রাজনৈতিক সংকট
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৩ ০০:০৯ এএম
৩ নভেম্বর ‘অর্থনীতি এবার
ধুঁকছে আন্দোলনের চাপে’ শিরোনামে
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতির
কারণে দেশের নাজুক অর্থনীতি
আরও সংকটময় পরিস্থিতির দিকে
এগিয়ে চলেছে। বিদেশি
বিনিয়োগকারীরা শঙ্কায় রয়েছে’। দেশে
হরতাল-অবরোধ চলাকালে অর্থনীতির
বিভিন্ন খাত নানামুখী চাপে
থাকবে এটিই তো স্বাভাবিক। পরিবহনব্যবস্থা চরম প্রতিবন্ধকতার
মুখে পড়ায় নিত্যপণ্যের বাজার
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে
তুলছে। চলমান হরতাল-অবরোধে
চাপে রয়েছে তৈরী পোশাক
খাতও। বিরোধী পক্ষের
হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মাঝে
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন
করছেন পোশাকশ্রমিকরা।
তাদের একাংশ ইতোমধ্যে কাজে
ফিরলেও মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি
এখনও সুরাহা না হওয়ায়
উত্তেজনা কমেনি। সংকটময়
পরিস্থিতিতে রয়েছে তৈরি এই
শিল্পও। অর্থনৈতিক সংকটের
এখানেই শেষ নয়।
ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বিনিময়ে কমছে টাকার
মান। চলতি বছর
ডলারের বিপরীতে টাকার মান
১০ টাকা কমেছে।
চলমান হরতাল-অবরোধ দেশের
অর্থনীতি শ্লথ করে দেওয়ার
পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের পথ
রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
সংকট যত দিন বিরাজ
করবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিপদ
ততই বাড়বে। তবে
আমাদের প্রত্যাশা, সংকটময় পরিস্থিতির
দ্রুত অবসান হবে।
সংঘাত-সহিংসতার পথ নয়
বরং আলোচনায় বসে সংকট
নিরসন করা জরুরি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি
অর্থনীতির নীতি নির্ধারণ ও
এর সুষ্ঠু প্রয়োগে বাড়তি
মনোযোগও জরুরি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক
অভ্যন্তরীণ ছয়টি এবং বাইরের
তিনটি কারণে অর্থনীতি ধুঁকছে
বলে প্রতিবেদন প্রকাশ
করে। অর্থনৈতিক সংকটের
বিষয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান দেরিতে
উপলব্ধি করেছে। অতীতে
এ স্তম্ভেই একাধিকবার সংকটের
কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। অনেকেরই হয়তো স্মরণে
আছে,
নিকট অতীতেও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং
করোনা মহামারি-পরবর্তী সংকটের
কথাই বেশি বলত।
অথচ আমাদের অভ্যন্তরীণ সংকটও
যে ছিল, তা তেমনভাবে
বলা হয়নি। এই
অভ্যন্তরীণ সংকটের নিরসন ঘটিয়ে
অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল করার
জোরদার উদ্যোগ নেওয়া খুব
জরুরি ছিল। এও
বলেছিলাম, সময় যত এগিয়ে
যাবে সংকট আরও ভয়াবহ
আকার ধারণ করবে।
চলমান রাজনৈতিক সংকট যেমন
অর্থনীতি সুসংহত করার পথে
প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, তেমন জনজীবনেও
বৈরী ছায়া পড়েছে।
সমস্যা হলো, নীতিনির্ধারক ও
নীতির বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল
সংস্থা অনেক দেরিতে বিষয়গুলো
উপলব্ধি করেছে। আমাদের
অভিজ্ঞতায় আছে, দেরিতে উপলব্ধি
করার পর তারা চটজলদি
কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এসব সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে
পর্যবেক্ষণ না করে নেওয়ার
ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা
দেখা দেয়। শুধু
তাই নয়, সিদ্ধান্ত ও
পরিকল্পনায় ঘাটতিও থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অর্থনীতির
যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত
করেছে তা অজানা নয়। কিন্তু সমস্যা চিহ্নিত
করলেই হবে না।
সমস্যা নিরসন ও সমন্বয়ের
প্রক্রিয়াও বাতলে দেওয়া জরুরি। সঠিক প্রক্রিয়ার পথ
বাতলে দিলে সমন্বয়ের পথও
উন্মুক্ত হয়।
অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত
সমাধানের পরিকল্পিত উদ্যোগ
দ্রুত নিতে হবে।
পাশাপাশি যেকোনো সমস্যার গভীরে
গিয়ে মূল সমস্যা চিহ্নিত
এবং এর নিরসন করা
জরুরি। অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন
সময় সংকট নিরসনে নানা
সুপারিশ করেন। তাদের
সুপারিশ আমলে নিয়ে সমন্বয়
ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাইকরণ নিশ্চিত
করা যেতে পারে।
যেকোনো পদক্ষেপই নিতে হবে
সমন্বিত উপায়ে। তথ্যভিত্তিক
সমাধান এবং পরিকল্পনা প্রণয়নের
পথ সহজ রাখতে হবে। যে কোনো দায়িত্বশীল
প্রতিষ্ঠানের একার ওপর দায়
চাপিয়ে দিলে সংকট মেটে
না। বাংলাদেশ ব্যাংককে
মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে
আরও সতর্ক হতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের
নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রতিষ্ঠানকে তারা
নজরদারির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত
করবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের
দায়বদ্ধতা নির্দিষ্ট হবে
এবং তাদের জবাবদিহিতা ও
কার্যপদ্ধতি হবে সমন্বিত।
এভাবেই আমাদের অর্থনীতি সুসংহত
করা যেতে পারে চলমান
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের
প্রেক্ষাপটে। রাজস্ব আদায়
এবং ব্যবস্থাপনার জন্য
এনবিআরকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার
জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ
অধিদপ্তর রয়েছে। বাণিজ্য
নীতিমালা এবং দায়িত্বশীল সংস্থার
জন্য সবকিছুই স্পষ্টভাবে উল্লেখ
আছে। আমরা দেখছি, প্রায়
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতামত
দিয়ে থাকেন, অথচ সমন্বয়ের
মাধ্যমে সংকট নিরসন করা
কঠিন কিছু নয়।
সমন্বয়হীনতাও অর্থনৈতিক সংকটের
জন্য দায়ী।
৬ নভেম্বর প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ ‘এবার বিদেশ থেকে
দুর্নাম কুড়িয়ে আনল সোনালী
ব্যাংক’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি
আর্থিক খাতে অনিয়মের ফের
প্রকট চিত্র তুলে ধরেছে। চলমান রাজনৈতিক সংকটের
কারণে আর্থিক খাতে অনিয়মের
বিষয়টি রয়ে যাচ্ছে চোখের
আড়ালে। ব্যাংকিং খাতে
অনিয়ম-দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ
আদায়ে ব্যর্থতা বিষফোড়া হয়ে
দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ
আদায়ের ক্ষেত্রে সময়োপযোগী নীতিমালার
অভাব রয়েছে। যদি
নীতিমালা ও পরিকল্পনার অভাব
থাকে তাহলে খেলাপি ঋণ
কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি
ঋণ আদায় ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের বিষয়ে ঢিলেঢালা
নজরদারি রাখছে। এমন
পরিস্থিতি বিরাজ করলে খেলাপি
ঋণ আদায় এবং আর্থিক
খাতে অনিয়মের ছায়া সরানো
সহজ হবে না।
ডলারের বিপরীতে ক্রমেই টাকার
মান কমছে। বাজারে
অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে বেশি
দাম দিয়ে ডলার কেনার
পরামর্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংক
দিয়েছে। একটি দেশের
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন পরামর্শ
দিতে পারে কি না, তা-ও
প্রশ্নের বিষয়। সুদহারের
বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা মিলছে
না। বলা হচ্ছে, ট্রেজারি
রেটের ওপর সুদহার নির্ধারিত
হচ্ছে। ট্রেজারির ভিত্তিতে
সুদহার নির্ধারণের বিষয়টি
বাস্তবসম্মত নয়। বাজারের
দর এর তুলনায় অনেক
বেশি। সুষ্ঠু নজরদারিই
শুধু নয়, বরং বিদ্যমান
নীতিমালা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন
করাও অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ
হয়ে পড়ছে। আর্থিক
খাতে অনিয়ম নিঃসন্দেহে একটি
বড় সংকট। রাজনৈতিক
উত্তাপ অর্থনীতির অগ্রগতি
স্তিমিত করে তুলছে।
সঙ্গত কারণেই আর্থিক খাতে
অনিয়মের বিষয়টি আমাদের জন্য
ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে
না।
দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি
জনজীবনে জেঁকে দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজারে স্বাভাবিক
উত্তাপ। বাজারে নিত্যপণ্যের
দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেটকে
দায়ী করা হয়।
এবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে
যুক্ত হলো হরতাল-অবরোধ।
হরতাল-অবরোধে পরিবহনব্যবস্থা বিঘ্নিত
হয়। পরিবহনব্যবস্থা বিঘ্নিত
হলে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত
হবে এটিই স্বাভাবিক।
তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে
মূল্যস্ফীতির বিষয়টি আরও আগের। এ ক্ষেত্রে বাজারে
যেসব ব্যবসায়ী পণ্যের জোগান
দিয়ে থাকেন তাদের অনেকেই
রাজনৈতিক মদদপুষ্ট। অসাধু
রাজনীতিক এবং আমলাদের সঙ্গে
তাদের এক ধরনের সম্পর্ক
রয়েছে। এর ফলে
তারা তাদের মতো করে
বাজারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে
পারেন। পণ্যের দাম
বেঁধে দেওয়ার মতো পরিকল্পনা
নেওয়া হয়। অতীতে
বলেছি, দাম বেঁধে দেওয়াটা
এ মুহূর্তে বাস্তবসম্মত নয়। এর প্রমাণও আমরা
ইতোমধ্যে পেয়েছি। আমদানির
আলু বাজারে আসার পর
আমরা দেখেছি আলুর দাম
কিছুটা কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে
নিশ্চিত করতে হবে, বাজারে পণ্য
কতটুকু আছে। অনেক
ক্ষেত্রেই পণ্যের মজুদ থাকলেও
এর জোগান কেন নিশ্চিত
করা যায় না তার
কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থায় পণ্যের
দামের নিয়ন্ত্রণ কারও
হাতে নেই। পণ্যের
দাম বেঁধে দেওয়া নয়, বরং
প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের
দামের যৌক্তিক মূল্য যাতে
নিশ্চিত করা হয় সেজন্য
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবসায়ীরা তো লাভ
করবেন কিন্তু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল
প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিত করবে তারা
যেন অন্যায়ভাবে ভোক্তার
পকেট কেটে নিজেদের পকেট
স্ফীত করতে না পারেন।
বাজারে ব্যবসায়ীদের অনেকেই পণ্য সরবরাহও নিয়ন্ত্রণ করেন। এদের অদৃশ্য জোটকে বলা হয় সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য দায়িত্বশীলদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা কঠিন সময় পার করছি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। এ সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের বিষয়টি যেমন গুরুত্ব দেওয়া জরুরি তেমন অর্থনৈতিক সংকট নিরসনেও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশ-জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসার বিকল্প নেই। তবে এও সত্য, আলোচনায় বসাই শেষ কথা নয়, এর সুফল দৃশ্যমান হওয়াই হলো মূল বিষয়।