সম্পাদকীয়
সম্পাদক
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৩ ১৪:৩৬ পিএম
আজ শুভ বিজয়া
দশমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি
ঘটছে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ তিথিতে যে দুর্গা দেবীর অর্থাৎ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের
কাছে যিনি দুর্গতিনাশিনী ও শক্তিরূপে পূজিত তার আগমন ঘটে মর্ত্যলোকে। তাকে আজ আরেক
শরৎকাল পর্যন্ত বিদায় জানানো হবে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। দুর্গতিনাশিনী দুর্গা অশুভশক্তির
বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয় হিসেবে চিহ্নিত। আমরা বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের পাশাপাশি
কামনা করি, উৎসবের মঙ্গলালোকের যে আলো ছড়িয়েছে এ আলোর অর্থাৎ ন্যায় ও কল্যাণের ছায়া
আরও প্রসারিত হোক সমাজের সর্বত্র। বিনাশ ঘটুক অশুভশক্তির। জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার।
দূর হোক অশান্তি, বৈরিতা, বৈষম্যসহ নেতিবাচক সবকিছুর অপচ্ছায়া। নিশ্চিত হোক মানবকল্যাণমুখী
চেতনা।
শুভ মহালয়ার মধ্য
দিয়ে আগমন ঘটে মাতৃরূপিণী মহাশক্তি দুর্গার। বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে নিগূঢ় সম্পর্কের
সূত্র ধরে তার আগমন ঘটে। রক্তস্নাত এই বাংলাদেশ, যার অভ্যুদয় ঘটেছিল একাত্তরের মহান
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে; এর পেছনে রয়েছে অশুভশক্তির আস্ফালন দমিয়ে শুভশক্তির জয় সূচিত
করার উপাখ্যান। এ ভূখণ্ডে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সহাবস্থান
ও সম্প্রীতির বাতাবরণ সৃষ্টি করে বসবাস করে আসছে। এই বন্ধন বাঙালির মধ্যে অন্যরকম জাগরণ
ঘটিয়েছে প্রতিটি দুর্যোগ-দুর্বিপাকে। এরই প্রকাশ ঘটেছে মহান মুক্তিযুদ্ধে। যাঁর ডাকে
ও নেতৃত্বে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা, বাঙালির সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা এ প্রেক্ষাপটে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়।
কারণ, তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সাম্যের আলো ছড়িয়ে জাতির পুনর্গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে
রাষ্ট্রের জন্মদানে অগ্রণী ও মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। যে
প্রত্যয় ও সংকল্প স্থির করে আমাদের স্বাধীন ভূমির মানচিত্র তিনি বিশ্বমানচিত্রে এঁকে
দেওয়ার লক্ষ্যে অনন্য অধ্যায়ের জন্ম দেন এবং বিশ্ব ইতিহাসে যা অক্ষয় হয়ে আছে; সেই ভূখণ্ডে
সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন করে অশুভশক্তি বারবার মরিয়া হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য বিনষ্টে এবং এখনও
তারা সক্রিয় নয়, তা বলার অবকাশ নেই।
সম্প্রীতি-মৈত্রী-সৌহার্দ্যের
সেতুবন্ধ বিনষ্টে কদর্যতার ছায়া ছড়িয়েছে যারা এবং এখনও যাদের সেই অপচেষ্টা অব্যাহত
আছে, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে সম্মিলিতভাবে। বাঙালির ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির আলো অন্ধকার
দূর করেছে এবং করছে। আমাদের আশা ও শক্তি এখানেই। স্বাধীনতা-উত্তর এ বাংলাদেশে ইতোমধ্যে
আমরা ৫২ বছর অতিক্রম করে এসেছি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ে আমাদের অর্জন কম নয়। উন্নয়ন-অগ্রগতির
নানা সূচকে বিশ্বে আজ আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তযোগ্য। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য,
আরও অনেক কিছুই রয়েছে অনর্জিত এবং হীনস্বার্থবাদী রাজনীতিকদের কারণে কিছু অর্জনের বিসর্জনও
ঘটেছে; যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ক্ষতি তো করেছেই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাবমূর্তিও
ম্লান করেছে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে সে সবকিছুর পুনরুদ্ধার সময় ও ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে
অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনার আলোই কেবল পারে সব অন্ধকার দূর
করে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে সাম্যের আলো ছড়াতে, যা ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম স্বপ্ন।
চলমান বৈশ্বিক
সংকটের ছায়া ক্রমপ্রসারিত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে দেশে দেশে দৃশ্যমান হয়ে
উঠেছে। রক্ত ঝরছে বিশ্বের কত জনপদে। ফিলিস্তিনে আজ মানবিক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। গাজা
যেন মৃত্যুপুরী। গাজাবাসী চরম বিপন্ন-বিপর্যস্ত। এমনটি মানবতার পরাজয় বই কিছু নয়। পাশাপাশি
আগে থেকেই চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মানবিক সংকটের আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বশান্তির প্রত্যাশায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ
হয়ে শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বারবার আহ্বান জানিয়েছেন।
দুর্গোৎসবেও দেশের
পূজামণ্ডপগুলোয় ভক্ত-পূজারিরা শক্তিরূপিণী, অসুরবিনাশী দেবী দুর্গার কাছে একই প্রার্থনা
জানিয়েছেন। আমরা সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি বিশ্বমানবতা রক্ষায় দেবীকে অঞ্জলিদান পর্বে পূজারি-ভক্তরা
সবার শান্তির প্রার্থনা জানিয়েছেন। আমরা প্রত্যাশা করি, শরতের শুভ্র কাশফুলের মতো মানবহৃদয়েও
শুভবোধ-কল্যাণের শ্বেতশুভ্র পুষ্পরাশি প্রস্ফুটিত হতে থাকবে এবং অসুর শক্তি ও অশুভকে
বিনাশ করে মানবহৃদয়ে সঞ্চারিত হবে শুভচেতনা। আমরা আশা করি, মানুষের কল্যাণে মানুষের
আবেদন নিষ্ফলা হবে না। বিজয়া দশমীতে আমাদের এ প্রত্যাশা আরও বলিষ্ঠরূপে সামনে এসেছে।