মৎস্যসম্পদ
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৩২ পিএম
ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ
ইলিশের জীবনচক্র বৈচিত্র্যময়। এই মাছ থাকে সাগরে। ডিম দেওয়ার জন্য উজান বেয়ে নদীতে আসে। ডিম দিয়ে আবার সাগরে ফিরে যায়। ইলিশের ডিম থেকে জাটকা তৈরি হয়। জাটকা ইলিশ ৫-৬ মাস নদীতে থাকে। এ সময় পূর্ণ বিকশিত হয়ে সাগরে ধাবিত হয়। কিন্তু নদীতে ইলিশ যখন বড় হচ্ছে, তখন অনেকেই এই জাটকা আহরণ করে থাকে। জাটকা অবস্থায় ইলিশ আহরণের ফলে অনেক সময় নদীতে বড় ইলিশ পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে জাটকা সংরক্ষণ করা গেলে অতিরিক্ত ইলিশ আহরণ সম্ভব। এজন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তারা গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর মোট ২২ দিন জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই ২২ দিনে সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। মা ইলিশ সংরক্ষণের সময়ে কেউ আইন লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে সরকার নানা যুগোপযোগী পরিকল্পনা নিয়েছে। ২২ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইলিশ আহরণে যে সাফল্য মিলবে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অবশ্যই। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে।

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে
বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যকর ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে জেলেদের
ভিজিএফ সহায়তা, বিএফআরআইয়ের গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশ ধরা জালের ফাঁসের আকার সাড়ে
৬ ইঞ্চিতে উন্নীতকরণ, সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা এবং সর্বোপরি সবার অংশগ্রহণের
মাধ্যমে জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ইলিশ ধরা
জালের ফাঁসের আকার বড় করায় অপেক্ষাকৃত ছোট সাইজের ইলিশের পোনা জাল থেকে বের হয়ে যাওয়ার
সুযোগ পাচ্ছে। জালে ধরা পড়লেও বের হওয়ার সুযোগ থাকায় জাটকা ধরা পড়ছে না। নীতিমালা বাস্তবায়নের
কারণে সহজেই বড় হতে পারছে জাটকা। তা ছাড়া ডিম পাড়ার মৌসুমে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচির আওতায় জেলেদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করায় জেলেরাও এখন অনেক ক্ষেত্রে মা ইলিশ/জাটকা
ধরা থেকে বিরত থাকছেন। দেশের প্রায় ৬ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রায় ২০-২৫
লাখ মৎস্যজীবী এবং তাদের পরিবার-পরিজনের জীবন-জীবিকা ইলিশ আহরণ ও বিপণনের ওপর নির্ভরশীল।
দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা
ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়, সরকার সেটা করছে।
এতে একদিকে মৎস্যজীবীদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, অপরদিকে বিকল্প কর্মসংস্থানের
জন্যও নানাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের
সূত্রমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন ৪ মাস ৩ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৯টি জেলে
পরিবারকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি হারে মোট ৫৭ হাজার ৭৩৯ টন ভিজিএফ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২২ সালে মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন ৫৫ হাজার ৪৮৮টি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজি
হারে মোট ১৩ হাজার ৮৭২ টন খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের মানবিক খাদ্য সহায়তা পৃথিবীতে
নজিরবিহীন। অপরদিকে সাগরে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই ৬৫ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায়
অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নদীতে ইলিশের ডিম থেকে উৎপাদিত ঝাটকা ৫-৬ মাস নদীতে বসবাস করার
পর সাগরে এসেই ব্যানিং পিরিয়ডে পড়ছে। ফলে এরা প্রায় ১ বছর বড় হওয়ার সুযোগ পায় এবং ডিম
দেওয়ার জন্য পরিপক্ব হচ্ছে। ফলে এখন অপেক্ষাকৃত বড় সাইজের ইলিশ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
জাটকা আহরণে বিরত থাকতে তাদের উদ্বুদ্ধ করা, সামাজিকভাবে তাদের বোঝানো এবং অসহায় ও
দরিদ্র জেলেদের যাতে তারা ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। তারপরও
কিছু অসাধু নিষেধাজ্ঞার সময়ে অবৈধ জাল ব্যবহার করে জাটকা আহরণ করে। এ বিষয়ে সরকারের
তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।
একটি ইলিশ বছরে সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত ২০২২ সালে ৪০ হাজার কোটি জাটকা নদীতে তৈরি হয়েছে এবং এরা ইলিশ পরিবারের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে। আজকের জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ। তা ছাড়া গত ১৩ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮-০৯ সালে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার টন; যা ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৭ হাজার টন। তা ছাড়া সারা পৃথিবীতে এখন যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়, তার ৮০ শতাংশই উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। বর্তমান সরকারের আমলে জাটকা ও প্রজননক্ষম ইলিশ সংরক্ষণ এবং অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে ইলিশের আকার অনেক সুষম হয়েছে। বাজারে বিভিন্ন আকারের ইলিশ প্রায় সব সময়ই পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে পাওয়া না গেলেও এখন শীতকালেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন এমনকি শীত মৌসুমেও ইলিশ প্রাপ্তির সুযোগ আমাদের হয়েছে। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে শীঘ্রই আমরা আরো ইতিবাচক ফলাফল পাবো। তবে এখনও কিছু বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। সেগুলো সামনের বছরগুলোতে কাটিয়ে ওঠা অনেকটাই সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা।