতীতের ধারাবাহিকতা বলা যাবে না। বরং অভ্যুত্থান বলতে যা বোঝায়
এটি ছিল তা-ই। অতীতে জান্তা সরকারের শাসনব্যবস্থা থেকে সাধারণ মানুষও বের হয়ে আসতে
চেয়েছে। কিন্তু তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি সেভাবে। তবে জান্তা সরকারের শাসন থেকে
বের হয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা এখানে বড় প্রভাব রেখেছে। সুদান কিংবা ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার
প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হওয়ার আগেই ক্ষমতাসীনরা পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে
যেহেতু প্রতিরোধ বহু আগে থেকেই ছিল, তাই জান্তা সরকার কিছুটা বেকায়দা অবস্থায় রয়েছে।
জান্তা সরকারের পক্ষে এখন পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহারের পথ অত
সহজ হবে না। বরং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের বিতৃষ্ণা ও বিক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ্য
রূপ পাচ্ছে। অপারেশন-১০২৭-ই তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অবস্থাদৃষ্টে
এ কথা স্পষ্ট, মিয়ানমারে জান্তা সরকারের পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে
তারা বারবার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতিও কম হচ্ছে না। এই ক্ষয়ক্ষতি
পূরণের পর্যাপ্ত রসদও তাদের নেই। সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ১৮ মাস ধরেই চলমান।
২৭ অক্টোবর থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইলেও তা পারেনি।
আর পারেনি বলেই জান্তা সরকারের নাজুক অবস্থা আরও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর
রিজার্ভ সংকটও বাড়তে শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেশি হলেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ
নিতে না পারাই বলে দিচ্ছে, জান্তা সামরিক শক্তি এখন অন্তসারশূন্য।
জান্তা সরকারের
পতনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের আরেকটি বড় কারণ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। নাপিতায়ে তাতমাদাও জাদুঘরের
প্রদর্শনীতে দেখানো হয়, মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যারা নিতে পারে তারাই
বিজয়ের হাসি হাসে। পার্বত্যচূড়া দখলের মাধ্যমে যুদ্ধেও বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। ছোটখাটো
যুদ্ধও অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়। ফলে জনবল থাকাই এখানে মুখ্য বিষয় নয়। অবস্থানগত ও কৌশলগত
সুবিধাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। মিয়ানমারের এই প্রতিরোধ সংখ্যালঘু জাতিসত্তা
ও অন্যান্য প্রতিরোধীদের সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি
তাদের এত বড় প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে। তবে বহু আগে থেকেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে
প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। তা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে।
যুদ্ধ এখনও শেষ
হয়নি। কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি ক্রমেই প্রতিরোধীদের দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায়ের এই মুহূর্তে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এই যুদ্ধ পরিণতি পেতে হলে কিছু প্রস্তুতির
বিষয় রয়েছে অবশ্যই। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রতিরোধীরা সহানুভূতি পেতে পারে। দেশটিতে
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার স্বার্থেই এই যুদ্ধের অবসান জরুরি।
জান্তা সরকারের নিজস্ব শান্তিপ্রক্রিয়া এবং নিজস্ব ভঙ্গিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ফলে ইতোমধ্যে
দেশটিতে একাধিক সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার বিষয়টিকে
এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুধাবন করতে হবে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে
যা ঘটছে তার একটি নিরপেক্ষ সমাধান জরুরি। যদি অন্য কোনো দেশ সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্ত
হতে চায়, তাহলে তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। পরিবর্তন হতে
হবে ইতিবাচক। ঘটনার মোড় যেন গণতান্ত্রিক পন্থার দিকেই এগিয়ে চলে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই
সহযোগিতা করতে হবে।
মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ এখনও নির্ধারিত হয়নি। বিশ্ব সম্প্রদায় এখনও এ বিষয়ে দ্বিধান্বিত রয়েছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন জরুরি। দীর্ঘদিন থেকেই নিপীড়িত মানুষ দুর্বার আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তা এখন বাস্তব একটি রূপ পরিগ্রহ করতে শুরু করেছে। অপারেশন-১০২৭-এর মাধ্যমে এই রূপায়ণ সম্ভব। পৃথিবী ক্রমশ এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। বিভাজন খণ্ডবিখণ্ড করে তুলছে সবকিছু। জান্তা সরকার একসময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপশাসনের অবসানের বিষয়টির প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। এমনকি মিয়ানমারের অনাগত ভবিষ্যৎ যেন স্থিতিশীল ও সুন্দর হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে বিশ্ব সম্প্রদায়কেই।
মিয়ানমারের ইরাওয়াদি পত্রিকা থেকে
সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন