সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:৩২ পিএম
আমরা জানি, মানব পরিবারের সব সদস্যের জন্য সর্বজনীন, সহজাত, অহস্তান্তরযোগ্য
এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকারই হলো মানবাধিকার। এটা একমাত্র অধিকার যা প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য।
অভিযুক্ত কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দিয়ে আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত না
হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে গণ্য করার নীতিও সর্বজনীন এবং সর্বকালীন। কিন্তু বিনা
বিচারে চৌদ্দ মাস আটক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরার কারাভোগ
মানবাধিকারের প্রসঙ্গ জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসে। ৯ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কারাভোগে খাদিজার শিক্ষাজীবন একদিকে চরম অনিশ্চয়তার
মধ্যে পড়েছে, অন্যদিকে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। ২০২০
সালের ১১ ও ১৯ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানীর কলাবাগান ও নিউমার্কেট থানায়
খাদিজার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। ফেসবুক ও ইউটিউবে ‘হিউম্যানিটি ফর বাংলাদেশ
ওয়াজ লাইভ’ নামে একটি অনুষ্ঠান করার জন্য দায়ের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী
প্রচারণার অভিযোগ আনা হয়। ইতোমধ্যে খাদিজার জামিনের আবেদন আদালত দুবার নামঞ্জুর করেছেন।
কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বন্দি খাদিজার মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য
আগামী ৩০ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখছি, খাদিজার
মুক্তির দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা
কর্মসূচি পালন করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও তার মুক্তির দাবি
জানিয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দাবিও
একই।
আমরা এও জানি, বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা
করা। অপরাধীকে আইনে নির্দেশিত সাজা প্রদান ও নিরপরাধকে মুক্তি দেওয়াই সর্বজনীন অনুশীলন।
খাদিজার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত দণ্ড দেবেন। কিন্তু বিনা বিচারে
একজন মানুষ দিনের পর দিন কারাভোগ করবেন, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিনা বিচারে
বছরের পর বছর কারাভোগ করার অনেক নজির আমাদের সামনে আছে। বিবাদী জামিন পাচ্ছেন না, ফরিয়াদি
বিচার পাচ্ছেন না, আদালত সাক্ষী পাচ্ছেন না, পুলিশ আসামি খুঁজে পাচ্ছে নাÑ এরকম দৃষ্টান্তের
অভাব নেই। আবার অনেকেরই মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না, মুক্তিও পাচ্ছেন না। প্রক্রিয়ার
দীর্ঘসূত্রতার বৃত্তে আটকে আছেন। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ভুল আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার
হয়ে জেল খাটছেন এমন খবরও ইতোমধ্যে কম উঠে আসেনি। আমরা মনে করি, বিনা বিচারে কারাভোগ
কিংবা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও আইনি সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কারও কারও উদাসীনতা
কিংবা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কাউকে বিড়ম্বনার শিকার হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত।
সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন না হলেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল
মহলগুলোর বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যদের কারণে যে পরিস্থিতি
তৈরি হয়, তা শুধু মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয় আইনের শাসনেরও পরিপন্থি। নীতি ও আইন যে সমার্থক
নয়, তা আমাদের দণ্ডবিধির কিছু কিছু ধারার দিকে তাকালে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়Ñ এমন বক্তব্য
অনেক আইনজীবীর। আইনের অপব্যবহার নিয়েও ইতোমধ্যে কথাবার্তা কম হয়নি। তা ছাড়া কারাবন্দি
কেউ কেউ চিকিৎসাসহ মানবাধিকারের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও নতুন নয়। বন্দিদের
প্রতি কারা কর্তৃপক্ষের যেমন যথাযথ মানবিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি
অভিযুক্ত যে কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গঠনের ক্ষেত্রেও পুলিশের স্বচ্ছ ভূমিকা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বন্দি বা আটক ব্যক্তির যথাযথ আইনি সহায়তা কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ায়
স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি তার অধিকারের সুরক্ষার ব্যাপারে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব
পালন শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, আইনেরও নির্দেশনা। আইনি সহায়তা, অধিকারের সুরক্ষা, চিকিৎসা
এবং অন্য অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে।
আমরা খাদিজাসহ বিনা বিচারে আটক প্রত্যেকের ব্যাপারে রাষ্ট্রশক্তি
এবং আইনি সংস্থাগুলোকে যথাযথ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানাই। আমাদের সামনে এমন নজিরও আছে,
বিনা বিচারে কেউ আটক এমন সংবাদ প্রকাশের পর আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা
নিয়েছেন। খাদিজার ব্যাপারে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে জগন্নাথ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বিষয়’ বলে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত
করেছেন, তাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করব, মাসের পর মাস বিনা বিচারে
আটক খাদিজাতুল কুবরার মামলাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে আইনি প্রক্রিয়া নির্মোহ
ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গতিশীল করতে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার
নিশ্চিতকল্পে আদালতেরও আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করি।