× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

খেলাপি ঋণ বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:১৯ পিএম

খেলাপি ঋণ বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে

দেশের ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে জর্জরিত। সম্প্রতি খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ব্যাংকের পর এবার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) রেকর্ড খেলাপি ঋণে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জুন শেষে এ খাতে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জুন শেষে ৩৫টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৯৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেশি (৪ হাজার ১৫ কোটি টাকা)। খেলাপি ঋণের যে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে তার পরিমাণ বাস্তবে দ্বিগুণের কম নয় বলে আইএমএফের অভিমত। কারণ পুনঃতফসিল করা ঋণ নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ওই টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে এমনটি প্রত্যাশা করা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের কথা বলছে। যাদের ঋণখেলাপি বলা হয় তারা যৌক্তিক কারণেই ঋণখেলাপি হতে পারেন। দেখা যাবে তাদের ঋণের পরিমাণও অল্প। মূল ঋণ নিয়েছে অল্প কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। আর্থিক খাতে অনিয়ম এবং কতিপয় অসাধু দায়িত্বশীলের মাধ্যমে আইনের নানা সুবিধা নিয়ে তারা ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সরে যেতে পারেন। ফলে এই বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয় না। গত কয়েক বছরে আর্থিক খাতে নানা রকমের কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব খেলাপি ঋণের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারও কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন সরকারি ব্যাংকগুলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে নিয়ে আসা হয়। সরকারি ব্যাংকগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ, নজরদারি এবং সুষ্ঠু পরিচালনায় সহায়তা প্রদানের সক্ষমতা সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেই। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে নিয়ে আসার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগের ক্ষমতা বেড়ে গেল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা হলো খর্ব। এর আগে সরকারি ব্যাংক ব্যাপক উন্নতি করছিল।

অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যাংকিং খাতের বিগত সাত-আট বছরের উন্নতি আমাদের জন্য ইতিবাচক হলেও সরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে নিয়ে আসার পরই খেলাপি ঋণ বাড়তে শুরু করল। সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ার এটি প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণটির সঙ্গে রাজনীতির যোগ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালক পর্ষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই নিয়োগ পান। ফলে ব্যাংকিং খাত তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োগপ্রাপ্ত দায়িত্বশীলের অনেকেই অসদুপায় অবলম্বনে ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া করে দেন। বিতরণ করা ঋণের বেশিরভাগই অসদুপায় অবলম্বন করে এমন লোকদের দেওয়া হয় যারা পরে ঋণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করছে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জড়িত থাকে বলে ঋণখেলাপিরা বাড়তি সুবিধা পান। আমরা বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করতে পারি। রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অসদুপায়ে বহু ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অথচ ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ছিল, কোনো ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের মূলধনের ৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারবে না। ৫ শতাংশের বেশি ঋণ বিতরণ করে তা ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা ছিল না বলেই ২০০১ সালে এ নিয়ম চালু করা হয়। ২০১০ সালের পর এ নিয়ম উঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ব্যাংকিং খাতে অসদুপায়ে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়।

বাংলাদেশকে দ্বিতীয় কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসেবে আইএমএফ বলেছে, সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে তা ২৫ শতাংশের বেশি রয়েছে। আপাতদৃষ্টে এ শর্ত পূরণ করা কঠিন। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল বিভাগ ও কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা অবশ্যই জরুরি। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও সদিচ্ছার সমন্বয় জরুরি। কিছু কিছু বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিকল্পনা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে এ লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। আর সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যাবে এমনটি নয়। সেজন্য কয়েক বছর কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। আইএমএফের দেওয়া এ শর্ত বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও তারা বলেছে, এটি কোনো শর্ত নয়। আমাদের অর্থনীতির গতির স্বার্থে তারা একটি লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। আমি মনে করি, আইএমএফের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে সহায়তা করবে না। বরং আর্থিক খাতের সংস্কার আমাদেরই করতে হবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর্থিক খাতকে গ্রাহক-সংবেদনশীল এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম করে তুলতে হবে। তাৎক্ষণিক সংস্কারমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এ মুহূর্তে জরুরি। কারণ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কাজের কাজ হয়নি কিছুই। আর্থিক খাতের লক্ষ্যমাত্রাকে রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো আকারে প্রচার করলে হবে না। সেটি ফাঁপা বুলি হয়ে থাকে। আমাদের এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।

প্রশ্ন হচ্ছে, আর্থিক খাতের দৈন্যদশা দূর করার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কি না। আমাদের ব্যাংকিং খাতে সফল সংস্কার অতীতে একাধিকবার ঘটেছে। ১৯৯২-৯৩ সালে একবার হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় ২০০১ সালে অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করা হয়েছিল। অর্থাৎ অর্থনীতির চাহিদা অনুসারে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু সক্ষমতা থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সদিচ্ছা এবং তাৎক্ষণিক ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতা রাখা জরুরি। সরকারি ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতির অসংখ্য নজির রয়েছে। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম ঘটেছিল। তখন অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটিও মুখ থুবড়ে পড়বে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকে নতুন করে অনিয়মের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে ইতোমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বড় ব্যবসায়ী বা ঋণ আবেদনকারীদেরকে ব্যাংকটি এড়িয়ে চলছে। অনেক যাচাইবাছাই করে তারা ঋণ বিতরণ করছে। এমন পদক্ষেপ অবশ্যই জরুরি। কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা বা বড় প্রতিষ্ঠান অসদুপায় অবলম্বন করে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। এভাবে যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা গেলে খেলাপি ঋণের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। বিগত কয়েক বছরে এমন একাধিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব খেলাপি ঋণের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যেসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, সেসব বিষয়ে তারা এড়িয়ে যায়। যারা ভালো কাজ করে তাদের শাস্তি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর যারা খারাপ কাজ করে তাদের বিষয়ে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয় না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব সর্বাগ্রে দায়ী। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে আর্থিক খাতকে অর্থনীতির তাত্ত্বিক ধারা অনুসারে পরিচালনা করতে হবে। অর্থনীতি সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। এখন আর্থিক খাতে সুশাসন ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে দ্বিমুখী নীতি আমাদের জন্য ক্ষতিকর। অনেককে ঋণ খেলাপের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ কৃষিঋণ বিতরণের পর কৃষককে নানাভাবে হেনস্থ করা হচ্ছে। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়। ব্যাংকিং খাতে কিছু অসাধু বাড়তি সুবিধা আদায় করবে এবং যারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য তাদের ভোগান্তি পোহাতে হবেÑ এমনটি হতে পারে না।

আমাদের ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে মানুষের ধারণা বেশ কম। ব্যাংকিং সেবা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। তবে বিষয়টিকে নেতিবাচক ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের ব্যাংকিং সেবার সম্ভাবনা ব্যাপক হলেও এর পরিসর ক্ষুদ্র। যারা আমানত রাখবেন তারা সেবা সম্পর্কে জানেন। কিন্তু ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম, জবাবদিহি ও নজরদারির অভাব কাটানোর আশু ব্যবস্থা ও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দক্ষতা ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে পরিচালিত হোক ব্যাংকিং খাত।


  • নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা