রাজনীতি ও নির্বাচন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৩ ১২:২৩ পিএম
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:০২ পিএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
২৮ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে জনমনের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, এরই মর্মন্তুদ
প্রমাণ পাওয়া গেল। আমাদের স্মরণে আছে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে, অধিকারের
নামে বাংলাদেশে মানুষ পুড়িয়ে মারার বিস্তর ঘটনা ঘটেছে, যা খুব দূর অতীতের ঘটনা নয়।
এবারও এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে এই আশঙ্কা আমাদের ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে যে
রাজনৈতিক পরিস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে তাতে বিষয়টি শুধু আমাদের ভাবমূর্তির জন্যই ক্ষতিকর
যে হচ্ছে তা নয় বরং দেশ-জাতির স্বার্থের জন্যও চরম অকল্যাণকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, রাজনৈতিক
অঙ্গনে সহাবস্থানের বিষয়টি বরাবরই অনুপস্থিত। অথচ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়
সহাবস্থানই মুখ্য বিষয়।
২৮ অক্টোবর রাজপথে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে যে কর্মকাণ্ড
পরিলক্ষিত হয়েছে, বিশেষত ঢাকায় যে মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে এর দায় কোন পক্ষের ওপর বর্তাবে
এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। কারণ অবস্থাদৃষ্টে বিষয়গুলো সচেতন মহলের কাছে অস্পষ্ট
নয়। আমরা লক্ষ করেছি, এবার সাংবাদিকরা আন্দোলনকারীদের নিশানার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর অতর্কিত
আক্রমণ, হাসপাতালে হামলার পাশাপাশি সাংবাদিকদের যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়েছে এবং
পেশাগত দায়িত্বপালনে বাধা দেওয়া হয় এর নেতিবাচক প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য। দেশে সাংবাদিকতার
পথ মসৃণ এমনটি বলার অবকাশ নেই। শুধু রাজনৈতিক শক্তির প্রতিপক্ষই নয়, সমাজবিরোধী শক্তিরও
নিশানায় থাকেন সাংবাদিকরা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২৮ অক্টোবর ফের যে মর্মস্পর্শী
ঘটনার শিকার হয়েছেন অন্তত ২৫ জন সাংবাদিক এই প্রেক্ষাপটে সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে,
যে গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বিরোধী দল থেকে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে সেই প্রত্যয় রক্ষা
করার ক্ষেত্রে তারা কতটা অঙ্গীকারবদ্ধ। ওই দিন পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে
সংঘাত-সহিংসতা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনমনে এক
ধরনের আতঙ্ক ছিল তা আগেই বলেছি। ২৮ অক্টোবরের পর এই ধারণা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পরিস্থিতি
আরও পুষ্ট করে দিল। আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, বেধড়ক সাংবাদিকদের পেটানো হয়েছে এবং
অত্যন্ত নিষ্ঠুর কায়দায় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের এভাবে হামলে পড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবারের ঘটনা
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সহিংসতার মূল টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছেন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা
অর্থাৎ সাংবাদিকরা। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, এর কারণ কী? উত্তর অস্পষ্ট নয়। আমরা
অতীতে যেমন দেখেছি, এখনও দেখছি সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যত বেশি নিষ্ঠার
পরিচয় দেন তত বেশি তারা রক্ষচক্ষু কিংবা অপশক্তির রোষানলে পড়েন। ২৮ অক্টোবর ঢাকার নয়াপল্টন
থেকে শুরু করে কাকরাইল, ফকিরাপুল এবং ঢাকার আরও বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহকালে
তথাকথিত আন্দোলকারীদের নৃশংস হামলার শিকার হন। অতর্কিত হামলাই শুধু নয় তাদের বারবার
হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ও পুলিশ একে অন্যের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
তুলেছে। এই ঘটনায় ফের অতীতের দৃশ্যচিত্র আমাদের সামনে আরও কিছু কিছু উদ্বেগজনক প্রশ্ন
দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নামের সঙ্গে ‘আগুনসন্ত্রাস’ উপাধিটি যে আবারও
যুক্ত হলো এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কারণ ২৮ অক্টোবর দিনে ও দিবাগত রাতে গণপরিবহনসহ
বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনা এরই মর্মন্তুদ
প্রমাণ। নিকট অতীতে অগ্নিসন্ত্রাস দেশের মানুষের সামনে ভয়াবহ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের নামে এই অগ্নিসন্ত্রাস অত্যন্ত ঘৃণ্য এ-ও নতুন করে বলার
অবকাশ রাখে না।
পেশাগত দায়িত্বপালনকালে সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো
হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে অপকৌশলের প্রয়োগের বিষয়টিও নজর এড়ায় না। হাসপাতাল থেকে শুরু
করে গণপরিবহনেও আগুন দেওয়া হয়েছে এবং এবার অতীতের এ ধরনের আন্দোলনের সঙ্গে রাষ্ট্রের
সুরক্ষিত স্থান হাসপাতালে অগ্নিসংযোগের বিষয়টি নতুন বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে ৫২ বছরের ইতিহাসে রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তপ্ততা আরও অনেকবারই প্রকটভাবে
দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম হাসপাতালের মতো জনসেবাকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা
হলো। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নিঃসন্দেহে এই বিষয়টি কতটা ঘৃণ্য এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
নিষ্প্রয়োজন। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা প্রশ্ন রাখতেই পারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ মানবাধিকারের
সবক দেওয়া শক্তিগুলো বিদ্যমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কীভাবে করবে।
মহাসমাবেশ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর বিএনপি ২৯ অক্টোবর সারা দেশে হরতালের
ডাক দেয়। অতীতে হরতালের অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে প্রীতিকর নয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক
ব্যবস্থায় হরতাল সিদ্ধ হলেও সময়ের পরিক্রমায় হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি এখন অপাঙ্ক্তেয়
হয়ে গেছে। আমরা মনে করি, যে বর্বরোচিত ঘটনা ২৮ অক্টোবরকেন্দ্রিক ঢাকায় ঘটেছে এবং দেশের
অন্যান্য স্থানেও কমবেশি পরিলক্ষিত হয়েছে এর পেছনে শুধু উস্কানিমূলক রাজনীতিই নয় বরং
আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে বলেই মনে হয়। ইতোমধ্যে এই রাজনৈতিক
কর্মসূচি বাস্তবায়নকালে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং যে সহিংসতা শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায়
তা এখনও বুঝে ওঠা মুশকিল। একজন সংবাদমাধ্যমকর্মী হিসেবে ধারণা করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে
সাংবাদিকতার পথ আরও অমসৃণ হয়ে উঠবে। কারণ ২৮ অক্টোবর ও পরের ঘটনাবলি আমাদের চোখে আঙুল
দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেন তারা মতপ্রকাশের পথ বন্ধের
পথটিও বন্ধ করায় তৎপর রয়েছেন। আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং এর প্রেক্ষাপট
চলমান রাজনৈতিক সংকটকালে অহরহ সৃষ্টি হচ্ছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে
বিরোধী দল বিএনপি ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল। এই মহাসমাবেশকে কেন্দ্র
করে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগেভাগেই রাজধানীতে অবস্থান
নিতে শুরু করেনÑ এই খবর সংবাদমাধ্যমের। তা তারা করতেই পারেন। কিন্তু এর পেছনে যদি ছক
কষা থাকে নিধনযজ্ঞ কিংবা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তাহলে তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন
বলে স্বীকৃতি দেওয়ারও অবকাশ থাকে না।
২৯ অক্টোবর অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হরতালের ডাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠতে শুরু করে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ নামে পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করে। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে শান্তি সমাবেশে অংশ নিতে ঢাকা ও আশপাশের জেলার নেতাকর্মীরা র্যালিযোগে যোগ দেনÑ এই খবরও সংবাদমাধ্যমেরই। তা ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও ঢাকার আরামবাগে সমাবেশ করেছে। প্রেস ক্লাবে গণতন্ত্র মঞ্চসহ আরও কয়েকটি দল সমাবেশ করে। জামায়াতের নতুন করে মাঠে নামা নিয়েও ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আরও প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীন সাংবাদিকতার কথা যারা প্রতিনিয়ত বলেন তারা কি বলতে পারবেন ২৮ অক্টোবর যে পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে তা কোন গণতান্ত্রিক সূত্রমাফিক সিদ্ধ। আমরা বরাবরই শান্তি চাই, সহিংসতার ছায়া সরাতে রাজনৈতিক সব পক্ষের দায়িত্বশীলতা দেখতে চাই। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দাবি আদায়ের নামে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং এই পরিস্থিতিকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে এর উত্তর আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছেই প্রত্যাশা করি। আমাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সব পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবেন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাধীন সাংবাদিকতার পথটি যাতে রুদ্ধ না হয় এ ব্যাপারে তৎপর হবেন। ২৮ অক্টোবর সহিংসতায় যারা হতাহত হয়েছেন এবং সাংবাদিকদের ওপর যারা হামলে পড়েছিলেন তাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করতেই হবে।