জেলহত্যা দিবস
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৩ ১৫:২৯ পিএম
আধুনিক মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের চরম কলঙ্কময় এক নজিরবিহীন যন্ত্রণাকাতর দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন পরাজিত অশুভশক্তির কূটচক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত-নিষ্পেষিত-বঞ্চিত গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত লাল-সবুজের পতাকার স্বাধীন মাতৃভূমির সামগ্রিক উন্নয়ন অদম্য শক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার অগ্রযাত্রা রুখে দিতেই হিংসদের বুলেটে বঙ্গবন্ধু শাহাদাত বরণ করেন। এটি বিশ্বস্বীকৃত সত্য যে, বাঙালির বঙ্গবন্ধু-বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববাসীর মনন-বোধে চিরন্তন- চিরঞ্জীব। তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। যতই দিন-কাল- সময়-মাস-বছর অতিক্রান্ত হবে বঙ্গবন্ধু অধিকতর জ্যোতির্ময় হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে নবতর অধ্যায়ে চন্দ্রাতপ রূপ পরিগ্রহ করবেন। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের মহিমা এত বেশি গৌরবোজ্জ্বল তা কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের পর দ্বিতীয় কলঙ্কজনক দিন ৩ নভেম্বর। সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অন্যতম বীরসেনানী ও জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। 'বাংলাদেশ অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড' গ্রন্থের রচয়িতা প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তার বইয়ে লিখেন, 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পরপরই জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনাটি এমনভাবে নেওয়া হয়েছিল যাতে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তা আপনাআপনি কার্যকর হয়। এ কাজের জন্য পাঁচ সদস্যের ঘাতক দলও গঠন করা হয়। ঘাতক দলের প্রতি নির্দেশ ছিল পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার পর পরই কোনো নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তারা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করবে। খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটানোর পরই কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। '
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনসহ সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালনায় ছিল অপরাজেয়, সফল ও সার্থক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণার পর মার্চের ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখ হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথম সহসভাপতি, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী অন্যতম সহসভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায়ও তাজউদ্দীন আহমদ দলের সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯- এর গণআন্দোলনের সময় দলের শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি অবস্থায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং এএইচএম কামারুজ্জামান পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টারি দলের সভায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের নেতা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপনেতা, তাজউদ্দীন আহমদ পার্লামেন্টারি দলের নেতা, এএইচএম কামারুজ্জামান সচিব এবং প্রাদেশিক পরিষদে নেতা নির্বাচিত হন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে নির্দেশিত অসহযোগ আন্দোলনেও জাতীয় চার নেতার অনবদ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বঙ্গবন্ধুর আজীবন রাজনৈতিক সহকর্মী জাতীয় চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর স্বৈরচারী পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক গ্রেপ্তার হলে তাঁর অনুপস্থিতিতে গঠিত মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খাদ্য ও ত্রাণমন্ত্রী এএইচএম কামারুজ্জামান দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জাতীয় চার নেতা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে দেশের জনসাধারণকে সুসংগঠিত-ঐক্যবদ্ধ করে অসীম দক্ষতার সমন্বয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিচালনার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে জাতীয় এ চার নেতা সর্বক্ষণ বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনকালে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম বেগবান করেছেন জাতীয় চার নেতা।
জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের পরদিন তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করলেও তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ ছিল ২১ বছর। দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির মধ্যে দুজন এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত চারজনের খালাসের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের খালাসের রায় বাতিল করে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। কিন্তু মামলার পলাতক ১০ আসামিকে এখনও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি তথ্যমতে, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে একজন কানাডায় এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। বাকি আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই। দুজনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ওই দেশ দুটির সঙ্গে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে।
মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাতীয় চার নেতার অবদান জাতি কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছে তার সত্য-বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অতীব জরুরি। স্বাধীন বাংলাদেশ ও মহান স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকাল থেকে দেশদ্রোহীদের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের অব্যাহত ঘৃণ্য ধারাবাহিকতায় জাতীয় নেতারা কীভাবে কুখ্যাত মোশতাক গংয়ের রোষানলে পড়েছিলেন, জাতি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞাত বলে মনে হয় না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় নিরঙ্কুশ-অবিচল আস্থাশীল জাতীয় চার নেতা শত প্রলোভন পদদলিত করে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ন্যূনতম বেইমানি না করে জেলবন্দি থাকা অবস্থায় জীবন বিসর্জনেও ন্যূনতম কুণ্ঠাবোধ করেননি। জাতীয় চার নেতা শুধু জাতীয় বীর নন; দেশপ্রেম-সততা-নিষ্ঠা-নেতার প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বস্ততায় বিশ্বের সমগ্র বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে অতি উঁচুমাত্রিকতায় সর্বোচ্চ বীরের আসনে অধিষ্ঠিত আছেন। সমাজ- সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য- ষড়যন্ত্র বা হত্যার কুৎসিত রাজনীতি কখনও ইতিহাসের সাবলীল ধারা রুদ্ধ করতে পারে না। গভীর শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করি।