রাজনৈতিক সংকট
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৩ ১২:২৭ পিএম
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:০১ পিএম
ড. ফরিদুল আলম
সরকারের
পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজধানীর নয়াপল্টনে
বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে যে ঘটনা ঘটে গেল, এটি দেশবাসীকে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে
আগুনসন্ত্রাসের কথা মনে করিয়ে দিল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ
করবে এই প্রতিশ্রুতিতে পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এটিকে কেন্দ্র করে যা ঘটে গেল,
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এর চেয়ে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল দলটির। আর সেজন্যই
এই মহাসমাবেশ ঘিরে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে ঢাকায়
জড়ো করা হচ্ছিল। দিন শেষে নিহতদের একজন পুলিশ সদস্য। জানা যায় বিএনপি কর্মীদের ছোড়া
ইটের আঘাতে পড়ে গেলে একজন ছাত্রদল নেতা নির্মমভাবে তাকে প্রথমে পিটিয়ে এবং পরে চাপাতির
আঘাতে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। উস্কানি কোন দিক থেকে ছিল, বোধ করি সেটা বলার আর
অপেক্ষা রাখে না। দুপুরে কাকরাইল মোড়ে পুলিশবাহী বাস এবং আওয়ামী লীগ কর্মিবাহী পিকআপ
ভ্যানে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের রেশ একপর্যায়ে গিয়ে পড়ে সেখানে অবস্থিত প্রধান বিচারপতির
বাসভবন পর্যন্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে কাঁদানে গ্যাস এবং অ্যাকশনের
দায়ভার স্বাভাবিকভাবেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরই নিতে হবে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে পূর্বনির্ধারিত শান্তি সমাবেশের ডাক দিয়েছিল।
কোনো সূত্র থেকে এমন দাবি করা হয়নি যে এর পেছনে সরকার বা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কোনো
ধরনের প্ররোচনা রয়েছে। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বিএনপি তাদের প্রত্যাশামাফিক
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারেনি। আর তাই দলটির পক্ষ থেকে পরদিন অর্থাৎ ২৯ অক্টোবর সারা
দেশে সকালসন্ধ্যা হরতালের ডাক দেওয়া হয়। অবাক করা বিষয়, সন্ধ্যার পর তাদের একসময়ের
শরিক জামায়াতে ইসলামীও তাদের পক্ষ থেকে হরতাল আহ্বান করে।
দিন
শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ
করে বলেছেন, সরকার মাস্টারপ্ল্যান করে হামলা চালিয়েছে। এখানে তার বক্তব্য খণ্ডন করার
কোনো অভিপ্রায় নেই। তারপরও বলতে হয় তাদের মহাসমাবেশ শান্তিপূর্ণ না-ও হতে পারে, এ ধরনের
আশঙ্কা থেকেই কিন্তু একেবারে শেষ পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীর ঢাকায় আগমন এবং সমাবেশের
অনুমতি না দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, এ রকম বিবেচনা থেকেই তাদের
সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এখানে বলতেই হয় যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি
নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কুটনীতিকরা যেভাবে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন,
এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি নেতৃবৃন্দ
নিশ্চিতভাবেই এমন কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে সরকার সম্পর্কে তাদের ধারণা
আরও বিরূপ হয়। দুর্ভাগ্য, তাদের প্রত্যাশামাফিক কিছুই হয়নি। দিন শেষে মার্কিন পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে কোনো পক্ষের নাম উল্লেখ না করে সহিংস ঘটনার নিন্দা
জানিয়ে এ ধরনের অবস্থা চলতে থাকলে তাদের প্রস্তাবিত ভিসানীতি প্রয়োগের বিষয়ে হুঁশিয়ারি
দেওয়া হয়।
তবে
এখানে এটাও বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যে বর্তমান সরকারের ওপর খুব একটা সদয় বিবেচনাবোধ
থেকে এ ধরনের বিবৃতি দিয়েছে, সেটাও ভাবার কারণ নেই। সন্ধ্যার পর কয়েকটি গণমাধ্যমের
খবরে প্রকাশ পায় যে বিএনপি কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন জনৈক মার্কিন নাগরিক,
যিনি নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা দাবি করেন, যাকে সেখানে বসে ঢাকার মার্কিন
রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি বর্ণনা করতে শোনা যায় বলে দাবি করেছে
কয়েকটি গণমাধ্যম। পরবর্তী সময়ে মার্কিন দূতাবাস এ ধরনের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। বিষয়টি
যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে ষড়যন্ত্রের ডালপালা অনেক গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে।
এ কথা সবারই জানা যে এই সময়ে এসে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপি বা তাদের সমমনা দলগুলোর
আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন তো দূরের কথা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের
দাবি প্রতিষ্ঠা করারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সুতরাং সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র
ছাড়া পরিস্থিতি অস্থির করা সম্ভব নয়।
সরকারের
পক্ষ থেকে বারবার দেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের এ দেশে অবস্থানকালীন কূটনীতিক শিষ্টাচার
মেনে চলার আহ্বান জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কূটনীতি-সংক্রান্ত ১৯৬১ সালের ভিয়েনা
কনভেনশন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যেসব রাষ্ট্র একে অন্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা
করে চলে তাদের জন্য বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইনের এই কনভেনশনের ৯নং
ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, যেকোনো দেশ কোনো কারণ ছাড়াই প্রেরক দেশের যেকোনো কূটনীতিককে
পারসোনা নন গ্রাটা বা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে তাকে/তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করতে
পারে। এক্ষেত্রে প্রেরক দেশের পক্ষ থেকে ওই কূটনীতিককে ফিরিয়ে না নিলে তার কূটনীতিক
হিসেবে বিশেষ মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের
ক্ষেত্রে যেমনÑ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, কানাডা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা এ ধরনের
অনেক উদাহারণ দেখতে পাই। ২০১৯ সালে কাশ্মির সংকটকালে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার
করেছিল পাকিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া পাল্টাপাল্টি একে অপরের
একাধিক কূটনীতিককে কয়েক দফা বহিষ্কার করেছে। বাংলাদেশের পারসোনা নন গ্রাটার দুই একটি
উদাহরণ থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়নি।
কথাগুলো
বললাম এ কারণেই যে যখন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং সরকারের
স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম হবে তখন নিশ্চিতভাবেই জনস্বার্থে এমন কোনো উদ্যোগ
নেওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি
আরও কতটুকু বদল হলে সরকারের উপলব্ধিবোধে আসবে যে আমরা এক সমূহ বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি,
তা আমার বোধগম্যতার পর্যায়ে পড়ছে না। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের নাম করে এ দেশে অবস্থানরত
কোনো কূটনীতিককে আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় বিষয়ে যখন তখন যেমন তেমনভাবে হস্তক্ষেপ করার
কোনো ব্ল্যাংক চেক আমরা দিতে পারি না। তাই সরকারের প্রতি পরামর্শ থাকবে এ ধরণের ক্ষেত্রে
অতীতে অনেকবার তাদের সতর্ক করা সত্ত্বেও যেহেতু তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি, এক্ষেত্রে
কিছু পারসোনা নন গ্রাটার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃঢ়তা দেখানোর সময় এসেছে। এটাও মনে রাখা
দরকার যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের কূটনীতিকরা যেমনভাবে দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, দেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের কাছ থেকেও আমরা
সেটাই প্রত্যাশা করব।
বিএনপি
এবং তাদের সমমনা দলগুলোর যদি এতই ক্ষমতা থাকত তাহলে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের
আগে তাদের সরকারের পতন নিয়ে আন্দোলন না করে নির্বাচনের জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদের
প্রস্তুত করার জন্য কাজ করা দরকার ছিল। পরিস্থিতি স্পষ্টই বলে দিচ্ছে তারা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের
বাস্তবায়ন করে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়ে কিছু দেশের কাছে বাংলাদেশকে নামমাত্র
মূল্যে ইজারা দিয়ে দেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার বিষয়টি যখন সংবিধান
দ্বারা মীমাংসিত হয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে বিদেশিদের প্রতিমুহূর্তে তাদের নির্বাচনে না
গিয়ে তাদের সহিংস আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করা অনেক রহস্যের জন্মে দেয়। জানা গেছে
এভাবে একের পর এক তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঢাকায় ডেকে এনে দলের কিছু নেতা তাদের পক্ষ
থেকে আর্থিক বিনিয়োগ করছেন। এবারের এই প্রচেষ্টায় তৃণমূলের মধ্যে চরম হতাশা কাজ করবে।
যেহেতু দলটি আগামী নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, এই অবস্থায় কোনো গত্যন্তর
না দেখে যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো শেষ সময়ে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে
ফলাফল আগের নির্বাচনের চেয়ে ভালো হবে– এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
সার্বিক বিবেচনায় দেশের সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়েও জনমনে যথেষ্ট সংশয় এবং শঙ্কা কাজ করছে। বিএনপির মতো দেশের কিছু সুশীল ব্যক্তিও দফায় দফায় বিদেশিদের সঙ্গে বৈঠক করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। সবার প্রতি এটাও পরামর্শ থাকবে, দয়া করে এসব না করে রাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা যদি সরকারের সঙ্গে কথা বলে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করি, যেখানে গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের একটা উপায় বের হয়, তাহলে এটা সবার জন্যই মঙ্গলজনক। সরকার এবং বিএনপি বর্তমানে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে অনড় রয়েছে। এই অবস্থায় নাগরিক সমাজ নাগরিকদের স্বার্থে সরকার এবং বিএনপিসহ অপরাপর দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করলে বহির্বিশ্বে আমাদের মানমর্যাদা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, কিছুদিন আগে নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে হতাশ কণ্ঠে বলতে শুনলাম যে দেশে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। এখানে একটি কথা বোধগম্য নয়, এর মাধ্যমে তারা আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন। যদি বিএনপি এবং তাদের সমমনা কিছু দল নির্বাচনে না আসে, তাহলে কি যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সমীচীন হবে না? ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝি তা হলো, নির্বাচন কমিশনের কাজ সংবিধান মেনে সঠিক সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। কোন দল এলো বা এলো না এটা দেখা নিশ্চয়ই তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সহিংসতা নয়, গণতন্ত্রের স্বার্থে সবার গণতান্ত্রিক আচরণই সব অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে একমাত্র অবলম্বন– এটা স্মরণে রাখা দরকার।