সম্পাদক
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:০৬ পিএম
১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন সর্বজনীন পেনশন স্কিম, যা চিহ্নিত হয় সামাজিক সুরক্ষায় আরেকটি নবধাপের সূচনা হিসেবে। অথচ আন্তরিক এই কার্যক্রমটি যেন শুরুতেই থমকে যাচ্ছে, উৎসাহে ভাটা পড়েছে। ‘সাড়া নেই সর্বজনীন পেনশনে’ শীর্ষক ২৬ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন বলছে, পেনশন স্কিম চালুর প্রথম সপ্তাহে এতে যুক্ত হন ৮ হাজার ৪১ জন। মাস শেষে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯৫৯ জনে। কিন্তু দুই মাস পাঁচ দিন পর সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৯২৮ জনে। অর্থাৎ প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে দুই মাস পেরিয়েও সুরক্ষা কার্যক্রমে সংখ্যাটি ১৫ হাজার ছুঁতে পারেনি। উদ্যোগটি ভালো। তারপরও কেন পারেনি? সরকারের এ নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণাও রয়েছে। তারপরও এই না পারার পেছনে হয়তো রয়েছে সাধারণের ভাবনা যে, এই টাকার সুরক্ষা কতটুকু? পেনশন স্কিম শুরুর আগে-পরে রাজনৈতিক মহল থেকে নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছে। যাতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছে। এমনও বলা হয়েছে, পেনশন স্কিমে জমা টাকা সরকার তার প্রয়োজনে উত্তোলন করে নেবে। প্রয়োজনের সময় পেনশনভোগী আর টাকা ফেরত পাবে না। ডলার সংকটসহ উন্নয়ন প্রকল্পে দেদার ঋণ নেওয়ায় সরকার ঋণ জর্জরিত এমন কথাও নানাভাবে প্রচার হয়েছে। এই নেতিবাচক প্রচারণা যে সুরক্ষা কার্যক্রমটিতে ছাপ ফেলেছে, তা স্পষ্ট হয় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কথাতেও। প্রতিবেদকের কাছে তিনি বলেছেন, ‘উদ্যোগটা ভালো, …তবে লোকের এটা বুঝে উঠতেও সময় লাগবে। আবার যারা পেনশনে চাঁদা দিয়ে অংশ নেবে, তাদের মনে হয়তো সংশয় আছে, মেয়াদ শেষে টাকাটা পাবে কি না?’
সামাজিক সুরক্ষা
কার্যক্রমকে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। যা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আদর্শ
ও ধারণাকেই স্পষ্ট করে। সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘চরজীবিকায়ন
প্রকল্প’সহ নানামুখী প্রকল্পে পরিষেবা গ্রহীতাদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সর্বজনীন পেনশন
স্কিম নিয়ে কেন সে উৎসাহ নেই তা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
পেনশন স্কিমের
মূল লক্ষ্য দেশের আঠার বছরের বেশি বয়সি সবাইকে এর আওতায় আনা। যাতে তারা তাদের ষাট বছর
বয়স হওয়ার পর আজীবন পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারেন। ‘সুখে ভরবে আগামী দিন, পেনশন হবে
সর্বজনীন’Ñ এই প্রতিপাদ্য ধারণ করে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থাটি নিঃসন্দেহে
জনবান্ধব। পেনশন স্কিমের উদ্বোধনের পরই আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই এর বাস্তবায়ন বড়
চ্যালেঞ্জ বলে মত প্রকাশ করেছিলাম। এজন্য বিশেষ কিছু বিষয়ে গভীর নজর রাখার কথাও বলেছিলাম।
আমরা জানি সরকারি
কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ বিভিন্ন আধাসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের
জন্য পেনশন প্রথা চালু আছে। পেনশন আর্থ-সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা।
যার মাধ্যমে সরকার কর্মচারীদের প্রতি তাদের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে। অন্যদিকে
বেসরকারি খাতের অনেক চাকরিতে অবসরের পর চাকরিজীবীর আর কোনো প্রাপ্তি থাকে না। অবসরের
সঙ্গে সঙ্গেই তাকে অনিশ্চিত জীবন তাড়া করে। সেই অনিশ্চিত জীবনেই স্বস্তির বার্তা হয়ে
আসতে পারে সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম। কিন্তু মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে না
পারায় পিছিয়ে পড়ছে এই মহতী উদ্যোগ। সর্বজনীন পেনশন স্কিমে রয়েছে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা
ও সমতা নামে চারটি ভাগ। প্রথমটি প্রবাসী বাংলাদেশি, দ্বিতীয়টি সরকারি চাকরিজীবী, তৃতীয়টি
কৃষক-শ্রমিক-জেলে-তাঁতিসহ সকল স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য এবং চতুর্থটি নিম্ন
আয়ের মানুষের জন্যÑ যাদের বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকার কম।
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে মানুষ কখনও সরকারের সুরক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। এক্ষেত্রে এই স্কিম নিয়ে যে নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রচার রয়েছে, তার ঊর্ধ্বে ওঠা যেমন জরুরি তেমনি সাধারণের জন্যও এই উপলব্ধি জরুরি যে রাজনৈতিক স্বার্থে সরকারি প্রকল্প ব্যবহৃত হয় না। তাই সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে অনিশ্চয়তার ছায়া রয়েছে তা দূর করতে হবে। আর এই স্কিমের উপকারিতা নিয়ে প্রচারণায় যেটুকু অস্বচ্ছতা রয়েছে, যার জন্য উপকারভোগীদের আস্থা তৈরি হয়নি, তাও দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এর সফলতা মিলবে, মানুষ প্রকৃতপক্ষে উপকার পাবে।