রাজনীতি
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:৫৬ পিএম
আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি তিপান্ন বছর আগে। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সে স্বাধীনতার অভ্যুদয়; যা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। এর আগে ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আমরা মুক্তি অর্জন করেছিলাম। কিন্তু তা আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতা ছিল না। মূলত তা ছিল অনেকটা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার মতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির পরিবর্তে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়া। পাকিস্তানের সে দুঃশাসন থেকে মুক্তি অর্জন করতে আমাদের দীর্ঘ তেইশ বছর নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়েছে, পরিশেষে করতে হয়েছে সশস্ত্র যুদ্ধ। এখন আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি। আমাদের বর্তমান ও ভূত-ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কারও নাক গলানোর সুযোগ থাকার কথা নয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক
কিছু ঘটনা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকদের কর্মকাণ্ডদৃষ্টে সংশয় জেগেছে, আসলেই
কি আমরা স্বাধীন? যদি হয়েও থাকি, তাহলে কতটুকু স্বাধীন? একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে
সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতাকে পুঁজি করে কিছু বিদেশি শক্তি যেন আমাদেরকে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার
পুতুলে পরিণত করতে চাইছে। তারা নির্দেশনা দিচ্ছে, আমরা কী করব না করব। কী করতে হবে
বা কী করা যাবে না। ওইসব শক্তির প্রতিনিধিগণ, যারা ঢাকায় কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োজিত,
তারা এ সুযোগে তাদের এখতিয়ারবহির্ভূত কমর্কাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন। সচেতন মহল অবশ্য অনেক
আগে থেকেই বলে আসছে যে, বিদেশিরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ পাচ্ছে আমাদের
কারণেই। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই তাদের প্রলুব্ধ করছে, এ ধরনের অকূটনৈতিক তৎপরতায়
সম্পৃক্ত হতে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, যে রাষ্ট্রটি চায়নি বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন
দেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পাক, এমনকি সেদিন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে যারা সপ্তম
নৌবহর প্রেরণ করেছিল, তারাই এখন বাংলাদেশের বড় গার্জেন সাজার চেষ্টা করছে। তবে রাজনীতিতে
শেষ কথা নেই বা কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু থাকতে নেই, এসব আপ্তবাক্য
স্মরণে রেখেও বলতে হয়, আমরা কেন তাদেরকে এভাবে খবরদারি করার সুযোগ করে দিলাম। আরও বেদনাদায়ক
বিষয় হলো, ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই’ বলেছিলেন যিনি, সেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর
রহমানের দল বিএনপি এখন অতিমাত্রায় বিদেশি শক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। সবক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা
অর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যুর বিয়াল্লিশ বছর পর
এসে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত দলের এমন পরনির্ভর হয়ে পড়া আদর্শচ্যুতি নয় কি?
গত ১২ অক্টোবর
দুপুরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বারিধারাস্থ আমেরিকান ক্লাবে এক অনির্ধারিত
বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে। খবরটি
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হয় এবং পরদিন দেশের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
কয়েকটি দৈনিক বৈঠক শেষে বেরিয়ে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িতে ওঠার ছবিও ছেপে দিয়েছে। কিন্তু
মির্জা আলমগীর ওই বৈঠকের খবর অস্বীকার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি যদি আমেরিকান ক্লাবে
না গিয়ে থাকেন, তাহলে ওই ছবিটি এলো কোত্থেকে। ছবিটি এতটাই স্পষ্ট যে, পরিচিত কারও চিনতে
ভুল হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে গত ১৩ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ ‘বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা
অব্যাহত’ শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘বিএনপির মিডিয়া সেলের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে
খবরে বলা হয়, এ বৈঠকে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আর কেউ ছিলেন না। তবে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র
দূতাবাসের রাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক কাউন্সিলর আর্তুরো হাইন্স উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের
প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের ঢাকা ত্যাগের আগে ওই দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিএনপি
মহাসচিবের এই বৈঠক নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল দেখা দেয়।’ কৌতূহলবশতই ফোন করেছিলাম বিএনপির
সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন সাবেক কূটনীতিককে। তার কাছে আমার প্রশ্ন ছিল, বৈঠক করেও বিএনপি মহাসচিব
তা অস্বীকার করলেন কেন? তিনি বললেন, দুটি কারণে তিনি এটা করে থাকতে পারেন। এক. দল থেকে
তাকে নিষেধ করা হয়েছে এটা প্রকাশ করতে। দুই. বৈঠকটি হয়তো ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু মজার
ব্যাপার হলো, প্রতিদিনের বাংলাদেশের খবরেই বলা হয়েছে, বিএনপির মিডিয়া সেলের বরাতেই
তারা খবরটি ছেপেছেন। তাহলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বিএনপি মহাসচিব অস্বীকার করলেও
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। তবে তারা কী নিয়ে কথা বলেছেন, তা জানা
যায়নি। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় কারণটি অনেকটাই যৌক্তিক হয়ে দেখা দেয়।
বৈঠক ফলপ্রসূ
না হওয়াতেই মির্জা আলমগীর তা অস্বীকার করার প্রয়াস পেয়ে থাকতে পারেন। তবে এখানে গোল
বাঁধিয়েছে পত্রিকায় মুদ্রিত ওই ছবিটি; যা ঘটনার দিন তার সেখানে যাওয়া-আসার প্রমাণ বহন
করছে। এটা তো মানতে হবে, মানুষের চোখ হয়তো ভুল করতে পারে, কিন্তু ক্যামেরার লেন্স কখনও
ভুল করে না। ক্যামেরায় তোলা ছবি কখনও মিথ্যে বলে না। এখন তাহলে ওই ছবির কী ব্যাখ্যা
দেবেন বিএনপি মহাসচিব? ভরদুপুরে তিনি কেন সেখানে গিয়েছিলেন? সুতরাং সেদিন আমেরিকান
ক্লাবে মির্জা আলমগীর গিয়েছিলেন এতে আর সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। তবে সন্দেহটা
দানা বেঁধে উঠেছে সেটা তিনি অস্বীকার করায়। লক্ষ করার বিষয় হলো, একই দিনে বিএনপির আরেকটি
প্রতিনিধিদল তাদের দুপুরের খাবার সেরেছেন সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের বাসায়।
এদিকে ওইদিন খবরটি
ভাইরাল হওয়ার পর বিকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘পিটার হাস কী করবেন? পিটার হাসের মুরব্বিদের সঙ্গে আমাদের কথা
হয়ে গেছে। আমেরিকার মুরব্বি যারা তাদের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ। তলে তলে যখন সব শেষ, তখন
আর এসব করে লাভ নেই।’ (প্রাগুক্ত)।
দেখা যাচ্ছে আমাদের বড় দুটি রাজনৈতিক দল, যারা দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রক, তারা জনগণের ওপর ভরসা না করে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিএনপি আন্দোলনে সফলতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে বিদেশি শক্তির চাপের দ্বারা সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা করছে, আর আওয়ামী লীগ সেই বিদেশি শক্তির ‘মুরব্বিদের’ দিয়ে সে চেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার কথা স্বগর্বে প্রচার করছে। বলা নিষ্প্রয়োজন, এর কোনোটিই জনগণের কাম্য নয়। একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরাধীনতার মানসিকতা নিয়ে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া বা থাকার জন্য আন্তর্জাতিক মোড়লদের মুখাপেক্ষী হবে, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?